–কি?
–আনচি, বসুন।
খানিক পরে ঘর থেকে একখানা ছোট ছাপানো বই হাতে নিয়ে এসে প্রসন্ন আমিনের সামনে দিয়ে বললে–দেখুন। দাঁড়ান, ও কি? একখানা দা নিয়ে আসি, বেশ করে ধুয়ে দিচ্চি। ফল খান।
–শোনো শোনো। এ বই কোথায় পেলে? তোমার ঘরে বই? কি বই এখানা?
–দেখুন। আমি কি লেখাপড়া জানি?
–সেই কবিরাজ বুড়ো দিয়েছে বুঝি? পড়তে জানো না, বই দিলে। কেন?
–দেলে, নিয়ে এ্যালাম। কৃষ্ণের শতনাম।
প্রসন্ন আমিন বিস্মিত হয়ে গেল দস্তুরমতো। গয়ামেমের বাড়ি ছাপনো বই, তাও নাকি কৃষ্ণের শতনাম!..নাঃ!
বসে বসে ফলগুলো সে খেলে দা দিয়ে কেটে। আধখানা পেঁপে গয়ার জন্যে রেখে দিলে। হেসে বললে–এখানডায় আসতি ভালো লাগে। তোমার কাছে এলি সব দুধু ভুলে যাই, গয়া।
–ওইসব কাজে কথা আবার বকতি শুরু করলেন! আসবেন তো আসবেন। আমি কি আসতি বারণ করিচি?
–তাই বলো। প্রাণডা ঠাণ্ডা হোক।
–ভালো। হলেই ভালো।
–কৃষ্ণের শতনাম বই কি করবে?
–মাথার কাছে রেখে শুই। বাড়িতি কেউ নেই। মা থাকলি কথা ছিল না। ভূতপ্রেত অবদেবতার ভয় কেটে যায়। একা থাকি ঘরে।
-তা ঠিক।
–ইদিকি পাড়াসুদু শব্দুর। কুঠির সায়েব বেঁচে থাকতি সবাই– খোশামোদ করতো, এখন রাতবিরাতে ডাকলি কেউ আসবে না, তাই ঐ বইখানা দিয়েছেন বাবা, কাছে রেখে শুলি ভয়ভীত থাকবে না বলি দিয়েছেন। বড় ভালো লোক।… আজ ধান ভানতি না গেলি খাওয়া। হবে না, চাল নেই। তাও কেউ টেকি দেয় না এ-পাড়ায়। ও পাড়ায়। কেনারাম সর্দারের বাড়ি যাব ধান ভানতি। তারা ভালো। জাতে বুনো বটে, কিন্তু তাদের মধ্যি মানুষতো আছে খুড়োমশাই।
প্রসন্ন চক্কত্তি সেদিন উঠে এল একটু বেশি বেলায়। তার মনে বড় কষ্ট হয়েচে গয়াকে দেখে। একটা মাদারগাছতলায় বসলো খানিকক্ষণ গয়েশপুরের মাঠে। গয়েশপুর হল গয়ামেমদের গ্রামের নাম, শুধুই বাগদি আর কঘর জেলে ছাড়া এ গ্রামে অন্য জাতের বাসিন্দা কেউ নেই। রোদ বড়ড় চড়েচে। তবু বেশ ছায়া গাছটার তলায়।
প্রসন্ন ভাবলে বসে বসে–গয়া বড্ড বেকায়দায় পড়ে গিয়েচে। আজ যদি আমার হাতে পয়সা থাকতো, তবে ওরে অমনধারা থাকতি দেতাম? যেদিকি চোখ যায় বেরোতাম দুজনে। সে সাহস আর করতি পারি নে, বয়েসও হয়েচে, ঘরে ভাত নেই।
গাছটায় মাদার পেকেচে নাকি?…
প্রসন্ন মুখ উঁচু করে তাকিয়ে দেখলে। না, পাকে নি।
.
বিকেলের দিকে ভবানী ভাগবত পাঠ করে উঠলেন। তিনি জানেন, ভাগবত অতি দুরূহ ও দূরাবাগাহ গ্রন্থ। যেমন এর চমৎকার কবিত্ব, তেমনি অপূর্ব এর তত্ত্ব। অনেকক্ষণ ভাগবত পাঠ করে পুঁথি বাঁধবার সময় দেখলেন ও-পাড়ার নিস্তারিণী এসে উঠানে পা দিলে। নিস্তারিণী আজকাল ভবানীর সঙ্গে কথা বলে। অবশ্য এই বাড়ির মধ্যেই বাইরে কোথাও নয়।
নিস্তারিণী কাছে এসে বললেও ঠাকুরজামাই?
