দিনচারেক বাড়ি থাকিয়া খুড়িমাকে একটু শান্ত করিয়া চশমার ব্যবস্থার দোহাই দিয়া সে কলিকাতায় রওনা হইল। সোদপুরে খুড়িমার একজন ছেলেবেলায়-পাতানো গোলাপফুল আছেন, তাহারা প্রণবকে দেখিতে চান একবার, সেখানে যেন সে অবশ্য যায়, খুড়িমার মাথার দিব্য। প্রণব মনে মনে হাসিল। বৎসর-চার পূর্বে গোলাপফুলের বড়ো মেয়েটির যখন ব্বিাহের বয়স হইয়াছিল, তখন খুড়িমা এই কথাই বলিয়াছিলেন, কিন্তু প্রণব যাওয়ার সময় করিয়া উঠিতে পারে নাই। তারপরই আসিল নন-কো-অপারেশনের ঢেউ, এবং নানা দুঃখ-দুর্ভোগ। সেটির বিবাহ হইয়াছে, এবার বোধ হয় ছোটটির পালা।
কলিকাতায় আসিয়া সে প্রথমে অপুর খোজ করিল, পরিচিত স্থানগুলিতে গিয়া দেখিল, দুএকদিন ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরি খুঁজিল, কারণ যদি অপু কলিকাতায় থাকে তবে ইম্পিরিয়াল লাইব্রেরিতে না আসিয়া থাকিতে পারিবে না। কোথাও তাহার সন্ধান মিলিল না। চাপদানিতে যে অপু নাই তাহা তিন বৎসর আগে জেলে ঢুকিবার সময় জানিত, কারণ তাহারও প্রায় এক বৎসর আগে অপু সেখান হইতে চলিয়া গিয়াছে।
একদিন সে মন্মথদের বাড়ি গেল। তখন রাত প্রায় আটটা, বাহিরের ঘরে মন্মথ বসিয়া কাগজপত্র দেখিতেছে, সে আজকাল অ্যাটর্নি, খুড়-শশুরের বড়ো নামডাক ও পশারের সাহায্যে নতুন বসিলেও দু-পয়সা উপার্জন করে। মন্মথ যে ব্যবসায় উন্নতি করিবে, তাহার প্রমাণ প্রণব সেদিনই পাইল।
ঘণ্টাখানেক কথাবার্তার পরে রাত সাড়ে সাতটার কাছাকাছি মন্মথ যেন একটু উসখুস করিতে লাগিল-যেন কাহার প্রতীক্ষা কবিতেছে। একটু পরেই একখানা বড়ো মোটরগাড়ি আসিয়া দরজায় লাগিল, একটি পয়ত্রিশ-ছত্রিশ বছরের যুবকের হাত ধরিযা দু-জন লোক ঘরে প্রবেশ করিল। প্রণব দেখিয়াই বুঝিল, যুবকটি মাতাল অবস্থায় আসিয়াছে। সঙ্গের লোক দুইটির মধ্যে একজনের একটা চোখ খারাপ, ঘোলাটে ধরনের-বোধ হয় সে চোখে দেখিতে পায় না, অপর লোকটি বেশ সুপুরুষ। মন্মথ হাসিমুখে অভ্যর্থনা করিয়া বলিল, এই যে মল্লিক মশায়, আসুন, ইনিই মিঃ শর্মা?…বসুন, নমস্কার। গোপালবাবু, বসুন এইখানে। আর ওঁকে আমাদের কনডিশ সব বলেছেন তো?
