নিলু বললে–আমি জানি। সেবার নীলকুঠির দাঙ্গায় দাদা স্বচক্ষে দেখেছেন, খড়ের ছোট্ট চালাঘরের মধ্যে থেকে দুটো দুলেদের বৌ এমন তীর চালাচ্চে, নীলকুঠির বরকন্দাজ হটে গেল।
–বাঃ বাঃ, বড় খুশি হলাম শুনে দিদি। ব্রহ্মদর্শনের আনন্দ হয় যদি এই শক্তিমতী মায়েদের একবার সাক্ষাৎ পাই। জয় মা জগদম্বা।
ভবানী বাঁড়ুয্যে এই সময় গাড় হাতে কোথা থেকে আসছিলেন, সেখান থেকে বলে উঠলেন–আরে, ও কি ভায়া! একেবারে মা জগদম্বা! নাঃ বৈদান্তিক জ্ঞানীর ইয়েটা একেবারে নষ্ট করে দিলে?
–ভাই, নিত্য থেকে লীলায় নামলেই মা বাবা। বৈদান্তিকের তাতে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয়ে গেল! বলেচি তো তোমাকে সেদিন। বেদান্ত অত সোজা জিনিস নয়। অদ্বৈত বেদান্ত বুঝতে বহুদিন যাবে। জীব গোস্বামীর বেদান্ত বরং কিছু সহজ।
–ও কথা থাক। কি নিয়ে কথা বলছিলে?
লীলার কথা। এদেশের মেয়েদের শক্তি-সামর্থ্যের কথা। সবই মায়ের লীলা।
নীলু বলে উঠল–হ্যাঁ, ভালো কথা–বড়দি ভালো ঢাল আর লাঠির খেলা জানে। একবার আকবর আলি লেঠেলের সঙ্গে লড়ি চালিয়েছিল ঢাল আর লড়ি নিয়ে। নীলকুঠির বড় লেঠেল আকবর আলি। বড়দি এমন আগলেছিল, একটা লড়ির ঘাও মারতি পারে নি ওর গায়ে। শরীরে শক্তিও আছে বড়দির। দুটো বড় বড় ক্ষিতুরে ঘড়া কাঁকে মাথায় করে নিয়ে আসতে পারে। এখনো পারে।
ভবানী বাঁড়ুয্যে হলা পেকে ও অঘোর মুচিকে নিয়ে বাড়ির মধ্যে ঢুকে ডাক দিলেন–ও তিলু, শুনে যাও–ও তিলু, ও বড়বৌ
তিলু খোকাকে দুধ খাওয়াচ্ছিল। একটু পরে খোকাকে কোলে করে এসে বললেবাপরে, এসব ডাকাতের দল কেন আমার বাড়িতে।
হলা পেকে উত্তর দিলে বড়দি, পেটের জ্বালায় এইচি। খাতি দ্যাও, নইলে লুঠ হবে।
তিলু হেসে বললে–আমি লাঠি ধরতি জানি।
–সে তো জানি।
–বার করি ঢাল লড়ি?
–কিসের লড়ি?
–ময়না কাঠের।
অঘোর মুচি বললে–সত্যি বড়দি, হাত বজায় আছে তো?
–খেলবি নাকি একদিন? মনে আছে সেই রথতলার আখড়াতে? তখন আমার বয়েস কত–সতেরো-আঠারো হবে–
–উঃ, সে যে অনেকদিনের কথা হয়ে গেল। তখন রথতলার আখড়াতে মোদের বড্ড খেলা হোত। মনে আছে খুব।
–বসো, আমি আসচি।
একটু পরে দুটি বড় কাঁঠাল দু হাতে বোঁটা ঝুলিয়ে নিয়ে এসে। তিলু ওদের সামনে রাখলে। বললে–খাও ভাই সব, দেখি কেমন জোয়ান
হলা পেকে বললে–কোন্ গাছের কাঁটাল দিদি?
–মালসি।
–খাজা না রসা?
–রস খাজা। এখন আষাঢ়ের জল পেলে কাঁটাল আর রসা থাকে? খাও দুজনে।
মিনিট দশ-বারোর মধ্যে অঘোর মুচি তার কাঁঠালটা শেষ করলে। হলা পেকের দিকে তাকিয়ে বললে–কি ওস্তাদ, এখনো বাকি যে?
