ছোটসাহেব বললে-রসিক, ব্যাটা ছিহরি আর সাদেককে ধরে। আনতি পারবা?
বড়সাহেবের মেজাজ এতক্ষণে কিছুটা ঠাণ্ডা হয়ে থাকবে, সে TOGGT-I am afraid that would not be quite within the bounds of law. Let us return.
পরে হেসে বললে–Sufficient unto the day–the evil thereof…
ছোটসাহেব মনে মনে চটলো বড়সাহেবের ওপর–ভাবলে সে বড়সাহেবের কথার শেষে বলে–Amen। কিন্তু সাহসে কুলিয়ে উঠল
দেওয়ান রাজারাম ততক্ষণে ঘোড়ার মুখ ফিরিয়েছেন কুঠির দিকে। প্রসন্ন চক্কত্তিও সেই সঙ্গে ফিরছিল, কিন্তু সে একটি সুঠাম তন্বী ষোড়শী। বধূকে আলুথালু অবস্থায় বাঁশবনের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে দেখে সেখানে ঘোড়া দাঁড় করালে। কাছে লোকজন ছিল না কেউ। বৌটি ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে বাঁশবনের ওদিকে ঘুরে যাবার চেষ্টা করতে প্রসন্ন চক্কত্তি গলার সুরকে যতদূর সম্ভব মোলায়েম করে জিজ্ঞেস করলে–কেডা গা তুমি?
উত্তর নেই।
–বলি, ভয় কি গা? আমি কি সাপ না বাঘ! তুমি কেডা?
উত্তর নেই। আর্ত কান্নার শব্দ শোনা গেল।
প্রসন্ন আমিন চট করে একবার চারিদিকে চেয়ে দেখে ঘোড়াটা বাঁশঝাড়ের ওপারে বৌটির কাছে ঠেসে চালিয়ে দিলে। কিন্তু সেও বাগদিপাড়ার বৌ, বেগতিক বুঝে সে এক মরিয়া চিৎকার ছেড়ে দৌড়ে বেশি জঙ্গলের দিকে পালালো। সেই কাঁটাবনের মধ্যে ঘোড়া চালানো সম্ভব নয়। সুতরাং ফিরতেই হল প্রসন্ন চক্কত্তিকে। বাগদিপাড়ার বৌ-ঝি এমন সুঠাম দেখতে কেন যে হয়! ওদের মধ্যে দুএকটা যা চোখে পড়ে এক এক সময়! না সত্যি, ভদ্রলোকের মধ্যে অমন গড়নপিটন– হ্যাঁ, ঢাকের কাছে টেমটেমি!
.
বড়সাহেব ছিহরি সর্দারকে বললে–টোমার মতলব কি আছে?
–নীল মোরা আর বোনবো না সায়েব। মোদের মেরেই ফেলুন। আর যে সাজাই দ্যান।
–ইহার কারণ কি আছে?
–কারণ কি বলবো, মোদের ঘরে ভাত নেই, পরনে বস্তর নেই, ঐ নীলির জন্যি। মা কালীর দিব্যি নিয়ে মোরা বলিচি, নীল আর বোনবো না!
–কি পাইলে নীল বুনিটে ইচ্ছা আছে?
–নীল আর বোনবো না, ধান করবো। যত ধানের জমিতি আপনাদের আমিন গিয়ে দাগ মেরে আসবে, মোরা ধান বুনতি পারি নে। আপনারা নিজেদের জমিতে লাঙ্গল গোরু কিনে নীলের চাষ করো–কেউ আপত্য করবে না। প্রজার জমি জোর করে বেদখল করে নীল করবা কেন সায়েব?
