সুতরাং দীনু ভটচা যখন চোখ বড় বড় করে এসে বললে–শুনেচ হে আমাদের নালু পালের কাণ্ড?
সকলে আগ্রহের সুরে এগিয়ে এসে বললে–কি, কি হে শুনি?
–সতীশ কলু আর নালু পাল তামাক কিনে মোটা টাকা লাভ করেচে, দুদশ নয়, অনেক বেশি। দশ বিশ হাজার!
সকলে বিস্ময়ের সুরে বলে উঠলো–সে কি! সে কি!
দীনু ভটচার্য বললেন–অনেকদিন থেকে ওরা তলায় তলায় কেনাবেচা করচে মোকামের মাল। এবার ধারে ভাজনঘাট মোকাম থেকে এক কিস্তি মাল রপ্তানি দেয় কলকাতায়। সতীশ কলুর শালা বড় আড়তদারি করে ওই ভজনঘাটেই। তারই পরামর্শে এটা ঘটেছে। নয়তো এরা কি জানে, কি বোঝে? বাস, তাতেই লাল।
ফণি চক্কত্তি বললেন, হ্যাঁ, আমিও শুনিচি। ওসব কথা নয়। সতীশ কলুর শালাটালা কিছু না। নালু পালের শ্বশুরের অবস্থা বাইরে একরকম ভেতরে একরকম। সে-ই টাকাটা ধার দিয়েছে।
হরি নাপিত সকলকে কামাতে এসেছিল, সে গ্রাম্য নাপিত, সকালে। এখানে এলে সবাইকে একত্র পাওয়া যায় বলে বারের কামানোর দিন সে এখানেই আসে। এসেই কামায় না, তামাক খায়। সে কল্কে খেতে খেতে নামিয়ে বললে–না, খুললামশাই। বিনোদ প্রামাণিকের অবস্থা ভালো না, আমি জানি। আড়তদারি করে ছোটখাটো, অত পয়সা কনে পাবে?
–তলায় তলায় তার টাকা আছে। জামাইকে ভালবাসে, তার ওই এক মেয়ে। টাকাটা যে কোরেই হোক, যোগাড় করে দিয়েছে জামাইকে। টাকা না হলি ব্যবসা চলে?
জিনিসটার কোনো মীমাংসা হোক আর না হোক নালু পাল যে অর্থবান হয়ে উঠেচে, ছমাস এক বছরের মধ্যে সেটা জানা গেল। ভালোভাবে যখন সে মস্ত বড় ধানচালের সায়ের বসালে পটপটিতলার ঘাটে। জমিদারের কাছে ঘাট ইজারা নিয়ে ধান ও সর্ষের মরসুমে দশ-বিশখানা মহাজনি কিস্তি রোজ তার সায়েরে এসে মাল নামিয়ে উঠিয়ে কেনাবেচা করে। দুজন কয়াল জিনিস মাপতে হিমশিম খেয়ে যায়। অন্তত পঁচিশ হাজার টাকা সে মুনাফা করলে এই এক মরসুমে পটপটিতলার সায়ের থেকে। লোকজন, মুহুরী, গোমস্তা রাখলে, মুদিখানা দোকান বড় গোলদারি দোকানে পরিণত করলে, পাশে একখানা কাপড়ের দোকানও খুললে।
আগের নালু পাল ছিল সম্পন্ন গৃহস্থ, এখন সে হোলো ধনী মহাজন।
কিন্তু নালু পালকে দেখে তুমি চিনতে পারবে না। খাটো ন হাত ধুতি পরনে, খালি গা, খালি পা। ব্রাহ্মণ দেখলে ঘাড় নুইয়ে দুই হাত জোড় করে প্রণাম করে পায়ের ধুলো নেবে। গলায় তুলসীর। মালা, হাতে হরিনামের বুলি–নাঃ, নালু পাল যা এক-জীবনে করলে, অনেকের পক্ষেই তা স্বপ্ন।
যদি তুমি জিজ্ঞেস করলে–পালমশায়, ভালো সব?
