–সে আবার কি কথা? নিজেরা মারলে কেন?
–না মারলি শনাক্ত হবে লাশ দেখে। বেঁচে থাকে তো দলের কথা ফাঁস করে দেবে।
–কি সর্বনাশ!
–সর্বনাশ হোতো আর একটু হোলি। তবে খুব পালিয়ে এয়েলাম। সোনার গহনা লুঠ করেলাম ত্রিশ ভরি।
–কি করে? কোথা থেকে নিলে? মেয়েমানুষদের তো ওপরের ঘরে নিয়ে চাপা সিঁড়ি ফেলে দিল?
–তার আগেই কাজ হাসিল হয়েলো। ডাকাতি করতি গেলে কি বিলম্ব করলি চলে? যেমন দেখা, অমনি গহনা ছিনিয়ে নেওয়া। তারপর যত খুশি চেঁচাও না–সারা রাত্তির পড়ে আছে তার জন্যি।
–এ রকম কোরো না দাদা। বড় পাপের কাজ। এ ভাত তোমাদের মুখি যায়? কত লোকের চোখের জল না মিশে আছে ঐ ভাতের সঙ্গে। ছিঃ ছিঃ–নিজের পেটে খেলেই হোলো?
হলা পেকে খানিকটা চুপ করে থেকে বললে–পাপপুণ্যির কথা বলবেন না। ও আমাদের হয়ে গিয়েচে, সে রাজাও নেই, সে দেশও নেই। জানো তো ছড়া গাইতাম আমরা ছেলেবেলায়ঃ
ধন্য রাজা সীতারাম বাংলা বাহাদুর
যাঁর বলেতে চুরি ডাকাতি হয়ে গেল দূর।
বাঘে মানুষে একই ঘাটে সুখে জল খাবে
রামী শামী পোঁটলা বেঁধে গঙ্গাস্তানে যাবে।
তিলু হেসে বললে–আহা, ও ছড়া আমরা যেন আর জানি নে! ছেলেবেলায় দীনু বুড়ি বলতে শুনিচি–
–জানবা না কেন, সীতারাম রাজা ছেলো নলদী পরগণার। মাসুদপুর হোলো তাঁর কেল্লা–মোর মামার বাড়ি হোলো হরিহরনগর, মাসুদপুরির কাছে। মুই সীতারামের কেল্লার ভাঙ্গা ইট পাথর, সীতারামের দিঘি, তার নাম সুখসাগর, ওসব দেখিচি। এখন অরুণ্যি-বিজেবন, তার মধ্যি বড় বড় সাপ থাকে, বাঘ থাকে–এটা পুরোনো মস্ত মাদারগাছ ছেল জঙ্গলের মধ্যি, তার ফল খেতি যাতাম ছেলেবেলায়–ভারি মিষ্টি
খোকা বললে–মিট্টি। আমি খাই–
–খেও বাবা খোকা–এনে দেবানি–আম পাকলে দেবানি–
–আম খাই–
–খেও। কেন খাবা না?
ভবানী বাঁড়ুয্যে স্নান করে আহ্নিক করতে বসলেন। তিলু দুচারখানা শশাকাটা আধমালা নারকোলকোরা ও খানিকটা খেজুরের গুড় তাঁর জন্যে ওঘরে রেখে এল। হলা পেকে এককাঠা চালের ভাত খেলে ভবানীর খাওয়ার পরে। খেতেও পারে। ডাল খেলে একটি গামলা। খেয়েদেয়ে সে কিছুক্ষণ বিশ্রাম করতে লাগলো।
কিছুক্ষণ পরে একটা কান্নাকাটির শব্দ পাওয়া গেল মুখুয্যেপাড়ার দিকে। তিলু হলা পেকের দিকে তাকিয়ে বললে–দেখে এসো তো পেকে দা, কে কাঁদচে?
ভবানীও তাড়াতাড়ি দেখতে গেলেন এবং কিছুক্ষণ পরে ফিরে এসে বললেন–ফণিকাকার বড় জ্যাঠাই জাহাজডুবি হয়ে মারা গিয়েচেন, গণেশ খবর নিয়ে এল–
তিলু বললে–ওমা, সে কি? জাহাজ ডুবি?
–হাঁ। সার জন লরেন্স বলে একখানা জাহাজ
–জাহাজের আবার নাম থাকে বুঝি?
