–যাক, তারপর কি হোলো?
–তখন আমি দেখচি কি বাবাঠাকুর, সাক্ষাৎ কালী পিরতিমে। মাথার চুল এলো, দশাসই চেহারা, কি চমৎকার গড়ন-পেটন, মুখচোখ– সড়কি ধরেচে যেন সাক্ষাত দশভুজা দুগগা। ঘামতেল মুখে চকচক করচে, চোখ দুটোতে যেন আলো ঠিকরে বেরুচ্চে। সত্যি বলচি বাবাঠাকুর, অনেক মেয়ে দিখিচি, অমন চেহারা আর কখনো দেখি নি। আর সড়কি চালানে কি? যেন তৈরি হাত। ব্যাঁকা করে খোঁচা মারে, আর লাগলি নাড়িভুড়ি নামিয়ে নেবে এমনি হাতের ট্যাৰ্চা তাক। মনে মনে ভাবি, শাবা মা, বলিহারি! দুধ খেয়েলে বটে!
-তারপর? তারপর?
চৈতন্যভারতী অত্যন্ত উত্তেজিত হয়ে উঠলেন। সোজা হয়ে উঠে বসলেন ধুনির সামনে।
–একবার ভাবলাম যা থাকে কপালে, লড়ে দেখবো। তারপর ভাবলাম, না, পিছু হটি। গতিক আজ ভালো না। আমি পিছিয়ে পড়িচি, বীরো হাড়ি বললে,–
পরক্ষণেই জিভ কেটে ফেলে বললে–ওই দ্যাখো দলের লোকের নাম করে ফেলেলাম! কেউ জানে না যে ব্যাটা আমাদের সাংড়ার লোক ছিল। যাক, আপনারা আর ওর কথা বলে দিতি যাচ্ছেন না নীলকুঠির সায়েবের কাছে–
ভারতী মশায় বললেন–নীলকুঠির সায়েব কি করবে?
–সে কি বাবাঠাকুর? এদেশে বিচের-আচার সব তো কুঠির সায়েবেরা করেন। আমার আর অঘোরের গারদ হয়েল, সেও বিচার করেন ওই বড়সায়েব। তারপর শুনুন। বীরো হাড়ি ব্যাটা এগিয়ে গেল। আমাদের বললে, দুয়ো! মেয়েলোকের সঙ্গে লড়াইয়ে হেরে গেলি এনি মরদ?.সিঁড়ির ওপরের ধাপে দুপ দুপ করে উঠে গেল। আমি ঘুরে দাঁড়িইচি,-মেয়েলোকের গায়ে হাত দিলি বীরো হাড়ির একদিন না আমার একদিন-মুই দেখে নেবো! এমন সময়–বাপরে! বলে বীরো। হাড়ি একেবারে চিৎ হয়ে সিঁড়ির মুখে পড়ে গেল। তারপরই উঠে দু হাত তলপেটে দিয়ে কি একটা টানচে দড়ির মতো–আমি ভাবচি ওটা আবার কি? কাছে গিয়ে দেখি তলপেট হাঁ হয়ে ফুটো বেরিয়েছে, সেই। ফুটো দিয়ে পেটের রক্তমাখা নাড়ি দড়ির মতো চলে গিয়েচে ওপরে সড়কির ফলার আলোর সঙ্গে গিঁথে।-সড়কি যত টান দিচ্চে বৌমা, ওর পেটের নাড়ি ততই হড় হড় করে বেরিয়ে বেরিয়ে চলেছে ওপর বাগে। আর বেশিক্ষণ না, চোখ পাল্টাতি আমি গিয়ে ওরে পাঁজাকোলা করে তুলি বাইরে নিয়ে এসে বসলাম। এটু জল পাই নে যে ওর মৃত্যুকালে মুখে দিই, কারণ আমি তো বুঝচি ওর হয়ে এল–
ভারতী মশায় বললেন–সেই সড়কিতে গাঁথা নাড়িটা?
