–বরদাদিদি বাড়ী নেই?
–না, কেন?
–তাই বলছি।
গয়ামেম মুখ টিপে হেসে বললে–মার কাছে আপনার দরকার? তা হলি মাকে ডেকে আনি? যুগীদের বাড়ী গিয়েচে
–না, না। বোসো গয়া, তোমার সঙ্গে দুটো কথা বলি—
–কি?
–আচ্ছা, আমাকে তোমার কেমন লাগে?
–বুড়োমানুষ, কেমন আবার লাগবে?
-খুব বুড়ো কি আমি? অন্যায় কথা বোলো না গয়া। বড়সাহেবের বয়েস হইনি বুঝি?
–ওদের কথা ছাড়ান দ্যান। আপনি কি বলছেন তাই বলুন
–আমি তোমারে না দেখি থাকতি পারিনে কেন বলো তো?
-মরণের ভগ্নদশা। এ কথা বলতি লজ্জা হয় না আমারে?
–লজ্জা হয় বলেই তো এতদিন বলতি পারি নি
–খুব করেলেন। এখন বুঝি মুখি আর কিছু আটকায় না–
–না সত্যি গয়া, এত মেয়ে দ্যাখলাম কিন্তু তোমার মত এমন চুল, এমন ছিরি আর কোনো চকি পড়লো না–
–ওসব কথা থাক। একটা পরামর্শ দিই শুনুন
-কি?
–কাউকে বলবেন না বলুন?
প্রসন্ন চত্তির মুখ উজ্জ্বল দেখালো। এত ঘনিষ্ঠ ভাবে প্রসন্ন চক্কত্তির সঙ্গে কোনদিন গয়া কথা বলে নি। কি বাঁকা ভঙ্গিমা ওর কালো ভুরু জোড়ার! কি মুখের হাসির আলো! স্বর্গ আজ পৃথিবীতে এসে ধরা দিল কি এই শরৎ দিনের অপরাহ্নে?
কি বলবে গয়া? কি বলবে ও?
বুক ঢিপঢিপ করে প্রসন্ন আমিনের। সে আগ্রহের অধীরতায় ব্যগ্রকণ্ঠে বললে-বলো না গয়া, জিনিসটা কি? আমি আবার কার কাছে বলতে যাচ্ছি তোমার আমার দুজনের মধ্যকার কথা?
শেষদিকের কথাগুলো খুব জোর দিয়ে উচ্চারণ করলে প্রসন্ন চক্কত্তি। গয়া কিন্তু ওর কথার ইঙ্গিতটুকু সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সহজ সুরেই বললে–শুনুন বলি। আপনার ভালোর জন্যি বলচি। সাহেবদের ভেতর ভাঙন ধরেচে। ওরা চলে যাচ্চে এখান থেকে। বড়সাহেবের মেম এখান থেকে শিগগির চলে যাবে। মেম লোকটা ভালো। যাবার সময় ওর কাছে কিছু চেয়ে নেন গিয়ে। দেবে। লোক ভালো। কথাডা শোনবেন।
প্রসন্ন চক্কত্তি বুদ্ধিমান ব্যক্তি। সে আগে থেকে কিছু কিছু এ সম্বন্ধে যে অনুমান না করেছিল এমন নয়। সায়েবরা চলে যাবে…সায়েবরা চলে যাবে..জানে সে কিছু কিছু। কিন্তু গয়া এ ভাবের কথা তাকে আজ এতদিন পরে বললে কেন? তার সুখ-দুঃখে, উন্নতি-অবনতিতে গয়ামেমের কি? প্রসন্ন চত্তির সারা শরীরে পুলকের শিহরণ বয়ে গেল, সন্দেবেলার পাঁচমিশেলি আলোর মধ্যে দাঁড়িয়ে আজ এতকাল পরে জীবনের শেষ প্রহরের দিকে যেন কি একটা নতুন জিনিসের সন্ধান পেলে প্রসন্ন।
সে বললে–সায়েবরা চলে যাচ্ছে কেন?
গয়া হেসে বললে–ওদের ঘুনি ডাঙায় উঠে গিয়েচে যে খুড়োমশাই! জানেন না?
