তুলসী বললেও সব সায়েবদের খাবার হাঁড়িতে দেওয়া যায় না সব সময়।
–কে তোমাকে বলেচে সায়েবদের খাবার? আমাদের দেশে চাষ হচ্ছে যথেষ্ট। আমি মোকামের খবর রাখি। কালনা কাটোয়া মোকামের আলু সস্তা, অনেক চাষ হয়। আমাদের গাঁ-ঘরে আনলি, তেমন বিক্রি হয় না, নইলে আমি কালনা থেকে আলু আনতে পারি নে, না খবর রাখি নে! শহরে চলে, গাঁয়ে কিনবে কে?
তুলসী বললে–ঢেঁকি কিনা? স্বগগে গেলেও ধান ভানে। ব্যবসা আর কেনা-বেচা। এখানে এসেও তাই।
.
এই তাজ্জব ভ্রমণের গল্প নালু পালকে কতদিন ধরে করতে হয়েছিল গ্রামের লোকদের কাছে। কিন্তু এর চেয়েও একটা তাজ্জব ব্যাপার ঘটে গেল একদিন। শীতকালের মাঝামাঝি একদিন দেওয়ান হরকালী সুর আর নরহরি পেশকার এসে হাজির হল ওর আড়তে। নালু পাল ও সতীশ কলু তটস্থ হয়ে শশব্যস্ত হয়ে ওদের অভ্যর্থনা করলে। তখনি পান-তামাকের ব্যবস্থা হল। নীলকুঠির দেওয়ান, মানী লোক, হঠাৎ কারো কাছে যান না। একটু জলযোগের ব্যবস্থা করবার জন্যে সতীশ কলু নবু ময়রার দোকানে ছুটে গেল। কিছুক্ষণ পরে দেওয়ানজি তাঁর আসার কারণ প্রকাশ করলেন, বড়সাহেব কিছু টাকা ধার চান। বেঙ্গল ইণ্ডিগো কসার মোল্লাহাটির কুঠি ছেড়ে দিচ্ছে, নীলের ব্যবসা মন্দা পড়েছে বলে তারা এ কুঠি রাখতে চায় না। শিপটন সাহেব নিজ সম্পত্তি হিসেবে এ কুঠি রাখতে চান, এর বদলে পনেরো হাজার টাকা দিতে হবে বেঙ্গল ইণ্ডিগো কন্সারকে। এই কুঠিবাড়ি বন্ধক দিয়ে বড়সাহেব নালু পালের কাছে টাকা চায়।
নরহরি পেশকার বললে–কুঠিটা বজায় রাখার এই একমাত্র ভরসা। নইলে চৈত্র মাস থেকে নীলকুঠি উঠে গেল। আমাদের চাকুরি তো চলে গেলই, সাহেবও চলে যাবে।
দেওয়ান হরকালী বললেন–বড় সায়েবের খুব ইচ্ছে নিজে কুঠি চালিয়ে একবার দেখবেন। এতকাল এদেশে কাটিয়ে আর কোথাও যেতে ইচ্ছে করে না। দেশে কেউ নেইও তো, মেমসায়েব তো মারা গিয়েচেন। একটা মেয়ে আছে, সে এদেশে কখনো আসে নি।
নালু পাল হাত জোড় করে বললে–এখন কিছু বলতে পারবো না দেওয়ানবাবু। ভেবে দেখতি হবে–তা ছাড়া আমার একার ব্যবসা না, অংশীদারের মত চাই। তিনচারদিন পরে আপনাকে জানাবো।
দেওয়ান হরকালী সুর বিদায় নিয়ে যাবার সময় বললেন–তিন দিন কেন, পনেরো দিন সময় আপনি নিন পালমশায়। মার্চ মাসে টাকার দরকার হবে, এখনো দেরি আছে–
তুলসী শুনে বললে-বল কি!
–আমিও ভাবচি। কিসে থেকে কি হোলো!
–টাকা দেবে?