–কাল রাত্তিরি খাসির মাংস খেয়েলাম সের দুয়েক। তাতে করে ভালো খিদে নেই।
তিলু বললে–সে হবে না দাদা। ফেলতি পারবে না। খেতে হবে সবটা। অঘোর দাদা, আর একখানা দেবো বার করে? ও গাছের আর কিন্তু নেই। খয়েরখাগীর কাঁটাল আছে খানচারেক, একটু বেশি খাজা হবে।
–দ্যাও, ছোট দেখে একখানা।
হলা পেকে বললে–খেয়ে নে অঘরা, এমন একখানা কাঁটালের দাম হাটে এক আনার কম নয়, এমন অসময়ে। মুই একখানা শেষ করে আর পারবো না। বয়েসও তো হয়েচে তোর চেয়ে। দ্যাও দিদিমণি, একটু গুড় জল দ্যাও
তিলু বললে–তা হলে সারেদের কাছে হেরে গেলে দাদা। গুড় জল এমনি খাবে কেন, দুটো ঝুনো নারকোল দি, ভেঙ্গে দুজনে খাও গুড় চিরে। তবে বেশি গুড় দিতি পারবো না। এবার সংসারে গুড় বাড়ন্ত। দশখানা কেনা ছিল, দুখানাতে ঠেকেচে। উনি বেজায় গুড় খান।
দিনটা বেশ আনন্দে কাটল।
হলা পেকে এবং অঘোর মুচি চলে যাওয়ার সময় চৈতন্যভারতী মহাশয়কে আর একবার সাষ্টাঙ্গে প্রণাম করে চলে গেল।
.
ভবানী বাঁডয্যে যে তিলুকে নিয়ে রোজ নদীতে নাইতে যান সন্ধ্যাবেলা আজও গেলেন। ইছামতীর নির্জন স্থানে নিবিড় নলখাগড়ার ঝোপের মধ্যে দিয়ে মুক্তো খোঁজা জেলেরা (কারণ ইছামতীতে বেশ দামি মুক্তাও পাওয়া যেত) গত শীতকালে যে সঁড়িপথটা কেটে করেছিল, তারই নিচে বাবলা, যজ্ঞিডুমুর, পিটুলি ও নটকান গাছের তলায় ভবানী ও তিলু নিজেদের জন্যে একটা ঘাট করে নিয়েছে, সেখানে হলদে বাবলা ফুল ঝরে পড়ে টুপটাপ করে স্বচ্ছ কাকচক্ষু জলের ওপর, গুলঞ্চের সরু ছোট লতা নটকান ডাল থেকে জলের ওপরে ঝুলে পড়ে, তেচোকো মাছের ছানা স্নানরতা তিলু সুন্দরীর বুকের কাছে খেলা করে, হাত বাড়িয়ে ধরতে গেলে নিমেষের মধ্যে অন্তর্হিত হয়; ঘনান্তরাল বনকুঞ্জের ছায়ায় কত কি পাখি ডাকে সন্ধ্যায়। ওদের কেউ দেখতে পায় না ডাঙার থেকে।
ভবানী বাঁড়ুয্যে জলে নেমে বললেন–চলো সাঁতার দিয়ে ওপারে যাই
তিলু বললে–চলুন, ওপারের ক্ষেত থেকে পটল তুলে আনি–
–ছিঃ, চুরি করা হয়। পাড়াগেঁয়ে বুদ্ধি তোমার–চুরি বোঝ না?
–যা বলেন। আমরা কত তুলে আনতাম।
–দেবে সাঁতার?
–চলুন। গো-ঘাটার দিকে যাবেন? মাঠের বড় অশথতলার দিকে?
তিলু অদ্ভুত সুন্দরভাবে সাঁতার দেয়। সুন্দর, ঋজু তনুদেহটি জলের তলায় নিঃশব্দে চলে, পাশে পাশে ভবানী বাঁড়ুয্যে চলেন।
হঠাৎ এক জায়গায় গহিন কালো জলে ভবানী বাঁড়ুয্যে বলে। ওঠেন–ও তিলু, তিলু!
তিলু এগিয়ে চলেছিল, থেমে স্বামীর কাছে ফিরে এসে বললে–কি? কি?
ভবানী দু হাত তুলে অসহায়ের মতো খাবি খেয়ে বললেন–তুমি পালাও তিলু। আমায় কুমিরে ধরেচে–তুমি পালাও! পালাও! খোকাকে দেখো!…
