ভবানী নিয়ে যেতে চান না বাইরের কোনো তৃতীয় ব্যক্তিকে, তিনি অস্বস্তি বোধ করেন। ভগবানের উপাসনা এক হয় নিভৃতে, নতুবা হয় সমধর্মী মানুষদের সঙ্গে। তিলু বিশেষ করে তাকে অনুরোধ করলে নিস্তারিণীর জন্যে।
সকলে স্নান শেষ করলে। শেষ সূর্যের রাঙা আলো পড়েছে ওপারের কাশবনে, সাঁইবাবলা ঝোপের মাথায়, জলচর পক্ষীরা ডানায় রক্ত সূর্যের শেষ আলোর আবির মাখিয়ে পশ্চিমদিকের কোনো বিল-বাঁওড়ের দিকে চলেচে–সম্ভবত নাকাশিপাড়ার নিচে সামটার বিলের উদ্দেশে।
ভবানী বললেন–বৌমা, এদের দেখাদেখি হাত জোড় কর–তারপর মনে মনে বা মুখে বলো–কিংবা শুধু শুনে যাও।
ওঁ যো দেবা অগ্নৌ যো অপসু, যো বিশ্বং ভুবনং আবিবেশ।
যঃ ওষধিষু যো বনস্পতি্যু, তস্মৈ দেবায় নমোনমঃ।
যিনি অগ্নিতে, যিনি জলেতে
যিনি শোভনীয় ক্ষিতিতলেতে যি
নি তৃণতরু ফুলফলেতে
তাঁহারে নমস্কার।
যিনি অন্তরে যিনি বাহিরে
যিনি যে দিকে যখন চাহিরে
খোকাও তার মা-বাবার সঙ্গে সুললিত কণ্ঠে এই মন্ত্রটি গাইলে।
তারপর ভবানী বাঁড়ুয্যে বললেন–খোকা, এই পৃথিবী কে সৃষ্টি করেচে? খোকা নামতার অঙ্ক মুখস্থ বলবার সুরে বললে–ভগবান।
–তিনি কোথায় থাকেন?
–সব জায়গায়, বাবা।
–আকাশেও?
–সব জায়গায়।
–কথা বলেন?
–হ্যাঁ বাবা।
–তোমার সঙ্গেও বলবেন?
–হ্যাঁ বাবা, আমি চাইলে তিনিও চান। আমি ছাড়া নন তিনি।
এসব কথা অবিশ্যি ভবানীই শিখিয়েছেন ছেলেকে। ছেলেকে বিশেষ কোনো বিত্ত তিনি দিয়ে যেতে পারবেন না। তাঁর বয়েস হয়েচে, এই ছেলেকে নাবালক রেখেই তাঁকে বিদায় নিয়ে চলে যেতে হবে মহাপ্রস্থানের পথে। কি জিনিস তিনি দিয়ে যাবেন একে আজকার অবোধ বালক তার উত্তরজীবনের জ্ঞানবুদ্ধির আলোকে একদিন পিতৃদত্ত যে সম্পদকে মহামূল্য বলে ভাবতে শিখবে, চিনতে শিখবে, বুঝতে শিখবে?
ঈশ্বরের অস্তিত্বে বিশ্বাস। ঈশ্বরের প্রতি গভীর অনুরাগ।
এর চেয়ে অন্য কোনো বেশি মূল্যবান সম্পদের কথা তার জানা নেই।
খুব বেশি বুদ্ধির প্যাঁচের দরকার হয় না, সহজ পথে সহজ হয়েই সেই সহজের কাছে পৌঁছানো যায়। দিনের পর দিন এই ইছামতীর তীরে বসে এই সত্যই তিনি উপলব্ধি করেছেন। সন্ধ্যায় ওই কাশবনে, সাঁইবাবলার ডালপালায় রাঙা ঝোপটি ম্লান হয়ে যেতো, প্রথম তারাটি দেখা দিত তাঁর মাথার ওপরকার আকাশে, ঘুঘু ডাকতো দুরের। কাশবনে, বনশিমফুলের সুগন্ধ ভেসে আসতো বাতাসে–তখনই এই নদীতটে বসে কতদিন তিনি আনন্দ ও অনভুতির পথ দিয়ে এসে। তাঁর মনের গহন গভীরে প্রবেশ করতে দেখেছিলেন এই সত্যকে এই চির পুরাতন অথচ চির নবীন সত্যকে। বুঝেছেন এই সত্যটি যে, ভগবানের আসল তত্ত্ব শুধু স্বরূপে সীমাবদ্ধ নয়, স্বরূপ ও লীলাবিলাস দুটো মিলিয়ে ভগবৎতত্ত্ব। কোনোটা ছেড়ে কোনোটা পূর্ণ নয়। এই শিশু, এই নদীতীর সেই তত্ত্বেরই অন্তর্ভুক্ত জিনিস। সে থেকে পৃথক নয়–সেই মহা-একের অংশ মাত্র।
নিস্তারিণী খুব মুগ্ধ হল। তার মধ্যে জিনিস আছে। কিন্তু গৃহস্থঘরের বৌ, শুধু রাঁধা-খাওয়া, ঘরসংসার নিয়েই আছে। কোনো একটু ভালো
কথা কখনো শোনে না। এমন ধরনের ব্যাপার সে কখনো দেখে নি। তিলুকে বললে–দিদি, আমি আসতে পারি?