–আমার খুব অনিচ্ছে নেই। অত বড় কুঠিবাড়ি, দেড়শো বিঘে খাস জমি, বড় বড় কলমের আমের বাগান, ঘোড়া, গাড়ি, মেজ কেদারা, ঝাড়লণ্ঠন সব বন্দক থাকবে। কুঠির নেই-নেই এখনো অনেক আছে। কিন্তু সতে কলুর দ্যাখলাম ইচ্ছে নেই। ও বলে–আমরা আড়তদার লোক, হ্যাংগামাতে যাওয়ার দরকার কি? এরপর হয়তো ওই নিয়ে। মামলা করতি হবে।
সমস্ত রাত নালু পালের ঘুম হল না। বড়সাহেব শিল্ট..টমটম করে যাচ্চে…কুঠির পাইক লাঠিয়াল…দদবা রব্বা..মারো শ্যামচাঁদ…. দাও ঘর জ্বালিয়ে…সে মোল্লাহাটির হাটে পানসুপুরির মোট নিয়ে বিক্রি করতি যাচ্চে।
টাকা দিতে বড় ইচ্ছে হয়।
৬. একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা
এই বছরে আর একটা উল্লেখযোগ্য ঘটনা ঘটে গেল। আফগান যুদ্ধজয়ের উৎসব ছাড়াও।
মাত্র কয়েক দিনের জ্বরে বড়সাহেব হঠাৎ মারা গেল মার্চ মাসের শেষে।
সাহেব যে অমন হঠাৎ মারা যাবে তা কেউ কল্পনা করতে পারে
অসুখের সময় গয়ামেম যেমন সেবা করেচে অমন দেখা যায় না। রোগের প্রথম অবস্থা থেকেই সে রোগীর কাছে সর্বদা হাজির থাকে। জ্বরের ঝোঁকে শিপটন বকে, কি সব গান গায়। গয়া বোঝে না সাহেবের কি সব কিচিরমিচির বুলি।
ওকে বললে–গয়া শুনো
–কি গা?
–ব্রাণ্ডি ডাও। ডিটে হইবে টোমায়।
গয়া কদিন রাত জেগেচে। চোখ রাঙা, অসভৃত কেশপাশ, অসভৃত বসন। সাহেবের লোকলস্কর দেওয়ান আরদালি আমিন সবাই সর্বদা দেখাশুনা করচে তটস্থ হয়ে, কুঠির সেদিন যদিও এখন আর নেই, তবুও এখনো ওরা বেঙ্গল ইণ্ডিগো কোম্পানির বেতনভোগী ভৃত্য। কিন্তু গয়া ছাড়া মেয়েমানুষ আর কেউ নেই। সে-ই সর্বদা দেখাশুনো করে, রাত জাগে। গয়া মদ খেতে দিলে না। ধমকের সুরে বললে না, ডাক্তারে বারণ করেচে–পাবে না।
শিপটন ওর দিকে চেয়ে বললে–Dearie, I adore you, বুঝলে? I adore you.
–বকবে না।
–ব্র্যাণ্ডি ডাও, just a little, wont you?
–না। মিছরির জল দেবানি।
-Oh, to the hell with your candy water! When I am getting my peg? ব্রাণ্ডি ডাও
–চুপ করো। কাশি বেড়ে যাবে। মাথা ধরবে।
–শিপটন সাহেব খানিকক্ষণ চুপ করে রইল। দুদিন পরে অবস্থা খারাপ হয়ে পড়লো। দেওয়ান হরকালী সুর সাহেবকে কলকাতায় পাঠাবার খুব চেষ্টা করলেন। সাহেবের সেটা দেখা গেল একেবারেই ইচ্ছে নয়। মহকুমার শহর থেকে প্রবীণ অক্ষয় ডাক্তারকে আনানো হল, তিনিও রোগীকে নাড়ানাড়ি করতে বারণ করলেন।
একদিন রামকানাই কবিরাজকে আনালে গয়ামেম।
রামকানাই কবিরাজ জড়িবুটির পুঁটলি নিয়ে রোগীর বিছানার পাশে একখানা কেদারার ওপর বসে ছিলেন, সাহেব ওঁর দিকে চেয়ে চেয়ে বললে- Ah! The old medicine man! When did I meet you last, my old medicine man? টোমাকে জবাব দিতে হইতেছে–আমি জবাব চাই
