অনেক দূরে ওয়েস্টসোরল্যাণ্ডের একটি ক্ষুদ্র পল্লী। কেউ নেই আজ সেখানে। বৃদ্ধা মাতা ছিলেন, কয়েক বৎসর আগে মারা গিয়েচেন। এক ভাই অস্ট্রেলিয়াতে থাকে, ছেলেপুলে নিয়ে।
তাদের গ্রামের সেই ছোট্ট হোটেল–আগে ছিল একটা সরাইখানা, উইলিয়াম রিটসন ছিল ল্যাণ্ডলর্ড তখন–কত লোকের ভিড় হত সেখানে! ল্যাঙডেল পাইস আর গ্রেট গেবল সামনে পড়তো…পনেরোশো ফুট উঁচু পাহাড়…ঐ সরাইখানায় কি ভিড় জমতো যারা পাহাড় দুটোতে উঠবে তাদের…
জলের ধারে উইলো আর মাউন্টেন সেজ–বরোডেল গ্রামের পাশ কাটিয়ে বিস্তৃত প্রান্তরের মধ্যে চলে গেল পথটা–কতবার ছেলেবেলায় মস্ত একটা বড় কুকুর সঙ্গে নিয়ে ঐ পথে একা গিয়েচে বেড়াতে। একটা বড় জলাশয়ে মাছ ধরতেও গিয়েচে কতদিন–এটার ওয়াটার নামটা কত পুরোনো শোনাচ্চে যেন। এটার ওয়াটার–এত বড় বড় পাইক আর স্যামন মাছ–কি মজা করেই ধরতো–রাইনোজ পাস যখন অন্ধকারে ঢেকে গিয়েচে, তখন মাছ ঝুলিয়ে হাতে করে আসচে এলটার ওয়াটার থেকে পেছনে পেছনে আসচে ভালো ব্রিডের গ্রেট ডেন কুকুরটা, মনে পড়ে–The eagles is screamin’ around us, the rivers a-moanin below
–গ্রাম্য ছড়া। এ্যাণ্ডি গাইত ছেলেবেলায়। মাছ ধরতে বসে এটার ওয়াটারের তীরে সে নিজেও কতবার গেয়েচে।
পুরানো দিনের স্বপ্ন
–গয়া, গয়া?
গয়া এসে বলে–কি সায়েব?
–কাছে বসিয়া থাকো ডিয়ারি–what have you been up-to all day? কোঠায় ছিলে? কি করিটেছিলে?
বসে আছি তো। কি আবার করবো।
–If I die here–যডি মরিয়া যাই, টুমি কি করিবে?
–ও কি কথা? অমন বলে না। ছিঃ–
–টোমাকে কিছু টাকা ডিটে চাই। কিনটু রাখিবে কোথায়? চুরি ডাকাটি হইয়া যাইবে।
শিপটন সাহেব হিঃ হিঃ করে হেসে উঠলো, বললে–একটা গান শোনো গয়া–listen carefully to the word–কঠা শুনিয়া যাও। Modern, you know?
গয়া বললে–আঃ, কি গাইবে গাও না? কটর-মটর ভালো লাগে —
–well, শোনো
Yes, yes, the arm-y
How we love the arm-y
When the swallows come again
See them fly-the arm-y
গয়া কানে আঙুল দিয়ে বললে–ওঃ বাবা, কান গেল, অত চেঁচায় না। ওর নাম কি সুর!
সাহেব বললে–ভালো লাগিল না! আচ্ছা টুমি একটা গাও–সেই যে–টোমার বড়ন চাঁদে যদি ঢরা নাহি পাবো
–না সায়েব। গান এখন থাক।
–গয়া–
–কি?
–আমি মরিলে টুমি কি করিবে?
–ও সব কথা বলে না, ছিঃ
–No, I am no milksop, I tell you–আমি কাজ বুঝি। নীলকুঠির কাজ শেষ হইলো। আমি চলিয়া যাইব, না এখানে ঠাকিব?
–কোথায় যাবে সায়েব? এখানেই থাকো।
–টুমি আমার কাছে ঠাকিবে?
–থাকবো সায়েব।
–কোথাও যাইবে না?
–না, সায়েব।
–ঠিক? May I take it as a pledge? ঠিক মনের কঠা বলিলে?
