তারপর খানিকটা চুপ করে থেকে আবার বললে–you will not be looking at the moon, will you? Your name and pro fession?
গয়া বললে-বুঝলে বাবা, এই রকম করচে কাল থেকে। শুধু মাথামুণ্ডু বকুনি।
রামকানাই একমনে রোগীর নাড়ি দেখছিল। রোগীর হাত দেখে সে বললে–ক্ষীণে বলবতী নাড়ি, সা নাড়ি প্রাণঘাতিকা–একটু মৌরির জল খাওয়াবে মাঝে মাঝে। আমি যে ওষুধ দেবো, তার সহপান। যোগাড় করতি হবে মা, অনুপানের চেয়ে সহপান বেশি দরকারি–আমি দেবো কিছু কিছু জুটিয়ে আমার জানা আছে–একটা লোক আমার সঙ্গে দিতি হবে।
শিপটন সাহেব খাট থেকে উঠবার চেষ্টা করে বললেYou see, old medicine man, I have too many things to do this summer to have any time for your rigmarole-you Just
শ্রীরাম মুচি ও গয়া সাহেবকে আবার জোর করে খাটে শুইয়ে দিলে।
গয়া আদরের সুরে বললে–আঃ, বকে না, ছিঃ
সাহেব রামকানাইয়ের দিকে চেয়েই ছিল। খানিকটা পরে বলে TOGI- Shall I get you a glass of vermouth, my good man–এক গ্লাস মড় খাইবে? ভালো মড়–oh, that reminds ne, when I am going to have my dinner? আমার খানা কখন দেওয়া হইবে? খানা আনো–
পরের দুরাত অত্যন্ত ছটফট করার পরে, গয়াকে বকুনি ও চিৎকারের দ্বারা উত্ত্যক্ত ও অতিষ্ঠ করার পরে, তৃতীয় দিন দুপুর থেকে নিঝুম মেরে গেল। কেবল একবার গভীর রাত্রে চেয়ে চেয়ে সামনে গয়াকে দেখে বললে–Where am I?
গয়া মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে বললে–কি বলচো সায়েব? আমায় চিনতি পারো?
সাহেব খানিকক্ষণ চেয়ে চেয়ে বললে–what wages do you get here?
সেই সাহেবের শেষ কথা। তারপর ওর খুব কষ্টকর নাভিশ্বাস উঠলো এবং অনেকক্ষণ ধরে চললো। দেখে গয়া বড় কান্নাকাটি করতে লাগলো। সাহেবের বিছানা ঘিরে শ্রীরাম মুচি, দেওয়ান হরকালী, প্রসন্ন আমিন, নরহরি পেশকার, নফর মুচি সবাই দাঁড়িয়ে। দেওয়ান হরকালী বললে–এ কষ্ট আর দেখা যায় না–কি যে করা যায়!
কিন্তু শিপটন সাহেবের কষ্ট হয় নি। কেউ জানতো না সে তখন বহুদূরে স্বদেশের ওয়েস্টমোরল্যান্ডের অ্যাল্ডসি গ্রামের ওপরকার পার্বত্যপথ রাইনোজ পাস্ দিয়ে ও আর এলম গাছের ছায়ায় ছায়ায় তাঁর দশ বছর বয়সের ছোট ভাইয়ের সঙ্গে চলেছিল খরগোশ শিকার। করতে, কখনো বা পার্বত্য হ্রদ এলটার-ওয়াটারের বিশাল বুকে নৌকোয় চড়ে বেড়াচ্ছিল, সঙ্গে ছিল তাদের।
গ্রেট ডেন কুকুরটা কিংবা কখনো মস্ত বড় পাইক আর কার্প মাছ বঁড়শিতে গেঁথে ডাঙায় তুলতে ব্যস্ত ছিল…আর সব সময়েই ওর কানে ভেসে আসছিল তাদের গ্রামের ছোট্ট গির্জাটার ঘণ্টাধ্বনি, বহুদূর থেকে তুষার-শীতল হাওয়ায় পাতাঝরা বীচ গাছের আন্দোলিত শাখা প্রশাখার মধ্যে দিয়ে দিয়ে…
.