–এস বৌমা। ভালো?
–যেমন আশীৰ্ব্বাদ করেছেন। একটা কথা বলতে এইলাম।
–কি বলো?
-বুড়ো কবিরাজমশায়ের বাড়ি ধম্ম-কথা হয়, গান হয়, আমি যেতি পারি? আমার বড় ইচ্ছে করে।
-না বৌমা। সে হোলো গাঁয়ের বাইরে মাঠে। সেখানে কেউ যায়।
–আচ্ছ, দিদি গেলি?
–তোমার দিদি যায় না তো।
–যদি আমি তার ব্যবস্থা করি?
–সেখানে গিয়ে তুমি কি করবে?
আমার ভালো লাগে। দুটো ভালো কথা কেউ বলে না এ গাঁয়ে, তবুও একটু গান হয়, ভালো বই পড়া হয়, আমার বড় ভালো লাগে।
–তোমার শ্বশুরবাড়িতে শাশুড়ি কি তোমার স্বামীর মত নিয়েচ?
–উনি মত দেবেন। মা মত দেন কি না দেন। বুড়ি বড় ঝানু। না দিলে তো বয়েই গেল, আমি যাবো ঠিক।
–ছিঃ, ওই তো তোমার দোষ বৌমা! অমন করতে নেই।
–আপনার মুখে শান্তর পাঠ শুনবার বড় ইচ্ছে আমার।
পরে একটু অভিমানের সুরে বললে–তা তো আপনি চান নি, সে আমি জানি।
–কি জানো?
–আপনি পছন্দ করেন না যে আমি সেখানে যাই।
–সে কথা আবার কি করে তুমি জানলে?
–আমি জানি।
–আচ্ছা, তোমার দিদি যদি কখনো যায় তবে যেও।
–যা মন চায় তা করা কি খারাপ?
প্রশ্নটি বড় অদ্ভুত লাগলো ভবানীর। বললেন–তোমার বয়েস হয়েচে বৌমা, খুব ছেলেমানুন নও, তুমিই বোঝে, যা ভাবা যায় তা কি করা উচিত? খারাপ কাজও তো করতে পারো।
–পাপ হয়?
–হয়।
–তবে আর করবো না, আপনি যখন বলচেন তখন সেটাই ঠিক।
–তুমি বুদ্ধিমতী, আমি কী তোমাকে বলবো!
–আপনি যা বলবেন, আমার কাছে তাই খুব বড় ঠাকুরজামাই। আমি অন্য পথে পা দিতি দিতি চলে এ্যালাম শুধু দিদির আর আপনার পরামর্শে। আপনি যা বলবেন, আমার দুঃখু হলিও তাই করতি হবে, সুখ হলিও তাই করতি হবে, আমার গুরু আপনি।
–আমি কারো গুরুফুরু নই বৌমা। ওসব বাজে কথা।
–আপনি দো-ভাজা চিঁড়ে খাবেন নারকেলকোরা দিয়ে? কাল এনে দেবো। নতুন চিড়ে কুটিচি।
–এনো বৌমা।
এই সময়ে খোকা খেলা করে বাড়ি ফিরে এল। মাকে বললে–মা নদীতে যাবে না?
ওর মা বললে–তুই কোথায় ছিলি এতক্ষণ?
-কপাটি খেলছিলাম হাবুদের বাড়ি। চলো যাই। আমি ছুটে এলাম সেই জন্যি। এসে ইংরিজি পড়বো। পড়তি শিখে গিইচি।
প্রায়ই সন্ধ্যার আগে ভবানী দুই স্ত্রী ও ছেলেকে নিয়ে নদীর ঘাটে যান। সকলেই সাঁতার দেয়, গা হাত পা ধোয়। তারপর ভগবানের উপাসনা করে। খোকা এই নদীতে গিয়ে স্নান ও উপাসনা এত ভালবাসে যে প্রতি বিকেলে মাদের ও বাবাকে ও-ই নিয়ে যায় তাগাদা দিয়ে। আজও সে গেল ওদের নিয়ে, উপরন্তু গেল নিস্তারিণী। সে। নাছোড়বান্দা হয়ে পড়লো, তাকে নিয়ে যেতেই হবে।
