টুলু শুনে অবাক হয়ে নদীর দিকে চেয়ে রইল। খানিকটা কি ভেবে অন্নদাকে জিজ্ঞেস করলে–নীল কি দাদা?
–নীল একরকম গাছ। নীলকুঠির সায়েব টমটম হাঁকিয়ে যায় দেখিস নি?
–কলের নৌকো দেখবো আমি–টুলু ঘাড় দুলিয়ে বললে।
–চোদ্দ শাক তুলবি নে বুঝি? ওরে দুষ্টু
অন্নদা ওকে আদর করে এক টানে এতটুকু ছেলেকে কোলে তুলে। নিলে।
কিন্তু শুধু টুলু নয়, চোদ্দশাক তোলা উল্টে গেল সব ছেলেমেয়েরই। লোকে লোকরণ্য হয়ে গেল নদীর দুধার। দুপুরের আগে ছোটলাট আসচেন কলের নৌকোতে। চাষী লোকেরা জিগির দিতে লাগলো মাঝে মাঝে। গ্রামের বহু ভদ্রলোক–নীলমণি সমাদ্দার, ফণি চক্কত্তি, শ্যাম গাঙ্গুলী, আরো অনেকে এসে নদীর ধারের কদমতলায় দাঁড়ালো।
ভবানী বাঁড়ুয্যে এসে ছেলেকে ডাকলেন–ও খোকা– টুলু হাসিমুখে বাবার কাছে ছুটে গিয়ে বললে–এই যে বাবা
–চোদ্দশাক তুলেচিস? তোর মা বলছিল—
–উঁহু বাবা। কে আসচে বাবা?
–ছোটলাট সার উইলিয়াম গ্রে–
–কি নাম? সার উইলিয়াম গ্রে?
–বাঃ, এই তো তোর জিবে বেশ এসে গিয়েচে।
–আমি এখন বাড়ি যাবো না। ছোটলাট দেখবো।
–দেখিস এখন। বাড়ি যাবি? তোকে মুড়ি খাইয়ে আনি।
–না বাবা। আমি দেখি।
বেলা অনেকটা বাড়লো। রোদ চড়চড় করচে। টুলুর খিদে পেয়েছে কিন্তু সে সব কষ্ট ভুলে গিয়েচে লোকজনের ভিড় দেখে।
খোকা বললেও বাবা
–কি রে?
–কলের নৌকো কি রকম বাবা?
–তাকে ইস্টিমার বলে। দেখিস এখন। ধোঁয়া ওড়ে।
–খুব ধোঁয়া ওড়ে?
হুঁ।
–কেন বাবা?
–আগুন দেয় কিনা তাই।
এমন সময় বহুদূরের জনতা থেকে একটা চীৎকার শব্দ উঠলো। টুলু বললে–বাবা আমাকে কোলে কর–
ভবানী খোকাকে কাঁধে বসিয়ে উঁচু করে ধরলেন। বললেন–দেখতে পাচ্চিস?
খোকা ঘাড় দুলিয়ে চোখ সামনে থেকে আদৌ না ফিরিয়ে বললে– হু-উ-উ
–কি দেখছিস?
–ধোঁয়া উঠচে বাবা –কলের নৌকো দেখতে পেলি?
–না বাবা, ধোঁয়া-ওঃ, কি ধোঁয়া।
অল্পক্ষণ পরে টুলুকে স্তম্ভিত করে দিয়ে মস্ত বড় কলের নৌকোটা একরাশ ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে ওর সামনে এসে উপস্থিত হোলো। জনতা নীল মোরা করবো না লাটসায়েব, দোহাই মা মহারাণীর! বলে চীৎকার করে উঠলো। কলের নৌকোর সামনে কাঠের কেদারায় বসে আছে অনেকগুলো সায়েব। নীলকুঠির যেমন একটা সায়েব নদীর ধারে পাখি মারছিল সেদিন–অমনি দেখতে। ওদের মধ্যে একটা সাহেব ও কি করছে?
–টুলু বললে–বাবা
–চুপ কর–
–বাবা
–আঃ, কি?
–ও সায়েব অমন করছে কেন?
–সবাইকে নমস্কার করচে।
–ওই কে বাবা?
–ওই সেই ছোটলাট। কি নাম বলে দিয়েচি?
–মনে নেই বাবা।
–মনে থাকে না কেন খোকা? ভারি অন্যায়। সার—
টুলু খানিকটা ভেবে নিয়ে বললে–উলিয়াম গ্রে–
–উইলিয়াম গ্রে–চলো এবার বাড়ী যাই–
–আর একটু দেখি বাবা
–আর কি দেখবে? সব তো চলে গেল।
–কোথায় গেল বাবা?