ধরনে প্রণব বুঝিল মল্লিক মশায় বড়ো পাকা লোক। উত্তর দিবার পূর্বে তিনি একবার প্রণবের দিকে চাহিলেন। প্রণব উঠিতে যাইতেছিল, মন্মথ বলিলনা, না, বসো হে। ও আমার ক্লাসফ্রেন্ড, একসঙ্গে কলেজে পড়তুম—ও ঘরের লোক, বলুন আপনি। মল্লিক মশায় একটা পুটুলি খুলিয়া কি সব কাগজ বাহির করিলেন, তাহাদের মধ্যে নিম্নসুরে খানিকক্ষণ কি কথাবার্তা হইল। সঙ্গের অন্য লোকটি দুবার যুবকটির কানে কানে ফিসফিস করিয়া কি বলিল, পরে যুবক একটা কাগজে নাম সই করিল। মন্মথ দু-বার সইটা পরীক্ষা করিয়া কাগজখানা একটা গ্রামের মধ্যে পুরিয়া টেবিলে রাখিয়া দিল ও একরাশ নোটের তাড়া মল্পিক মশায়কে গুনিয়া দিল। পরে দলটি গিয়া মোটরে উঠিল।
প্রণব অপুর মতো নির্বোধ নয়, সে ব্যাপারটা বুঝিল। যুবকটির নাম অজিতলাল সেনশর্মা, কোনও জমিদারের ছেলে। যে-জন্যই হউক, সে দুই হাজার টাকার হ্যান্ডনোট কাটিয়া দেড় হাজার টাকা লইয়া গেল এবং মল্পিক মশায় তাহার দালাল, কারণ, সকলকে মোটরে উঠাইয়া দিয়া তিনি আবার ফিরিয়া আসিলেন ও পুনরায় প্রণবের দিকে বিরক্তির দৃষ্টিতে চাহিয়া মন্মথর সঙ্গে নিম্নসুরে কিসের তর্ক উঠাইলেন-সাড়ে সাত পার্সেন্টের জন্য তিনি যে এতটা কষ্ট স্বীকার করেন নাই, এ কথা কয়েকবার শুনাইলেন। ঠিক সেই সময়েই প্রণব বিদায় লইল।
পরদিন মন্মথর সঙ্গে আবার দেখা। মন্মথ হাসিয়া বলিল—কালকের সেই কাপ্তেন বাবুটি হে—আবার শেষরাত্রে তিনটের সময় মোটরে এসে হাজির। আবার চাই হাজার টাকা,থোকে থার্টিফাইভ পার্সেন্ট লাভ মেরে দিলুম। মল্লিক লোকটা ঘুঘু দালাল। বড়োলোকের কাপ্তেন ছেলে যখন শেষরাতে ত্যাভনোট কাটছেন, তখন আমরা যা পারি করে নিতে—আমার কি, লোকে যদি দেড়হাজার টাকার হ্যান্ডনোট কেটে এক হাজার নেয় আমার তাতে কি? দোষ কি? এই-সব চরিয়েই তো আমাদের খেতে হবে! কত রাত এমন আসে দ্যাখ না, টাকার যা বাজার কলকাতায়, কে দেবে?
প্রণব খুব আশ্চর্য হইল না। ইহাদের কার্যকলাপ সে কিছু কিছু জানে, এক অপ্রকৃতিস্থ মাতাল যুবকের নিকট হইতে ইহারা এক রাত্রিতে হাজার টাকা অসৎ উপায়ে উপার্জন করিয়া বড়ো গলায় সেইটাই আবার বাহাদুরি করিয়া জাহির করিতেছে! হতভাগ্য যুবকটির জন্য প্রণবের কষ্ট হইল—মত্ত অবস্থায় সে যে কি সই করিল, কত টাকা তাহার বদলে পাইল, হয়তো বা তাহা সে বুঝিতেও পারিল না।
কলিকাতা হইতে সে মামার বাড়ি আসিল। মাতৃসমা বড়ো মামিমা আর ইহজগতে নাই, গত বৎসর পূজার সময় তিনি—প্রণব তখন জেলে। সেখানেই সে সংবাদটা পায়। গঙ্গানন্দকাটির ঘাটে নৌকা ভিড়িতে তাহার চোখ ছলছল করিয়া উঠিল। কাল ট্রেনে সারা রাত ঘুম হয় নাই আদৌ, তাড়াতাড়ি স্নানাহার সারিয়া দোতলায় কোণেব ঘরে বিশ্রামের জন্য যাইয়া দেখিল, বিছানার উপর একটি পাঁচ ছয় বৎসরের ছেলে চুপ করিয়া শুইয়া! দেখিয়া মনে হইল, একরাশ বাসি গোলাপফুল কে যেন বিছানার উপর উপুড় করিয়া ঢালিয়া রাখিয়াছে—-হা, সে যাহা ভাবিয়াছে তাই-জ্বরে ছেলেটির গা যেন পুড়িয়া যাইতেছে, মুখ জুরের ধমকে লাল, ঠোঁট কাঁপিতেছে, কেমন যেন দিশেহারা ভাব। মাথার দিকে একখানা রেকাবিতে দুখানা আধ-খাওয়া ময়দাব রুটি ও খানিকটা চিনি। প্রণব জিজ্ঞাসা করিল—তুমি কাজল, না?
