–এ পোড়ারমুখ আর নাই বা দেখলেন।
–তার মানে?
–আপনাদের কোন্ কাজে আর লাগবো বলুন।
–আচ্ছা গয়া
–কি?
বলেই গয়া মুখে আঁচল দিয়ে খিলখিল করে হেসে চলে যেতে উদ্যত হল।
প্রসন্ন ব্যস্ত হয়ে বললে–শোনো শোনো, চললে যে? কথা আছে।
গয়া যেতে যেতে থেমে গেল, পেছন ফিরে প্রসন্ন চক্কত্তির দিকে চিয়ে বললে–আপনার কথা খুড়োমশাই শুধু হেনো আর তেননা। শুধু তোমাকে দেখতি ভালো লাগে আর তোমার জন্য দাঁড়িয়ে আছি আর তোমার কথা ভাবছি।–এই সব বাজে কথা। যত বলি, খুড়োমশাই বলে ডাকি, আমারে অমন বলিত আছে? অমন বলবেন না। ততই। মুখির বাঁধন দিন দিন আলগা হচ্চে যেন!
প্রসন্ন চক্কত্তি হেসে বললে–কোথায় দেখলে আলগা? কি বলিচি আমি?
–শুধু তোমারে দেখতি ভালো লাগে, তোমারে কতকাল দেখি নি, তোমারে না দেখলি থাকতি পারিনে–
–মিথ্যে কথা একটাও না।
–যান, বাসায় যান দিনি। এ দুপুরবেলা রদুরি দাঁড়িয়ে থাকবেন। ভারি দুখু হবে আমার
–সত্যি গয়া, সত্যি তোমার দুখু হবে? ঠিক বলচো গয়া?
–হবে, হবে, হবে। বাসায় যান, পাগলামি করবেন না পথে দাঁড়িয়ে
–একটা কথা
–আবার একটা কথা আর একটা কথা, আর ও গয়া শোনো আর একটু, ও গয়া এখানটায় বসে একটু গল্প করা যাক–
–না। ও কথা না–
–কি তবে? হাতী না ঘোড়া?
–ও সব কথাই না। মাইরি বলচি গয়া। শোনো খুব দরকারি কথা তোমার পক্ষে। কিন্তু খুব লুকিয়ে রাখবে, কেউ যেন না শোনে—
এই দেখাশোনার কয়েকদিনের মধ্যে প্রসন্ন চক্কত্তি শশী মুচির বাজেয়াপ্তী জমির মধ্যে উৎকৃষ্ট জলি ধানের পনেরো বিঘে জমি গয়ামেমকে মেপে শ্রীরাম মুচিকে দিয়ে খোঁটা পুতিয়ে সীমানায় বাবলা গাছের চারা পুঁতে একেবারে পাকা করে গয়াকে দিয়ে দিলে। গয়া মাঠে উপস্থিত ছিল। একটা ডুমুর গাছ দেখে গয়া বললে–খুড়োমশাই ওই ডুমুরগাছটা আমার জমিতি করে দ্যান না? ডুমুর খাবো
–যদি দিই, আমার কথা মনে থাকবে গয়া
-হি হি হি হি–ওই আবার শুরু হোলো।
–সোজা কথা বললি কি এমন দোষ হয়ে যায়? কথার উত্তর দিতি কি হচ্ছে? ও গয়া–
-হি হি হি
–যাক গে। মরুক গে। আমি কিছুটি আর বলচি নে। দিলাম চেন। ঘুরিয়ে, ডুমুর গাছ তোমার রইল।
–পায়ের ধুলো নেবো, না নেবো না? বেরাহ্মণ দেবতা, তার ওপর খুড়োমশাই। কত পাপ যে আমার হবে।
গয়া এগিয়ে গিয়ে গড় হয়ে প্রণাম করলে দূর থেকে। কি প্রসন্ন হাসি ওর মুখের! কি হাসি! কচি ডুমুর গাছটা এখনো কতকাল বাঁচবে। প্রসন্ন চক্কত্তি আমিনের আজকার সুখের সাক্ষী রইল ওই গাছটা। প্রসন্ন আমিন মরে যাবে কিন্তু আজ দুপুরের ওই কচি-পাতা-ওঠা গাছটার ছায়ায় যাদের অপরূপ সুখের বার্ত লেখা হয়ে গেল, চাঁদের আলোয় যাদের চোখের জল চিকচিক করে, ফাল্গুন-দুপুরে গরম বাতাসে যাদের দীর্ঘশ্বাস ভেসে বেড়ায়–তাদের মনের সুখ-দুঃখের কথা পঞ্চাশ বছর পরে কেউ আর মনে রাখবে কি?