–থাকে বৈকি। তারপর শোনো, সেই সার জন লরেন্স ডুবেচে সাগরে, পুরীর পথে। বহু লোক মারা গিয়েচে।
–ওগো এ গাঁয়েরই তো লোক রয়েচে সাত-আটজন। টগর কুমোরের মা, পেঁচো গয়লার শাশুড়ি আর বিধবা বড় মেয়ে ক্ষেন্তি, রাজু সর্দারের মা, নীলমণি কাকার বড় বৌদিদি। আহা, পেঁচো গয়লার মেয়ে ক্ষেন্তির ছোট ছেলেটা সঙ্গে গিয়েচে মায়ের–সাত বছর মাত্তর বয়েস–
গ্রামে সত্যিই একটা কান্নার রোল পড়ে গেল। নদীর ঘাটে, গৃহস্থের চণ্ডীমণ্ডপে, চাষীদের খামারে, বাজারে, নালু পালের বড় মুদিখানার দোকানে ও আড়তে সার জন লরেন্স ডুবি ছাড়া আর অন্য কথা
বাংলার অনেক জেলার বহু তীর্থযাত্রী এবার এই জাহাজ ডুবে মারা গিয়েছিল। বাংলার সামাজিক ইতিহাসে সার জন লরেন্স জাহাজ ডুবির একটি বিশিষ্ট স্থান আছে এ-জন্যে।
.
গয়ামেম সবে বড়সাহেবের কুঠি থেকে বেরিয়ে কিছুদূর এসেছে, এমন সময় প্রসন্ন আমিন তাকে ডেকে বললে–ও গয়া, শোনো–ও গয়া–
গয়া পেছন দিকে চেয়ে মুখ ঘুরিয়ে বললে–আমার এখন ন্যাকরা করবার সময় নেই।
–শোনো একটা কথা বলি–
-কি?
–ওবেলা বাড়ি থাকবা?
–থাকি না থাকি আপনার তাতে কি?
–না, তাই এমনি বলছি।
–এখানে কোনো কথা না। যদি কোনো কথা বলতি হয়, সন্দের পর আমাদের বাড়ি যাবেন, মার সামনে কথা কবে—
.
প্রসন্ন চক্কত্তি এগিয়ে এসে একগাল হেসে বলে–না না, আমি এখানে কি কথা বলতি যাচ্ছি–বলচি যে তুমি কেমন আছ, একটু রোগা দেখাচ্ছে কিনা তাই।
–থাক, পথেঘাটে আর ঢং করতি হবে না
না! এই গয়াকে প্রসন্ন চক্কত্তি ঠিকমত বুঝে উঠতেই পারলে না। যখন মনে হয় ওর ওপর একটু বুঝি প্রসন্ন হোলো, অমনি হঠাৎ মুখ ঘুরিয়ে চলে যায়। প্রসন্ন হতবুদ্ধি হয়ে খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল।
পেছনদিকে ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ শুনে প্রসন্ন চেয়ে দেখল বড়সাহেব শিপটন কোথায় বেরিয়ে যাচ্ছে। বড় ভয় হোলো তার। বড়সাহেব। দেখে ফেললে নাকি তার ও গয়ামেমের কথাবার্তা? নাঃ
সন্দে হবার এত দেরিও থাকে আজকাল! বাঁওড়ের ধারের বড় চটকাগাছে রোদ রাঙা হয়ে উঠলো, চড়ার ক্ষেতে ক্ষেতে ঝিঙের ফুল ফুটলো, শামকুট পাখীর ঝাঁক ইছামতীর ওপার থেকে উড়ে আকাইপুরের বিলের দিকে চলে গেল, তবুও সন্দে আর হয় না। কতক্ষণ পরে বাগদিপাড়ায়, কলুপাড়ায় বাড়ি বাড়ি সন্দের শাঁক বেজে উঠলো, বটতলায় খেপী সন্নিসিনীর মন্দিরে কাঁসর-ঘণ্টার আওয়াজ শোনা গেল।
প্রসন্ন চক্কত্তি গিয়ে ডাকলে একটু ভয়ে ভয়ে–ও বরদা দিদি
প্রথমেই গয়ার নাম ধরে ডাকতে সাহস হয় না কিনা!
মেঘ না চাইতেই জল। প্রসন্ন চক্কত্তিকে মহাখুশি করে গয়ামেম ঘরের বাইরে এসে বললে–কি খুড়োমশাই?