–টোমারে পাঁচশো টাকা বকশিশ ডিবো। তুমি নীল বুনটে বাধা দিও না। প্রজা হাট করিয়া ডাও।
–মাপ করবেন সায়েব। মোর একার কথায় কিছু হবে না। মুই আপনারে বলচি শুনুন, তেরোখানা গাঁয়ের লোক একস্তরে হয়ে জোট পেকিয়েচে। ভবানীপুর, নাটাবেড়ে, হুদোমানিককোলির নীলকুঠির রেয়েতেরাও জোট পেকিয়েচে। হাওয়া এসেচে পূবদেশ থেকে আর দক্ষিণ থেকে।
বড়সাহেব এ সমস্ত সংবাদ জানেন। সেদিনকার সেই অভিযানের পর তাই তিনি আজ ছিহরি সর্দারকে কুঠিতে ডেকেছিলেন অনেক কিছু আশ্বাস দিয়ে। ছিহরি এরকম বেঁকে দাঁড়াবে তা বড়সাহেব ভাবেন নি।
তবু বললেন–টুমি আমার কাছে চলিয়া আসিবে। চেষ্টা করিয়া ডেখো। অনেক টাকা পাইবে। কাছারিতে চাকুরি করিতে চাও?
–না সায়েব। মোরা সাতপুরুষ কখনো চাকরি করি নি। আর আপনাদের এট্টা কথা বলি সায়েব-মুই একা এ ঝড় সামলাতি পারবো না। জেলা জুড়ে ঝড় উঠেছে, একা ছিহরি সর্দার কি করবে? আপনি বুঝে দ্যাখো সায়েব–একা মোরে দোষ দিও না। মুই কুঠির অনেক নুন খেইচি–তাই সব কথা খুলে বললাম।
ডেভিড সাহেবকে ডেকে বড়সাহেব বললে–I say, David, this man swims in shallow water. Let him go safely out and see that no harm is done to him. Not worth the trouble.
সেদিন সন্ধ্যার পরে নীলকুঠিতে একটি গুপ্ত বৈঠক আহূত হল।
অনেক খবর এনে দিয়েচে নীলকুঠির চরের দল। জেলার প্রজাবর্গ ক্ষেপে উঠেচে, তারা নীলের দাদন আর নেবে না। সতেরোটা নীলকুঠি বিপন্ন। গ্রামে গ্রামে প্রজাদের সভা হচ্চে, পঞ্চায়েৎ বৈঠক বসছে। কোনো কোনো মৌজায় নীলের জমি ভেঙ্গে প্রজার ডাঁটাশাক আর তিল বুনেছে–এ খবরও পাওয়া গিয়েচে। বৈঠকে ছিলেন কাছাকাছি নীলকুঠির কয়েকজন সাহেব ম্যানেজার, এ কুঠির শিল্ট আর ডেভিড। কোনো গোপনীয় ও জরুরি বৈঠকে ওরা কোনো নেটিভকে ডাকে না। ম্যালিসন্ সাহেব বলেচেNo native need be called, we shall make our decision known to them if neces sary.
কোল্ডওয়েল সাহেব বললে–ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আরো বন্দুকের জন্যে বলো। এ সময়ে বেশি আগ্নেয়াস্ত্র রাখা উচিত প্রত্যেক কুঠিতে অনেক বেশি করে।
কোল্ডওয়ে ভবানীপুর নীলকুঠির অতি দুর্দান্ত ম্যানেজার। প্রজার জমি বেদখল করবার অমন নিপুণ ওস্তাদ আর নেই। খুন এবং বেপরোয়া কাজে ওর জুড়ি মেলা ভার। তবে কিছুদিন আগে ওর মেম চলে গিয়েচে ওর এক বন্ধুর সঙ্গে, তার কোনো পাত্তাই নেই, সেজন্য ওর মন ভালো নয়।
শিপটন্ সাহেব বললে–These blooming native leaders should be shot like pigs.
কোল্ডওয়েল বললে I say, you can go on with your pig sticking afterwards. Now decide what we should do with our Impression Registers. That is why we have met today.
এই সময়ে শ্রীরাম মুচি বেয়ারা শেরির বোতল ও অনেকগুলো ডিক্যান্টার ট্রেতে সাজিয়ে এনে ওদের সামনে রেখে দিলে।