.
মাসকয়েক পরের কথা।
ভবানী ছেলেকে নিয়ে ইছামতীর ধারে বনশিমতলার ঘাটের বাঁকে বসে আছেন। বেলা তিন প্রহর এখনো হয় নি, ঘন বনজঙ্গলের ছায়ায় নিবিড় তীরভূমি পানকৌড়ি আর বালিহাঁসের ডাকে মাঝে মাঝে মুখর হয়ে উঠছে। জেলেরা ডুব দিয়ে যে সব ঝিনুক আর জোংড়া তুলেছিল গত শীতকালে, তাদের স্থূপ এখনো পড়ে আছে ডাঙায় এখানে ওখানে। বন্যলতা দুলচে জলের ওপর বাবলাগাছ ও বন্য যজ্ঞিডুমুর গাছ থেকে। কাকজঙ্ঘার থোলো থোলো রাঙা ফল সবুজ পাতার আড়াল থেকে উঁকি মারছে।
ভবানী বললেন–খোকা, আমি যদি মারা যাই, মাদের তুই দেখবি?
–না বাবা, আমি তা হলে কাঁদবো।
–কাঁদবি কেন, আমার বয়েস হয়েচে, আমি কতকাল বাঁচবো।
–অনেকদিন।
–তোর কথায় রে? পাগলা একটা
খোকা হি হি করে হেসে উঠলো। তারপরেই বাবাকে এসে জড়িয়ে ধরলে ছোট্ট ছোট্ট দুটি হাত দিয়ে। বললে–আমার বাবা
আমার কথা শোন। আমি মরে গেলে তুই দেখবি তোর মাদের?
–না। আমি কাঁদবো তা হলে—
–বল দিকি ভগবান কে?
–জানি নে।
–কোথায় থাকেন তিনি?
–উই ওভেনে
খোকা আঙ্গুল দিয়ে আকাশের দিকে দেখিয়ে দিলে।
–কোথায় রে বাবা, গাছের মাথায়?
হুঁ।
–তাঁকে ভালবাসিস?
–না।
–সে কি রে! কেন?
–তোমাকে ভালবাসি।
–আর কাকে?
–মাকে ভালবাসি।
–ভগবানকে ভালবাসিস নে কেন?
–চিনি নে।
–খোকা, তুই মিথ্যে কথা বলিস নি। ঠিক বলেছিস। না চিনে না বুঝে কাউকে ভালবাসা যায় না। চিনে বুঝে ভালবাসলে সে ভালবাসা পাকা হয়ে গেল। সেই জন্যেই সাধারণ লোকে ভগবানকে ভালবাসতে পারে না। তারা ভয় করে, ভালবাসে না। চিনবার বুঝবার চেষ্টা তো করেই মা কোনোদিন। আচ্ছা, আমি তোকে বোঝাবার চেষ্টা করবো। কেমন?
খোকা কিছু বুঝলে না, কেবল বাবার শেষের প্রশ্নটির উত্তরে বললে–হু-উ-উ।
–খোকন, ওই পাখি দেখতে কেমন রে?
–ভালো।
–পাখি কে তৈরি করেছে জানিস? ভগবান। বুঝলি?
খোকা ঘাড় নেড়ে বললে–হুঁ-উ।
–তুই কিছু বুঝিস নি। এই যা কিছু দেখছিস, সব তৈরি করেছেন ভগবান।
-বুঝেচি বাবা। মা বলেচে, ভগবান নক্ষত্র করেছে।
–আর কি?
–আর চাঁদ।
–আর?
–আর সূর্যি।
–হুঁ, তুই এত কথা কার কাছে শিখলি? মার কাছে? বেশ। চাঁদ ভালো লাগে?
হুঁ-উ।
–তবে দ্যাখ তো, এমন জিনিস যিনি তৈরি করেছেন, তাঁকে ভালবাসা যায় না?
–আমি ভালবাসবো।
–নিশ্চয়। কিছু কিছু ভালবেসো।
–তুমি ভালবাসবে?
হুঁ।
–মা ভালবাসবে?
হুঁ।
–আমি ভালবাসবো।
