খোকা যেন হঠাৎ চমক ভাঙিয়া কতকটা ভয় ও কতকটা বিস্ময়ের দৃষ্টিতে চাহিয়া রহিল, কোনও কথা বলিল না।
প্রণবের মনে বড় কষ্ট হইল—ইহাকে ইহারা এভাবে একা উপরের ঘবে ফেলিয়া রাখিয়াছে! অসহায় বালক একলাটি শুইয়া মুখ বুজিয়া জ্বরের সঙ্গে যুঝিতেছে, পথ্য দিয়াছে কি-না, দুখানা ময়দার হাতে-গড়া বুটি ও খানিকটা লাল চিনি। আর কিছু জোটে নাই ইহাদের? জ্বরের ঘোরে তাহাই বালক যাহা পারিয়াছে খাইয়াছে। প্রণব জিজ্ঞাসা করিল-খোকা রুটি কেন, সাবু দেয় নি তোমায়?
খোকা বলিল–ছাবু নেই।
–নেই কে বললে?
—মা-মামিমা বললে ছাবু নেই।
সে জ্বরে হাঁপাইতেছে দেখিয়া প্রণব ঠাণ্ডা জল আনিয়া তাহার মাথাটা বেশ করিয়া ধুইয়া দিয়া পাখার বাতাস করিতে লাগিল। কিছুক্ষণ এরুপ করিতেই জ্বরটা একটু কমিয়া আসিল, বালক একটু সুস্থ হইল। দিশেহারা ও হাঁস-ফস ভাবটা কাটিয়া গেল। প্রণব বলিল-বলো তো আমি কে?
খোকা বলিল-জা-জা-জা-জানি নে তো?
প্রণব বলিল—আমি তোমার মামা হই খোকা। তোমার বাবা বুঝি আসে নি এর মধ্যে?
কাজল ঘাড় নাড়িয়া বলিল-না-না তো, বাবা কতদিন আসে নি।
প্রণব কৌতুকের সুরে বলিল—তুমি এত ভোলা হলে কি করে, কাজল?
সে অপুর ছেলেকে খুব ছোটবেলায় দেখিয়াছিল। আজ দেখিয়া মনে হইল, অপুর ঠোঁটের সুকুমার রেখাটুকু ও গায়ের সুন্দর রংটি বাদে ইহার মুখের বাকি সবটুকু মায়ের মতো।
কাজল ভাবিয়া ভাবিয়া বলিল—আমার বাবা আসবে না?
-আসবে না কেন? বাঃ!
–ক-ক-কবে আসবে?
—এই এলো বলে। বাবার জন্যে মন কেমন করে বুঝি?
কাজল কিছু বলিল না।
অপুর উপরে প্রণবের খুব রাগ হইল। ভাবিল—আচ্ছা পাষণ্ড তো! মা-মরা কচি বাচ্চাটাকে বেঘোরে ফেলে রেখে কোথায় নিরুদ্দেশ হয়ে বসে আছে! ওকে এখানে কে দেখে তার নেই ঠিক–দয়া মায়া নেই শরীরে?
শশীনারায়ণ বাঁড়ুজ্যে প্রণবের নিকট জামাইয়ের যথেষ্ট নিন্দা করিলেন—বন্ধুর সঙ্গে বিয়ের যোগাযোগটি তো ঘটিয়েছিলে, ভেবে দ্যাখো তো সে আজ পাঁচ বছরের মধ্যে নিজের ছেলেকে একবার চোখের দেখা দেখতে এলো না, ত্রিশ-চল্লিশ টাকার মাইনের চাকরি করছেন আর ঘুরে বেড়াচ্ছেন ভবঘুরের মতো, চাল নেই চুলো নেই, কোন জন্মে যে করবেন সে আশাও নেই—বোলো, হাড়ে চটেছি আমি–এদিকে ছেলেটি কি অবিকল তাই।…এই বয়েস থেকেই তেমনি নির্বোধ, অথচ যেমনি চঞ্চল তেমনি একগুঁয়ে। চঞ্চল কি একটু-আধটু? ওইটুকু তো ছেলে, একদিন করেছে কি, একদল গরুর গাড়ির গাড়োয়ানের সঙ্গে চলে গিয়েছে সেই পীরপুরের বাজারে—এদিকে আমবা খুঁজে পাই নে, চারিদিকে লোক পাঠাই—শেষে মাখন মুহুরির সঙ্গে দেখা, সে ধরে নিয়ে আসে। খাওয়াও, দাওয়াও, মেয়ের ছেলে কখনও আপনার হয় না, যে পর সে-ই পব।
