–আবার রেখা বিবি?
–বেশ, কি বলে ডাকতে হবে, শিখিয়ে দাও না হয়!
–কেন, রেখা দেবী…পোস্টারে লেখা থাকে দেখেন নি কখনো? রেখা বিবি বললে আমি জবাব দিই নে।
বলিয়া রেখা নাক উঁচু করিয়া গর্বিতভাবে মুখ ঘুরাইয়া লইয়া চমৎকারভাবে সপ্রমাণ করিল যে, সে একজন সুনিপুণ অভিনেত্রী যদিও ভঙ্গিটা বিলিতি ছবির অভিনেত্রীদের হুবহু নকল।
অঘোরবাবু বলিলেন–এখানে সই করো, বেশ পষ্ট করে লেখো
রেখা নিজের ব্লাইজের বুকের দিকটা হইতে ছোট একটা ফাউন্টেন পেন বাহির করিতেই অঘোরবাবু বলিয়া উঠিলেন– আরে, বলো কি। তোমার আবার ফাউন্টেন পেন বেরুলো কোথা থেকে..য়্যাঁ! তুমি দেখচি কলেজের মেয়ে কি ইস্কুলের মাস্টারনী বনে গেলে! বলি, কালিকলমের সঙ্গে তোমার কিসের সম্পর্ক, জিজ্ঞেস করি? টাকাটা লেখো, টাকা!
–কত টাকা? যথেষ্ট অপমান তো করলেন।
–মাছের মায়ের পুত্র-শোক! অপমান কিসের মধ্যে দেখলে? সত্তর টাকার মধ্যে বায়না আজ পাঁচ টাকা।
রেখা রাগ করিয়া কলম বন্ধ করিয়া বলিল–পাঁচ টাকা? চাই, দিতে হবে না। পাঁচ টাকা এ্যাডভান্স নিয়ে যারা কাজ করে, তারা একস্ট্রা ভিড়ের সিনে প্লে করে–আর্টিস্ট নয়। আমাদের অপমান করবেন না।
–কত চাও রেখা দেবী, শুনি?
–অর্ধেক–পঁয়ত্রিশ টাকা–থার্টি-ফাইভ রুপি।
থাক থাক, আর ইংরিজি বলতে হবে না। দিচ্চি আমি, তাই দিচ্চি। আমাদের একটু নাচ দেখাবে তো? লেখো টাকাটা।
–পরে হবে-এখন।
–এখনই হবে, ক্যাপিটালিস্ট দেখতে চাচ্ছেন–ওঁর ইচ্ছে এখানে সকলের বড়।
রেখা দ্বিরুক্তি না করিয়াই পেশাদার নর্তকীর সহজ ও বহুবার অভ্যস্ত ভঙ্গিতে পুকুরঘাটের চওড়া চাতালের উপর আধুনিক প্রাচ্য নৃত্য শুরু করিল। রেখা কৃশাঙ্গী মেয়ে। নাচের উপযুক্ত দেহের গড়ন বটে–জ্যোৎস্নারাত্রে নৃত্যরতা তরুণীর বিভিন্ন লাস্যভঙ্গি দেখিয়া গদাধর ভাবিলেন–টাকা সার্থক হয় এই ব্যবসায়! খরচ করেও সুখ, লাভ যদি পাই তাতেও সুখ! যে বয়েসের যা—আমার বয়েস তো চলে যায় নি এ-সবের!
অল্প একটু বিশ্রাম করিয়া রেখা বলিল–কথাকলি দেখবেন? সেবার এম্পায়ারে এসেছিলেন সত্যভামা দেবী–মাদ্রাজী মেয়ে, অমন কথাকলি আর কখনো…কি পোজ এক-একখানা। আমরা স্টুডিও সুদ্ধু নাচিয়ের দল এম্পায়ারে দেখতে গিয়েছিলুম কোম্পানির খরচে। দেখবেন?
-তুমি একবার দেখেই অমনি শিখে নিলে?
–কেন নেবো না–আমরা আর্টিস্ট লোক!
–আচ্ছা, থাক এখন কথাকলি। সুষমা দেবী কই? তাঁকে ডেকে ফর্মটা সই করে নেওয়া দরকার।
ডাক দিতে সুষমা আসিল। দেখিতে ভালো নয়, দোহারা চেহারা–গলার স্বর বেশ মিষ্ট। বেশি কথা বলে না, তবে সে আসিয়া সমস্ত জিনিসটা একটা তামাশার ভাবে গ্রহণ করিল। অঘোরবাবু বলিলেন–টাকাটা লিখুন আগে–চল্লিশ টাকা।
সুষমা কোনো কথা না বলিয়া নাম সই করিয়া চেক লইয়া চলিয়া যাইতে উদ্যত হইলে অঘোরবাবু বলিলেন–উঁহু, গান গাইতে হবে একটা
সুষমা হাসিয়া বলিল–সে কি? এখন কখনো গান হতে পারে?
