পুকুর-ধারে শচীন বসিয়া ছিল–পাশে গদাধর এবং রেখা বলিয়া একটি মেয়ে।
রেখা বলিতেছিল–আমাদের স্টুডিওতে আপনি রোজ বলেন যাবো, যাবো–কৈ, একদিনও গেলেন না তো!
গদাধর হঠাৎ জড়িতস্বরে বলিলেন–আড়ত থেকে বেরোই আর তোমাদের স্টুডিও বন্ধ হয়ে যায়–যাই কখন বলো, রেখা?
-না, আমার পার্টটা না দেখলে আপনি আমায় নেবেন কি করে?
-আরে, তোমায় এমনিই নিয়ে নেবো, পার্ট দেখতে হবে না। চমৎকার চেহারা তোমার, তোমায় বাদ দিলে কি করে হবে?
–সুষমা দিদিকেও নিতে হবে।
–নেবো। তুমি যাকে যাকে বলবে, তাদের সবাইকে নেবো।
–সুষমা দিদির মত গান কেউ গাইতে পারবে না, দেখলেন তো সেদিন, রুক্মিণীর গানে কেমন জমালে?
–চমৎকার গান–অমন শুনি নি।
শচীন পাশ হইতে বলিল–তুমি যা শোনো, সব চমৎকার! গানের তুমি কি বোঝো হে? আজ সুষমার গান শুনো-এখন, বুঝতে পারবে। সত্যি, ওকে বাদ দিয়ে ছবির কাজ চলবে না। একটু বেশি মাইনে চাইছে, তা দিয়েও রাখতে হবে। নীলা, দীপ্তি–ওদেরও দ্যাখো–এখানে ডাক দাও না সব–মিনি, সুবালা, বড় হেনা, ছোট হেনা…
গদাধর ব্যস্তভাবে বলিলেন–না, না, এখানে ডেকে কি হবে? থাক সব, আমি যাচ্চি।
৫-৬. বাগানের বাড়ীটার সামনেই পুকুর
বাগানের বাড়ীটার সামনেই পুকুর। পুকুরের ওপারে কলমের আমগাছ অনেকগুলি–ওদিকের অংশটা তারের জাল দিয়া ঘেরা। কারণ এখন আমের বউলের গুটির সময় আসিতেছে–ইজারাদার ঘিরিবার ব্যবস্থা করিয়াছে। কলমবাগান ও পুকুরের মাঝখানে এখনও বেশ ভালো ভালো গোলাপ হয়। এখানে বাঁধানো চবুতারায় একটা দল ভিড় করিয়া বসিয়া গল্পগুজব ও হল্লা করিতেছে।
শচীন বলিল–অঘোরবাবুকে তাহ’লে ডাকি। আজ দোল পূর্ণিমা, শুভ দিন–একটা ব্যবস্থা করে ফেল। যেমন কথা আছে।
–অঘোরবাবু এসেচেন?
-এই তো মোটরের শব্দ হলো,–এলেন বোধহয়। স্টুডিওর মোটর আনতে গিয়েছিল কিনা।
–বেশ, করে ফেল সব ব্যবস্থা।
প্রায় পঞ্চাশ বছরের এক শৌখীন প্রৌঢ় লোক–রঙ শ্যামবর্ণ, বেঁটে, একহারা চেহারা–মাথার চুলে এই বয়সেও ব্রিলেন্টাইন মাখানো, মুখে সিগারেট–আসিয়া ঘাটের সিঁড়ির মাথায় দাঁড়াইয়া বলিলেন–এই যে, সব এখানে!
শচীন ও গদাধর দুজনে ব্যস্ত হইয়া বলিলেন–আসুন, আসুন অঘোরবাবু, আপনার কথা হচ্ছিল।
রেখার দিকে চাহিয়া অঘোরবাবু বলিলেন–তাই তো, আমাদের একটা কথা ছিল। না হয় চলুন ওদিকে।
রেখা অভিমানের সুরে বলিল–বললেই হয় যে, উঠে যাও, অমন করে ভণিতা করবার কি অধিকার আপনার আছে মশাই?