তিলু ডুমুরের ডালনার সবটা স্বামীর পাতে দিয়ে বললে–খান। আপনি।
ভিজে গামছা গায়ে ভবানী খেতে খেতে বললেন–উঁহু উঁহু, কর কি?
–খান না, আপনি ভালোবাসেন!
–খোকা খেয়েছে?
–খেয়ে কোথায় বেরিয়েচে খেলতে। ও নিলু, মাছ নিয়ে আয়। খয়রা ভাজা খাবেন আগে, না চিংড়ি মাছ?
-খয়রা কে দিলে–
দেবে আবার কে? রাজারা সোনা কোথায় পায়? নিমাই জেলে আর ভীম দিয়ে গেল। দুপয়সার মাছ। আজকাল আবার কড়ি চলচে না হাটে। বলে, তামার পয়সা দাও।
কালে কালে কত কি হচ্ছে! আরো কত কি হবে! একটা কথা শুনেচে?
–কি?
এই সময় নিলু খয়রা মাছ ভাজা পাতে দিয়ে দাঁড়ালো কাছে। ভবানী তাকে বসিয়ে গল্পটা শোনালেন। তাদের দেশে রেল লাইন বসচে, চুয়োডাঙা পর্যন্ত লাইন পাতা হয়ে গিয়েচে। কলের গাড়ি এই বছর যাবে কিংবা সামনের বছর। তিলু অবাক হয়ে বাউটিশোভিত হাত দুটি মুখে তুলে একমনে গল্প শুনছিল, এমন সময় রান্নাঘরের ভেতর থেকে ঝনঝন করে বাসনপত্র যেন স্থানচ্যুত হবার শব্দ হল। নিলু খয়রা মাছের পাত্রটা নামিয়ে রেখে হাত মুঠো করে চিবুকে দিয়ে গল্প শুনছিল, অমনি পাত্র তুলে নিয়ে দৌড় দিলে রান্নাঘরের দিকে। ঘরের মধ্যে গিয়ে তাকে বলতে শোনা গেল–যাঃ যাঃ, বেরো আপদ
তিলু ঘাড় উঁচু করে বললে–হ্যাঁরে নিয়েছে?
–বড় বেলে মাছটা ভেজি রেখেছি ওবেলা খোকাকে দেবো বলে, নিয়ে গিয়েচে।
–ধাড়ীটা না মেদিটা?
–ধাড়ীটা।
–ওবেলা ঢুকতি দিবি নে ঘরে, ঝাঁটা মেরে তাড়াবি।
ভবানী বললেন–সেও কেষ্টর জীব। তোমার আমার না খেলে খাবে কার! খেয়েছে বেশ করেছে। ও নিলু চলে এসো; গল্প শোনো। আর দুদিন পরে বেঁচে থাকলে কলের গাড়ি শুধু দেখা নয়, চড়ে শান্তিপুরে রাস দেখে আসতে পারবে।
নিলু ততক্ষণ আবার এসে বসেচে খালি হাতে। ভবানী গল্প করেন। অনেক কুলি এসেচে, গাঁইতি এসেচে, জঙ্গল কেটে লাইন পাতচে। রেলের পাটি তিনি দেখে এসেছেন। লোহার হঁটের মতো, খুব লম্বা। তাই জুড়ে জুড়ে পাতে।
তিলু বললে–আমরা দেখতে যাবো।
–যেও, লাইন পাতা দেখে কি হবে। সামনের বছর থেকে রেল চলবে এদিকে। কোথায় যাবে বলো।
নিলু বললে–জষ্টি যুগল। দিদিও যাবে।
যুগল দেখিলে জষ্টি মাসে
পতিসহা থাকে স্বর্গবাসে—
উঃ, বড্ড স্বামীভক্তি যে দেখচি!
–আবার হাসি কিসের? খাড় পৈঁছে আর নোয়া বজায় থাকুক, তাই বলুন। মেজদি ভাগ্যিমানি ছিল–এক মাথা সিঁদুর আর কস্তাপেড়ে শাড়ি পরে চলে গিয়েচে, দেখতি দেখতি কতদিন হয়ে গেল।
