চৈত্র মাসের শেষে একদিন ফুটবল খেলিতে খেলিতে অপুর হাঁটুটা কি ভাবে মচকাইয়া গিয়া সে মাঠে পড়িয়া গেল। সঙ্গীরা তাহাকে ধরাধরি করিয়া আনিয়া ডেপুটিবাবুর বাসায় দিয়া গেল। নির্মলার মা ব্যস্ত হইয়া বাহিরের ঘরে আসিলেন, কাছে গিয়া বলিলেন–দেখি দেখি, কি হয়েছে? অপুর উজ্জ্বল গৌরবর্ণ সুন্দর মুখ ঘামে ও যন্ত্রণায় রাঙা হইয়া গিয়াছে, ডান পা-খানা সোজা করিতে পারিতেছে না। মনিয়া চাকর নির্মলার মার স্লিপ লইয়া ডাক্তারখানায় ছুটিল। নিলা বাড়ি ছিল না, ভাইবোনদের লইয়া গাড়ি করিয়া মুন্সেফবাবুর বাসায় বেড়াইতে গিয়াছিল। একটু পরে সরকারি ডাক্তার আসিয়া দেখিয়া শুনিয়া ঔষধের ব্যবস্থা করিয়া গেলেন। সন্ধ্যার আগে নির্মলা আসিল। সব শুনিয়া বাহিরের ঘরে আসিয়া বলিলকই দেখি, বেশ হয়েছে দস্যিবৃত্তি করার ফল হবে না? ভারি খুশি হয়েছি আমি–
নির্মলা কিছু না বলিয়া চলিয়া গেল। অপু মনে মনে ক্ষুন্ন হইয়া ভাবিল—যাক না, আর কখনও যদি কথা কই
আধ ঘণ্টা পরেই নির্মলা আসিয়া হাজির। কৌতুকের সুরে বলিল—পায়ের ব্যথা-ট্যথা জানি নে, গরম জল আনতে বলে দিয়ে এলাম, এমন করে সেঁক দেবোলাগে তো লাগবে—দুষ্টুমি করাব বাহাদুরি বেরিয়ে যাবে-কমলালেবু খাবেন একটা?—না, তাও না?
মনিয়া চাকর গরম জল আনিলে নির্মলা অনেকক্ষণ বসিয়া বসিয়া ব্যথার উপর সেঁক দিল, নির্মলার ভাইবোনেরা সব দেখিতে আসিয়া ধরিল-ও দাদা, এইবার একটা গল্প বলুন না।
অপুর মুখে গল্প শুনিতে সবাই ভালোবাসে।
নির্মলা বলিল-হা, দাদা এখন পাশ ফিরে শুতে পারছেন না—এখন গল্প না বললে চলবে কেন?…চুপ করে বসে থাকো সব-নয়তো বাড়ির মধ্যে পাঠিয়ে দেব।
পরদিন সকালটা নির্মলা আসিল না। দুপুরের পর আসিয়া বৈকাল পর্যন্ত বসিয়া নানা গল্প করিল, বই পড়িয়া শুনাইল। বাড়ির ভিতর হইতে থালায় করিয়া আখ ও শাঁখ-আলু কাটিয়া লইয়া আসিল। তাহার পর তাহাদের পদ্যমেলানোর আর অন্ত নাই! নির্মলার পদটি মিলাইয়া দিয়াই অপু তাহাকে আর একটা পদ মিলাইতে বলে–নির্মলাও অল্প কয়েক মিনিটে তাহার জবাব দিয়া অন্য একটা প্রশ্ন করে। …কেহ কাহাকেও ঠকাইতে পারে না।
ডেপুটিবাবুর স্ত্রী একবার বাহিরের ঘরে আসিতে আসিতে শুনিয়া বলিলেন—বেশ হয়েছে, আব ভাবনা নেই—এখন তোমরা দু-ভাইবোনে একটা কবির দল খুলে দেশে দেশে বেড়িয়ে বেড়াও গিয়ে–
অপু লজ্জিত হইয়া চুপ করিয়া রহিল। ডেপুটিবাবুর স্ত্রীর বড়ো সাধ অপু তাহাকে মা বলিয়া ডাকে। সে যে আড়ালে তাহাকে মা বলে, তাহা তিনি জানেন কিন্তু সামনাসামনি অপু কখনও তাহাকে মা বলিয়া ডাকে নাই, এজন্য ডেপুটিবাবুর স্ত্রী খুব দুঃখিত।
অপু যে ইচ্ছা করিয়া করে না তাহা নহে। ডেপুটিবাবুর বাসায় থাকিবার কথা একবার সে বাড়িতে গিয়া মায়ের কাছে গল্প করাতে সর্বজয়া ভারি খুশি হইয়াছিল। ডেপুটিবাবুর বাড়ি! কম কথা নয়!…সেখানে কি করিয়া থাকিতে হইবে, চলিতে হইবে সে বিষয়ে ছেলেকে নানা উপদেশ দিয়া অবশেষে বলিয়াছিল-ডেপুটিবাবুর বউকে মা বলে ডাকবি—আর ডেপুটিবাবুকে বাবা বলে ডাকবি–