খোকা বাপের মতো লাজুক ও মুখচোরা—কিন্তু প্রণবের মনে হইল, এমন সুন্দর ছেলে সে খুব কম দেখিয়াছে। সারা গা বাহিয়া যেন লাবণ্য ঝরিতেছে, সদাসর্বদা মুখ টিপি কেমন এক করুণ, অপ্রতিভ ধরনের হাসি হাসে—মুখখানা এত লাজুক ও অবোধ দেখায় সে সময়…কেমন যে একটা করুণা হয়। এখানে কয়েক দিন থাকিয়া প্রণব বুঝিয়াছে, দিদিমা মারা যাওয়ার পর এ বাড়িতে বালককে যত্ন করিবার আর কেহ নাই—সে কখন খায, কখন শোয়, কি পরে-এ সব বিষযে বাড়ির কাহারও দৃষ্টি নাই। শশীনারায়ণ বাঁড়জ্যে তো নাতিকে দু-চক্ষে দেখিতে পারেন না, সর্বদা কড়া শাসনে রাখেন। তাহার বিশ্বাস এখন হইতে শাসন না করিলে এ-ও বাপের মতো ভবঘুরে হইয়া যাইবে, অথচ বালক বুঝিয়া উঠিতে পারে না, দাদামহাশয় কেন তাহাকে অমন উঠিতে-তাড়া বসিতেতাড়া দেন-ফলে সে দাদামহাশয়কে যমের মতো ভয় করে, তঁাহাব ত্রিসীমানা দিয়া হাঁটিতে চায় না।
কলিকাতায় ফিরিয়া প্রণব দেবব্রতের সঙ্গে দেখা করিল। দেবব্রত একটু বিষণ্ণ—বিলাত যাইবার পূর্বে সে একটি মেয়েকে নিজের চোখে দেখিয়া বিবাহের জন্য পছন্দ করিয়াছিল—কিন্তু তখন নানা কারণে সম্বন্ধ ভাঙিয়া যায়—সে আজ তিন বৎসর পূর্বের কথা। এবার বিদেশ হইতে ফিরিয়া সে নিছক কৌতূহলের বশবর্তী হইয়া সন্ধান লইয়া জানে মেয়েটির এখনও বিবাহ হয় নাই। মেয়েটির ডান পায়ের হাঁটুতে নাকি কি হইয়াছে, ডাক্তারে সন্দেহ করিতেছেন বোধ হয তাহাতে চিরজীবনের জন্য ওই পা খাটো হইয়া থাকিবে—এ অবস্থায় কেই-বা বিবাহ করিতে অগ্রসর হইবে? শুনিবামাত্র দেবব্রত ধরিয়া বসিয়াছে সে ওই মেয়েকেই বিবাহ করিবে-মায়ের ঘোর আপত্তি, পিসেমহাশয়ের আপত্তি, মামাদের আপত্তি-সে কিন্তু নাছোড়বান্দা। হয় ওই মেয়েকে বিবাহ করিবে, নতুবা দরকার নাই বিবাহে।
দেবব্রতের সঙ্গে প্রণবের খুব ঘনিষ্ঠ আলাপ ছিল না, অপুর সঙ্গে ইতিপূর্বে বার-দুই-তিন তাহার কাছে গিয়াছিল এই মাত্র। এবার সে যায় অপুর কোন সন্ধান দিতে পারে কিনা তাহাই জানিবার জন্য। কিন্তু এই বিবাহ-বিভ্রাটকে অবলম্বন করিয়া মাস-দুইয়ের মধ্যে দুজনের একটা ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব গড়িয়া উঠিল।
দেবব্রত এই সব গোলমালের দরুন পিসেমহাশয়ের বাসা ছাড়িয়া কলিকাতায় হোটেলে উঠিয়াছিল-বৈকালে সেখানে একদিন প্রণব বেড়াইতে গিয়া শুনিল, দেবব্রতের মা এ বিবাহে মত দিয়াছেন, দেবব্রত বলিল—ঠিক সময়ে এসেছেন, আমি ভাবছিলুম আপনার কথা—কাল পিসেমশায় আর বড়ো মামা যাবেন মেয়েকে আশীর্বাদ করতে, আপনিও যান ওঁদের সঙ্গে। ঠিক বিকেল পাঁচটায় এখানে আসবেন।
মেয়ের বাড়ি গোয়াবাগানে। ছোট দোতলা বাড়ি, নিচে একটা প্রেস। মেয়ের বাপ গভর্নমেন্টের চাকরি করেন। মেয়েটিকে দেখিয়া খুব সুন্দরী বলিয়া মনে হইল না প্রণবের, গায়ের রং যে খুব ফরসা তাও নয়, তবে মুখে এমন কিছু আছে যাতে একবার দেখিলে বার বার চাহিয়া দেখিতে ইচ্ছা করে। ঘাড়ের কাছে একটা জতুকচিহ্ন, চুল বেশ বড় বড়ো ও কোকড়ানো। বিবাহের দিনও উভয়পক্ষের সম্মতিক্রমে ধার্য হইয়া গেল।