–ঠিক বলচি সায়েব। চিরকাল তোমার কাছে আছি, অনেক খাইয়েচ মাখিয়েচ–আজ তোমার অসময়ে তোমারে ফেলে কনে যাবো? গেলি ধম্মে সইবে, সায়েব!।
গয়া মেমকে নিবিড় আলিঙ্গনে আবদ্ধ করে শিপটন বললে-Oh, my dear, dearie-you are not afraid of the Big Bad Wolf-I call it a brave girl!
.
নিস্তারিণী নাইতে নেমেছিল ইছামতীর জলে। কূলে কূলে ভরা ভাদ্রের নদী, তিৎপল্লার বড় বড় হলুদ ফুল ঝোপের মাথা আলো করেচে, ওপারের চরে সাদা কাশের গুচ্ছ দুলচে সোনালি হাওয়ায়, নীল বনকলমির ফুলে ছেয়ে গিয়েচে সাঁইবাবলা আর কেইয়ে-ঝাঁকার জঙ্গল, জলের ধারে বনকচুর ফুলের শীষ, জলজ চাঁদা ঘাসের বেগুনি ফুল ফুটে আছে তট প্রান্তে, মটরলতা দুলচে জলের ওপরে, ছপাৎ ছপাৎ করে ঢেউ লাগচে জলে অধমগ্ন বনেবুড়ো গাছের ডালপালায়।
কেউ কোথাও নেই দেখে নিস্তারিণীর বড় ইচ্ছে হোলো ঘড়া বুকে দিয়ে সাঁতার দিতে। খরস্রোতা ভাদ্রের নদী, কুটো পড়লে দুখানা হয়ে যায়–কামট কুমিরের ভয়ে এ সময়ে কেউ নামতে চায় না জলে। নিস্তারিণী এসব গ্রাহ্য করে না, ঘড়া বুকে দিয়ে সাঁতার দেওয়ার আরাম যে কি, যারা কখনো তা আস্বাদ করে নি, তাদের নিস্তারিণী কি বোঝাবে এর মর্ম? তুমি চলেচ স্রোতে নীত হয়ে ভাটির দিকে, পাশে পাশে চলেচে কচুরিপানার ফুল, টোপাপানার দাম, তেলাকুচো লতার টুকটুকে পাকা ফল সবুজের আড়াল থেকে উঁকি মারচে, গাঙশালিখ পানা-শেওলার দামে কিচমিচ করচে–কি আনন্দ! মুক্তির আনন্দ! নিয়ে যাবে কুমিরে, গেলই নিয়ে! সেও যেন এক অপূর্বর, বিস্তৃততর মুক্তির আনন্দ!
অনেকদ্দূর এসে নিস্তারিণী দেখলে গাঁয়ের ঘাটগুলো সব পেরিয়ে এসেচে। সামনের কিছুদূরে পাঁচপোতা গ্রাম শেষে হয়ে ভাসানপোতা গ্রামের গয়লাপাড়ার ঘাট। ডাইনে বনাবৃত তীরভূমি, বাঁয়ে ওপারে পটলের ক্ষেত, ঝিঙের ক্ষেত–আরামডাঙার চাষীদের। সে ভুল করেচে, এতদূর আসা উচিত হয় নি একা একা। কে কি বলবে! এখন খরস্রোতা নদীর উজানে স্রোত ঠেলে সাঁতার দিয়ে যাওয়া সম্ভব নয় আর এগুনোও উচিত নয়। দক্ষিণ তীরের বনজঙ্গলের মধ্যে নামা যুক্তিসঙ্গত হবে কি? হেঁটে বাড়ি যেতে হবে ডাঙায় ডাঙ্গায়। পথও তো সে চেনে না।
সাঁতার দিয়ে ডাঙ্গার দিকে সে এল এগিয়ে। বন্যেবুড়ো গাছের সারি সেখানে নত হয়ে পড়েছে নদীর জলের উপর বুকে, গাছ-পালায় লতায় পাতায় নিবিড়তর জড়াজড়ি, বন্য বিহঙ্গের দল জুটে কিচকিচ করচে ঝোপের পাকা তেলাকুচো ফল খাওয়ার লোভে। বনের মধ্যে শুকনো পাতার ওপর কিসের খসখস শব্দ–কি একটা জানোয়ার যেন। ছুটে পালালো, বোধ হয় খেকশিয়ালী।