ইছামতী বেয়ে চূর্ণীতে গিয়ে পড়বে, সেখান থেকে গঙ্গায় পড়বে, তারপর কলকাতায় ফিরবে।
টুলু বাবার কাঁধ থেকে নেমে গুটগুট করে রাস্তা দিয়ে হেঁটে বাড়ী চললো। সামনে পেছনে গ্রাম্যলোকের ভিড়। সকলেই কথা বলতে বলতে যাচ্চে। টুলু এমন জিনিস তার ক্ষুদ্র চার বছরের জীবনে আর দেখে নি। সে একেবারে অবাক হয়ে গিয়েচে আজকার ব্যাপার দেখে। কি বড় কলের নৌকোখানা! কি জলের আছড়ানি ডাঙার ওপরে, নৌকোখানা যখন চলে গেল! কি ধোঁয়া! কেমন সব সাদা সাদা সায়েব!
তিলু বললে–কি দেখলি রে খোকা?
খোকা তখন মার কাছে বর্ণনা করতে বসলো। দুহাত নেড়ে কত ভাবে সেই আশ্চর্য ঘটনাটি মাকে বোঝাতে চেষ্টা করলে।
নিলু বললে রাখ–এখন চল আগে গিয়ে খেয়ে নিবি–আয়—
.
বিলু নেই। গত আষাঢ় মাসের এক বৃষ্টিধারামুখর বাদল রাত্রে স্বামীর কোলে মাথা রেখে স্বামীর হাত দুটি ধরে তিন দিনের জ্বরবিকারে মারা গিয়েচে।
মৃত্যুর আগে গভীর রাত্রে তার জ্ঞান ফিরে এসেছিল। স্বামীর মুখের দিকে চেয়ে বলে উঠলো–তুমি কে গো?
ভবানী মাথায় বাতাস দিতে দিতে বললে–আমি। কথা বোলো না। চুপটি করে শুয়ে থাকো, লক্ষ্মী
–একটা কথা বলবো?
–কী?
–আমার ওপর রাগ কর নি? শোনো–কত কথা তোমায় বলি নাগর
–কাঁদচ নাকি? ছিঃ, ও কি?
–খোকনকে আমার পাশে নিয়ে এসে শুইয়ে দ্যাও। দ্যাও না গো?
–আনচি, এই যাই–তিলু তো এই বসে ছিল, দুটো ভাত খেতে গেল এই উঠে–তুমি কথা বোলো না।
খানিকক্ষণ চুপ করে শুয়ে থাকার পর ভবানীর মনে হল বিলুর কপাল বড় ঘামচে। এখন কপাল ঘামচে, তবে কি জ্বর ছেড়ে যাচ্ছে? তিলু খেয়ে এসে রামকানাই কবিরাজের কাছে তিনি একবার যাবেন। খানিক পরে বিলু হঠাৎ তার দিকে ফিরে বললে–ওগো, কাছে এসো না–আপনারে তুমি বলচি, আমার পাপ হবে? তা হোক বলি। আর বলতি পারবো না তো? তুমি আবার আমার হবে সামনে জন্মে, হবে?–হয়ো হয়ো,–খোকাকে দুধ খাওয়ায় নি দিদি, ডাকো
–কি সব বাজে কথা বকচো? চুপ করে থাকতে বললাম না?
–খোকন কই? খোকন?
এই তার শেষ কথা। সেই যে দেওয়ালের দিকে মুখ ফিরিয়ে শুয়ে রইল, যখন খোকনকে নিয়ে এসে তিলু-নিলু ওর পাশে শুইয়ে দিলে, তখনো আর ফিরে চায় নি। ভবানী বাঁড়ুয্যে রামকানাই কবিরাজের বাড়ি গেলেন তাঁকে ডাকতে। রামকানাই এসে নাড়ি দেখে বললেন অনেকক্ষণ হয়ে গিয়েচে-খোকাকে তুলে নিন মা—
.
নীলবিদ্রোহ তিন জেলায় সমান দাপটে চললো। সার উইলিয়াম গ্রে সব দেখে গিয়ে যে রিপোর্ট পাঠালেন, নীলকরদের ইতিহাসে সে একখানা বিখ্যাত দলিল। তিন জেলার বহু নীলকুঠি উঠে গেল এর দুবছরের মধ্যে। বেশির ভাগ নীলকর সাহেব কুঠি বিক্রি করে কিংবা এদেশী কোনো বড়লোককে ইজারা দিয়ে সাগর পাড়ি দিলে। দুএকটা কুঠির কাজ পূর্ববৎ চলতে লাগলো তবে সে দাপটের সিকিও কোথাও ছিল না।