লাঠির এক ঝটকায় নাড়ি ছিঁড়ে দিইচি, নইলে আনচি কোথা থেকে? তা বড় শক্ত জান হাড়ির পোর। মরে না। শুধু গোঙায় আর বোধ হয় জল জল করে,বুঝতি পারি না। ইদিকে নোক এসে পড়বে, তখন বড় হৈচৈ হচ্চে বাইরে। কি করি, বাড়ির পেছনে একটা ডোবা পর্যন্ত ওরে পাঁজাকোলা করে নিয়ে গ্যালাম, তখনো ও গোঁ গোঁ করে হাত নেড়ে কি বলে। রক্তে ধরণী ভাসচে বাবাঠাকুর। লোকজন এসে পড়বার আর দ্রিং নেই। তখন বেছো মুচির কাতানখানা চেয়ে নিয়ে এক কোপে ওর মুণ্ডুটা ঝটকে ফেলে ধড়টা ডোবায় টান মেরে ফেলে দেলাম–মুণ্ডুটা সাথে নিয়ে এলাম। কেননা তা হলি লাশ সেনাক্ত করতি পারবে না–ব্যাটা বীরো হাড়ির মুণ্ড চোখ চেয়ে মোর দিকি চেয়ে বলে–যেন আমারে বকুনি দেচ্চে–এখনো যেন চোখ দুটো মুই দেখতি পাই, যেন মোর দিকি চেয়ে কত কি বলচে মোরে
-তারপর সে বৌটির কি হোলো?
–কিছু জানি নে। তবে দুমাস পরে ফকির সেজে আবার গিয়েছিলাম মোড়লবাড়ি সেই বৌটারে দেখবো বলে।–দুটো ভিক্ষে দাও মা ঠাকরুন, যেমন বলিচি অমনি তিনি এসে মোরে ভিক্ষা দেলেন। বেলা তখন দুপুর, রাত্তিরি ভালো দেখতি পাই নি; মুখের দিকে তাকিয়ে দেখি, জগদ্ধাত্তিরি পিরতিমে। দশাসই চেহারা, হর্তেলের মতো রং, দেখে ভক্তি হোলো। বললাম–মা খিদে পেয়েছে।
মা বললেন–কি খাবা?
বললাম–যা দেবা। তখন তিনি বাড়ির মধ্যি গিয়ে আধ-খুঁচি চিড়ে মুড়কি এনে আমার ঝুলিতে দেলেন। মুই মোছলমান সেজেচি, গড় হয়ে পেরণাম করলি সন্দেহ করতি পারে, তাই হাত তুলে বললাম সালাম, মা–বলে চলে এ্যালাম। কিন্তু ইচ্ছে হচ্ছিল দুপায়ের ধুলো মাথায় নিয়ে লুটিয়ে পেরণাম করি। তারপর চলে এ্যালাম–
নিলু এতক্ষণ কাঠের পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে শুনছিল, এইবার বললে–সে যদি মরেই গিয়েচে দাদা, তবে আবার তোমাদের দলের লোক বলে জিভ কাটলে কেন? সে কিসে মরেচে তা আজও কেউ জানে না।
–দিদিমণি তুমি কি বোঝে। নীলকুঠির লোক গিয়ে তার দুটো ছেলেকে উস্তোনকুস্তোন করবে। বলবে, তোর বাবা কনে গিয়েচে। এ আজ ছসাত বছরের কথা। লোক জানে বীরে হাড়ি গঙ্গার ধারে আর একটা বিয়ে করে সেখানেই বাস করচে। মোর সাংড়ার লোক রটিয়ে দিয়েচে। ওর ছেলে দুটো এখন লাঙ্গল চষতি পারে। বড় ছেলেডা খুব জোয়ান হবে ওর বাবার মতো।
–বৌটিকে আর দ্যাখো নি?
–না, তারপরই দুবছর গারদ বাস। সে অন্য কারণে। এ ডাকাতির কিনারা হয় নি!
চৈতন্যভারতী বললেন–তোমার মুখে এ কাহিনী শুনে ভাবচি বৌমার সঙ্গে আমি দেখা করে আসবো। তারা কি জাত বললে?
–সদগোপ।
–আমি যাবো সেখানে। শক্তিমতী মেয়েরা জগদ্ধাত্রীর অবতার। তুমি ঠিকই বলেচ।
–বাবাঠাকুর, আপনি বোধ হয় ইদিকি আর কখনো আসেন নি, থাকেনও না। অমন কিন্তু এখানে আরো দু-চারটে আছে। তবে ভদ্দর গেরস্ত বাড়িতে আর দেখি নি ওই বৌটি ছাড়া। বাগদি, দুলে, মুচি, নমশুদুরের মধ্যে অনেক মেয়ে পাবেন যারা ভালো সড়কি চালায়, কোঁচ চালায়, ফালা চালায়, কাতান চালায়।