বিনীতভাবে হাতজোড় করে নালু পাল বলবে–প্রাতোপেন্নাম হই। আসুন, বসুন। না ঠাহুরমশাই, ব্যবসার অবস্থা বড় মন্দা। এসব ঠাটবাট তুলে দিতে হবে। প্রায় অচল হয়ে এসেছে। চলবে না আর। মুখের দীনভাব দেখলে অনভিজ্ঞ লোকে হয়তো নালু পালের অবস্থার বর্তমান অবনতির জন্যে দুঃখ বোধ করবে। কিন্তু ওটা শুধু বৈষ্ণবসুলভ দীন মাত্র নালু পালের, বাস্তব অবস্থার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। সায়েরেই বছরে চোদ্দ-পনেরো হাজার টাকা কেনাবেচা হয়। ত্রিশ হাজার টাকা কাপড়ের কারবারে মূলধন।
নালু পালের একজন অংশীদার আছে, সে হচ্ছে সেই সতীশ কলু। দুজনে একদিন মাথায় মোট নিয়ে হাটে হাটে জিনিস বিক্রি করতো, নালু পাল সুপুরি, সতীশ কলু তেল। তারপর হাতে টাকা জমিয়ে ছোট এক মুদির দোকান করলে নালু পাল। সতীশের পরামর্শে নালু তেঘরা শেখহাটি আর বাঁধমুড়া মোকাম থেকে সর্ষে, আলু আর তামাক কিনে এনে দেশে বেচতে শুরু করে। সতীশ এতে শূন্য বখরাদার ছিল, মোকাম সন্ধান করতো। কাঁটায় মাল খরিদ করতে ওস্তাদ ঘুঘু সতীশ কলু। কৃতিত্ব এই, একবার তাকালে বিক্রেতা মহাজন বুঝতে পারবে,
হ্যাঁ, খদ্দের বটে। সতীশ কলুর কৃতিত্ব এই উন্নতির মূলে–নালু পাল। গোড়া থেকেই সতোর জন্যে নাম কিনেছিল। দুজনের সম্মিলিত অবদানে আজ এই দৃঢ় ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানটি গড়ে উঠেছে।
স্বামী বাড়ি ফিরলে তুলসী বললে–হ্যাঁগা, এবার কালীপুজোতে অমন হিম হয়ে বসে আছ কেন?
–বড্ড কাজের চাপ পড়েচে বড়বৌ। মোকামে পাঁচশো মন মাল কেনা পড়ে আছে, আবার কোনো বন্দোবস্ত করে উঠতি পাচ্চিনে–
–ওসব আমি শুনচি নে। আমার ইচ্ছে, গাঁয়ের সব বেরাহ্মণদের এবার লুচি চিনির ফলার খাওয়াবো। তুমি বন্দোবস্ত করে দাও। আর আমার সোনার জসম চাই।
–বাবা, এবার যে মোটা খরচের ফর্দ!
–তা হোক! খোকাদের কলল্যণে এ তোমাকে কত্তি হবে। আর ছোট খোকার বোর, পাটা, নিমফল তোমাকে ওইসঙ্গে দিতি হবে।
–দাঁড়াও বড়বৌ, একসঙ্গে অমন গড়গড় করে বলো না। রয়ে বসে
–না, রতি বসতি হবে না। ময়না ঠাকুরঝিকে শ্বশুরবাড়ি থেকে আনাতি হবে–আমি আজই সয়ের মাকে পাঠিয়ে দিই।
-আরে, তারে তো কালীপুজোর সময় আনতিই হবে–সে তুমি পাঠিয়ে দাও না যখন ইচ্ছে। আবার দাঁড়াও, ব্রাহ্মণ ঠাকুরেরা কোথায় ফলার খাবেন তার ঠিক করি। চন্দর চাটুয্যে তো মারা গিয়েচেন–
–আমি বলি শোনে, ভবানী বাঁড়ুয্যের বাড়ি যদি করতি পারো! আমার দুটো সাধের মধ্যি এ হোলো একটা।
–আর একটা কি শুনতি পাই?
–খুব শুনতি পারো। রামকানাই কবিরাজকে তন্ত্ৰধার করে পুজো। করাতি হবে। অমন লোক এ দিগরে নাই।
–বোঝলাম–কিন্তু সে বড় শক্ত বড়বৌ। পয়সা দিয়ে তেনারে আনা যাবে না, সে চিজ না। ও ভবানী ঠাকুরেরও সেই গতিক। তবে তিলু দিদিমণি আছেন সেখানে সেই ভরসা। তুমি গিয়ে তেনারে ধরে রাজি করাও। ওঁদের বাড়ি হলি সব বেরাহ্মণ খেতি যাবেন।