-ক্যাপিটালিস্ট বলছেন,–ওঁর কথা রাখতে হবে। গান করুন একটা।
গদাধর মোলায়েম ভাবে বলিলেন–না, না, থাক। উনি নামকরা গায়িকা–সবাই জানে। ওঁকে আর গান গাইতে হবে না। ও নিয়ম সকলের জন্যে নয়।
রেখা কাছেই ছিল, সে ঘাড় বাঁকাইয়া বলিল–নিয়মটা তবে কি আমার মত বাজে লোকদের জন্যে তৈরী? এ তো রীতিমত অপমানের কথা। না, এ কখনো…
ইহাদের কি করিয়া চালাইতে হয়, অঘোরবাবু জানেন। তিনি রেখার কাছে ঘেঁষিয়া দাঁড়াইয়া তাহার মুখের কাছে হাত ঘুরাইয়া বলিলেন–রেখা বি–মানে দেবী, চটো কেন? গান আমরা সর্বদা গ্রামোফোনে শুনচি, রেডিওতে শুনুচি। কলকাতায় তো গান শোনবার অভাব নেই–কিন্তু নাচ আমরা সর্বদা দেখি নে–তোমার মত আর্টিস্টের নাচ দেখার একটা লোভও তো আছে–বুঝলে না?
গদাধরের বেশ লাগিতেছিল। বাড়ীতে থাকিলে এতক্ষণ তিনি ঘুমাইয়া পড়িয়াছেন–নয়তো বসিয়া গদির হিসাবপত্র দেখিতেছেন। এ তবু পাঁচজনের মুখ দেখিয়া আনন্দে আছেন– বিশেষ করিয়া এমন সঙ্গ, এমন একটা রাত! একবার তাঁহার মনে হইল, অনঙ্গ আজ একটু সকাল-সকাল ফিরিতে বলিয়াছিল, বাড়ীতে যেন কি পূজা হইবে। তা তিনি গিয়া কি করিবেন? ভড় মশায় আছে, নিতাই আছে–দু’জন চাকর আছে–তাহারাই সব দেখাশুনা করিতে পারিবে এখন। তাঁহার অত গরজ নাই।
একে একে অনেকগুলি মেয়ের কন্ট্রাক্ট-ফর্ম সই করা হইয়া গেল। তাহারা পুকুরের সামনের পাড়ে–যেখানে সাবেক কালের গোলাপবাগ, সেদিক হইতে আসে–আসিয়া সই করিয়া আবার গোলাপবাগে ফিরিয়া যায়–যেন একগাছি ফুলের মালা ঢল হইয়া গিয়াছে–একএকটি করিয়া ফুল সরিয়া সরিয়া সূতার এদিক হইতে ওদিকে নাচের ভঙ্গিতে চলিতেছে..
গদাধর কি একটা ইঙ্গিত করিলেন একজন চাকরকে।
অঘোরবাবু বলিলেন–এখন আর না স্যর, যদি আমায় মাপ করেন। কাজের সময় ইয়ে ওটা বেশি না খাওয়াই ভালো। হ্যাঁ, আর-একটা কথা স্যর–যদি বেয়াদবি হয়, মাপ করবেন। আপনি ক্যাপিটালিস্ট, মালিক–একটু রাশভারি হয়ে চলবেন ওদের সামনে। ওরা কি জানেন, ‘নাই’ যদি দিয়েচেন, তবে একেবারে মাথায় উঠেচে! ধমকে রাখুন, ঠিক থাকবে। ‘নাই’ ওদের কখনো দিতে নেই। ওই রেখা…আপনার সামনে অত সব কথা বলতে সাহস করবে কেন? আমি এর আগে ছিলাম বেঙ্গল ন্যাশনাল ফিল্ম-এ-ক্যাপিটালিস্ট ছিল দেবীচাঁদ গোঠে, ভাটিয়া মার্চেন্ট। ক্রোড়পতি। গোঠে যখন স্টুডিওতে ঢুকতো–তার গাড়ীর আওয়াজ পেলে সব থরহরি লেগে যেতো। ওই শোভা মিত্তিরের মত–নাম শুনেছেন তো? অমন দরের বড় আর্টিস্টও গোঠেজির সামনে ভালো করে চোখ তুলে কথা বলতে সাহস করতো না। শোভারাণী মিত্তিরের কাছে রেখা টেখা এরা সব কি? শোভা এখন এদের এই কোম্পানিতে কাজ করে শুনচি।