অপু লজ্জিত মুখে বলিয়াছিল—হ্যাঁ, আমি ওসব পিরবো না
সর্বজয়া বলিয়াছিল—তাতে দোষ কি?—বলিস, তারা খুশি হবেন—কম একটা বোলোকের আশ্রয় তো নয়!—তাহার কাছে সবাই বড়ো মানুষ।
অপু তখন মায়ের নিকট রাজি হইয়া আসিলেও এখানে তাহা কার্যে পরিণত করিতে পারে নাই। মুখে কেমন বাধে, লজ্জা করে।
একদিন—অপু তখন একমাস হইল সারিয়া উঠিয়াছে—নির্মলা বাহিরের ঘরে চেয়ারে বসিয়া কি বই পড়িতেছিল, ঘোর বর্ষা সারা দিনটা, বেলা বেশি নাই-বৃষ্টি একটু কমিয়াছে। অপু বিনা ছাতায় কোথা হইতে ভিজিতে ভিজিতে আসিয়া দৌড়াইয়া ঘরে ঢুকিতেই নির্মলা বই মুড়িয়া বলিয়া উঠিল—এঃ, আপনি যে দাদা ভিজে একেবারে–
অপুর মনে যে জন্যই হউক খুব স্ফূর্তি ছিল–তাহার দিকে চাহিয়া বলিল—চট করে চা আর খাবার—তিন মিনিটে–
নির্মলা বিস্মিত হইল, সঙ্গে সঙ্গে অত্যন্ত আনন্দিত হইল। এ রকম তো কখনও হুকুমের সুরে অপূর্বদা বলে না। সে হাসিমুখে মুখ টিপিয়া বলিল-পারব না তিন মিনিটে-ঘোড়ায় জিন দিয়ে এলেন কিনা একেবারে!
অপু হাসিয়া বলিল—আর তো বেশিদিন না—আর তিনটি মাস তোমাদের জ্বালাবো, তারপর চলে যাচ্ছি–
নির্মলার মুখ হইতে হাসি মিলাইয়া গেল। বিস্ময়ের সুরে বলিল—কোথায় যাবেন।
-তিন মাস পরেই এগজামিন দিয়েই চলে যাবো, কলকাতায় পড়বো পাস হলে—
নির্মলা এতদিন সম্ভবত এটা ভাবিয়া দেখে নাই, বলিল–আর এখানে থাকবেন না?
অপু ঘাড় নাড়িল। খানিকটা থামিয়া কৌতুকের সুরে বলিল—তুমি তো বাঁচো, যে খাটুনি তোমার তো ভালো—ওকি? বা রে-কি হলো–শোন নির্মলা–
হঠাৎ নির্মলা উঠিয়া গেল কেন—চোখে কি কথায় তাহার এত জল আসিয়া পড়িল, বুঝিতে পারিয়া সে মনে মনে অনুতপ্ত হইল। আপন মনে বলিল—আর ওকে ক্ষ্যাপাবো না—ভারী পাগল—আহা, ওকে সব সময় খোঁচা দিই—সোজা খেটেছে ও, যখন পা ভেঙে পড়েছিলাম পনেরো দিন ধরে, জানতে দেয় নি যে আমি নিজের বাড়িতে নেই–
ইহার মধ্যে আবার একদিন পটু আসিল। ডেপুটিবাবুর বাসাতে অপু উঠিয়া আসিবার পর সে কখনও আসে নাই। খানিকটা ইতস্তত করিয়া বাসায় ঢুকিল। এক-পা ধুলা, রুক্ষ চুল, হাতে পুটুলি। সে কোন সুবিধা খুঁজিতে আসে নাই, এদিকে আসিলে অপুর সঙ্গে দেখা না করিয়া সে যাইতে পারে না। পটুর মুখে অনেক দিন পর সে রানুদির খবর পাইল। পাড়াগাঁয়ের নিঃসহায় নিরুপায় ছেলেদের অভ্যাসমতো সে গ্রামের যত মেয়েদের শ্বশুরবাড়ি ঘুরিয়া বেড়ানো শুরু করিয়াছে। বাপের বাড়ির লোক, অনেকের হয়তো বা খেলার সঙ্গী, মেয়েরা আগ্রহ করিয়া রাখে, ছাড়িয়া দিতে চাহে না, যে কয়টা দিন থাকে খাওয়া সম্বন্ধে নির্ভাবনা। কোন স্থানে দু-দিন, কোথাও পাঁচদিন–মেয়েরা আবার আসিতে বলে, যাবার সময় খাবার তৈয়ারি করিয়া সঙ্গে দেয়। এ এক ব্যবসা পটু ধরিযাছে মন্দ নয়—ইহার মধ্যে সে তাহাদের পাড়ার সব মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে দু-চার বার ঘুরিয়া আসিয়াছে।