–কেন পারবি নে?
–ঠাকুরজামাই আসতে দেবেন?
–না, তোকে মারবে এখন।
–আমার বড় ভালো লাগলো আজ। কে এসব কথা এখানে। শোনাবে দিদি? আমার জন্যে শুধু ঝাঁটা আর লাথি। শুধু শাশুড়ির গালাগাল দুবেলা। তাও কি পেট ভরে দুটো খেতি পাই? হ্যাঁ পাপ। করিচি, স্বীকার করচি। তখন বুদ্ধি ছিল না। যা করিচি, তার জন্য ভগবানের কাছে বলি, আমারে আপনি যা শাস্তি হয় দেবেন।
–থাক ওসব কথা। তুই রোজ আসবি যখন ভালো লাগবে।
–ঠাকুরজামাই দেবতার তুল্য মানুষ। এ দিগরে অমন মানুষ নেই। আমার বড় সৌভাগ্যি যে তোমাদের সঙ্গ প্যালাম। ঠাকুরজামাইকে একদিন নেমন্তন্ন করে খাওয়াতি বড় ইচ্ছে করে।
–তা খাওয়াবি, ওর আর কি?
–আমার যে বাড়ি সে রকম না। জানোই তো সব। লুকিয়ে লুকিয়ে একটু তরকারি নিয়ে আসি–কেউ জানতি পারে না। জানলি কত কথা উঠবে।
–আমাকে কি নিলুকে সেইসঙ্গে নেমন্তন্ন করিস, কোনো কথা উঠবে না।
ওরা ঘাটের ওপরে উঠেচে, এমন সময়ে দেখা গেল সেই পথ। বেয়ে রামকানাই কবিরাজ এদিকে আসচেন। রামকানাই ভিন্ গাঁ থেকে রোগী দেখে ফিরচেন, খালি পা, হাঁটু অবধি ধুলো, হাতে একটা জড়িবুটি-ওষুধের পুঁটুলি। তিলু পায়ের ধুলো নিয়ে প্রণাম করলে, দেখাদেখি নিস্তারিণীও করলে। রামকানাই সঙ্কুচিত হয়ে বললেন– ওকি, ওকি দিদি? ও সব কোরো না। আমার বড় লজ্জা করে। চলো সবাই আমার কুঁড়েতে। আজ যখন বাঁড়ুয্যেমশাইকে পেইচি তখন সন্দেটা কাটবে ভালো।
রামকানাই চক্রবর্তী থাকেন চরপাড়ায়, এই গ্রামের উত্তর দিকের বড় মাঠ পার হলেই চরপাড়ার মাঠ। তিলু নিস্তারিণীকে বললে–তুই ফিরে যা বাড়ি–আমরা যাচ্চি চরপাড়ার মাঠে
–আমিও যাবো।
–তোর বাড়িতি কেউ বকবে না?
–বকলে তো বয়েই গেল। আমি যাবো ঠিক।
–চলো। ফিরতি কিন্তু অনেক রাত হবে বলে দিচ্চি।
–তোমাদের সঙ্গে গেলি কেউ কিছু বলবে না। বললিও আমার তাতে কলা। ওসব মানিনে আমি।
অগত্যা ওকে সঙ্গে নিতেই হল। রামকানাইয়ের বাড়ি পৌঁছে সবাই মাদুর পেতে বসলো। রামকানাই রেড়ির তেলের দোতলা পিদিম জ্বাললেন। তারপর হাত-পা ধুয়ে এসে বসে সন্ধ্যাক্কি করলেন। ওদের বললেন–একটু কিছু খেতি হবে।–কিছুই নেই, দুটো চালভাজা। মা লক্ষ্মীরা মেখে নেবে না আমি দেবো?