–শুনিচি কিছু কিছু।
–সমস্ত জেলার লোক ক্ষেপে গিয়েচে। রোজ চিঠি আসচে মাজিস্টর সায়েবের কাছ থেকে। সাবধান হতি বলচে। হাজার হোক সাদা চামড়া তো। মেমেদের আগে সরিয়ে দেচ্চে। আপনারেও বলি, একটু সাবধান হয়ে চলবেন। খাতক প্রজার ওপর আগের মত আর করবেন না। করলি আর চলবে না–
–কেন, আমি মলি তোমার কি গয়া?
প্রসন্ন চক্কত্তির গলার সুর হঠাৎ গাঢ় হয়ে উঠলো।
গয়া খিলখিল করে হেসে উঠে বললে–নাঃ, আপনারে নিয়ে আর যদি পারা যায়। বলতি গ্যালাম একটা ভালো কথা, আর অমনি আপনি আরম্ভ করে দেলেন যা তা—
–কি খারাপ কথা আমি বললাম গয়া?
–কণ্ঠস্বর পূর্ববৎ গাঢ়, বরং গাঢ়তর।
–আবার যতো সব বাজে কথা! বলি, যে কথা বললাম, কানে গেল না? দাঁড়ান–দাঁড়ান–
বলেই প্রসন্ন চক্কত্তিকে অবাক ও স্তম্ভিত করে গয়া তার খুব কাছে এসে তার পিঠে একটা চড় মেরে বললে–একটা মশা-এই দেখুন
সমস্ত দেহ শিউরে উঠলো প্রসন্ন আমিনের। পৃথিবী ঘুরছে কি বনবন করে? গয়া বল্লে–যা বললাম, সেইরকম চলবেন–বোঝলেন? কথা কানে গেল?
–গিয়েচে। আচ্ছা গয়া, না যদি চলি, তোমার কি? তোমার ক্ষেতি কি?
গয়া রাগের সুরে বললে–আমার কলা। কি আবার আমার? না শোনেন, মরবেন দেওয়ানজির মতো।
রাগ করচো কেন গয়া? আমার মরণই ভালো। কে-ই বা কাঁদবে। মলি পরে!..প্রসন্ন চক্কত্তি ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ফেললে।
–আহাহা! ঢং রাগে গা জ্বলে যায়। গলার সুর যেন কেষ্টযাত্রা বললাম একটা সোজা কথা, না–কে কাঁদবে মলি পরে, কে হেন করবে, তেন করবে! সোজা পথে চললি হয় কি জিজ্ঞেস করি?
যাকগে।
–ভালোই তো।
–আমার দেখলি তোমার রাগে গা জ্বলে, না?
–আমি জানিনে বাপু। যত আজগুবী কথার উত্তর আমি বসে বসে এখন দিই! খেয়েদেয়ে আমার আর তো কাজ নেই–আসুন গিয়ে এখন, মা আসবার সময় হোলো–
–বেশ চললাম এখন গয়া।
–আসুন গিয়ে।
প্রসন্ন চক্কত্তি ক্ষুণ্ণমনে কিছুদূর যেতেই গয়া পেছন থেকে ডাকলেও খুড়োমশাই– প্রসন্ন ফিরে চেয়ে বললে–কি?
–শুনুন।
–বল না কি?
-রাগ করবেন না যেন!
–না। যাই এখন
–শুনুন না।
-কি?
–আপনি একটা পাগল!
–যা বলো গয়া। শোনো একটা কথা–কাছে এসো
–না, ওখান থেকে বলুন আপনি।
–নিধুবাবুর একটা টপ্পা শোনবা?
–না আপনি যান, মা আসচে
প্রসন্ন চক্কত্তি আবার কিছুদূর যেতে গয়া পেছন থেকে বললে– আবার আসবেন এখন একদিন–কানে গেল কথাডা? আসবেন–
–কেন আসবো না! নিশ্চয় আসবো। ঠিক আসবো।
দূরের মাঠের পথ ধরলো প্রসন্ন চক্কত্তি। অনেক দূর সে চলে এসেছে গয়াদের বাড়ি থেকে। বরদা দেখে ফেলে নি আশা করা যাচ্চে। কেমন মিষ্টি সুরে কথা কইলে গয়া, কেমন ভাবে তাকে সরিয়ে দিলে পাছে মা দেখে ফেলে!
কিন্তু তার চেয়েও অদ্ভুত, তার চেয়েও আশ্চর্য, সব চেয়ে আশ্চর্য হচ্চে-ওঃ, ভাবলে এখনো সারাদেহে অপূর্ব আনন্দের শিহরণ বয়ে যায়, সেটা হচ্চে গয়ার সেই মশা মারা।