হাসিয়া অঘোরবাবু বলিলেন–না রেখা বিবি, অধিকার কিছু নেই, জানি! এখন লক্ষ্মীটি হয়ে দু’পা একটু কষ্ট করে এগিয়ে গিয়ে, ওই চাতালে বসে যারা স্ফুর্তি করছে, ওখানে যাও না। আমরা একটু পাতলা হয়ে বসি।
রেখা রাগ করিয়া বলিল–অমন রেখা-বিবি, রেখা-বিবি বলবেন না বলচি ও কেমন কথা। না, আমি অমন সব ধরণের কথা ভালবাসি নে।
রেখা উঠিয়া ফড়ফড় করিয়া চলিয়া গেল।
অঘোরবাবু বলিলেন–তারপর, আপনি তো এই আছেন দেখচি। একটা ব্যবস্থা তাহলে হয়ে যাক। আজ শুভদিন–দোলযাত্রা পূর্ণিমা তিথি।
শচীন বলিল–আর এদিকে পূর্ণিমার চাঁদের ভিড়ও লেগে গিয়েচে ঘোষেদের বাগানবাড়ীতে–আমার মত যদি নাও তবে…
অঘোরবাবু ধমক দিয়া বলিলেন–অহো, তোমার সবতাতে ঠাট্টা আর ইয়ার্কি ভালো লাগে না। শোন না, কি কথা হচ্চে।
গদাধর বলিলেন–আপনি হিসেবটা করেচেন মোটামুটি?
–হ্যাঁ, এখন এগার হাজার আন্দাজ বার করতে হবে আপনাকে। সব হিসেব দেখিয়ে বুঝিয়ে দিচ্ছি। আজ চেক-বই এনেচেন? পাঁচ হাজার আজই দরকার। বাগানটার লিজ রেজিষ্ট্রি হবে সোমবারে–সেলামীর টাকা আর এক বছরের ভাড়া আজ জমা দিতেই হবে। অনেকখানি জমি আছে–স্টুডিওর উপযুক্ত জায়গা বটে। আর একটা কাজ করতে হবে আজ–সব মেয়েদের আজ কিছু কিছু বায়না দিয়ে হাতে রাখা চাই। এই ধরুন রেখা আছে, খুব ভাল নাচ অর্গানাইজ করে। ওকে রাখতে হবে। তারপর ধরুন সুষমাও বেঙ্গল ন্যাশনাল ফিল্ম স্টুডিওতে এখনও কাজ করে, ওকে আগে আটকাতে হবে। একবার ওদের সব ডাকিয়ে এনে যার যার নাচ-গান দেখে-শুনে নেবেন নাকি?
শচীন বলিল–না, না, সেটা ভালো হয় না। ওরা সবাই নামজাদা আর্টিস্ট ভিন্ন ভিন্ন জায়গায় কাজ করছে, কেউ বা করেচে– ওদের নাম কে না জানে? এই ধরুন, সুষমা…
অঘোরবাবু আঙুলে টাকা বাজাইবার ভঙ্গি করিয়া বলিলেন– আরে রেখে দাও আর্টিস্ট–সবাই আর্টিস্ট! আমিই কি কম আর্টিস্ট টাকা খরচ করতে হবে যেখানে, সব বাজিয়ে নেবো–এই রকম করে বাজিয়ে নেবো। আমি বুঝি, কাজ। এই অঘোরনাথ হালদার। সাতটা ফিল্ম কোম্পানি এই হাতে গড়েচে, আবার এই হাতে ভেঙেচে। ও কাজ আর আমায় তুমি শিখিও না।
গদাধর বলিলেন–যাক্, ওসব বাজে কথায় কান দেবেন না। আপনি যা ভালো বুঝবেন, করুন। কত টাকা চাই এখন বলুন?
-তাহলে ওদের সব ডাকি। পৃথক পৃথক কন্ট্রাক্ট হোক– সোমবার সব রেজিস্ট্রি হবে–লিজের সেলামী দু’হাজার, আর ভাড়া পাঁচশো–এ টাকাটি আলাদা করে রেখে বাকি ওদের দিয়ে দেবো।
–ওদের টাকা এখন দিতে হবে কেন? কান্ট্রাক্ট রেজিস্ট্রি হবার সময় টাকা দিলেই চলবে।
–না, না, এ তো বায়না। অঘোর হালদার অত কাঁচা কাজ করে না স্যর।
–বেশ।
রেখার ডাক পড়িল পুকুরঘাটে। অঘোরবাবু বলিলেন–রেখা বিবি, লেখাপড়া জানো তো? ফর্ম সই করতে হবে এখুনি।
