–সেইরকমই বটে। কিন্তু সে কি করেছে, বলুন তো? আমি কিছু বুঝতে পারচি নে।
–সে-কথা আপনাকে বলে শুধু মনে কষ্ট দেওয়া। স্টুডিওর একটা চেক্ ভাঙাতে দিয়েছিলাম–দুশো টাকার চেক–তারপর থেকে আর দেখা নেই। আপনি যেদিন এখানে এসেছিলেন, তার পরের দিন। শুনেচি, কোন্নগরে আছে–চিঠি লিখেও শচীনবাবু উত্তর পায় না। অথচ আমার এদিকে টাকার দরকার।
গদাধর বুঝিলেন, শচীন যাহা গুরুতর ব্যাপার বলিতেছে– তাহা এমন গুরুতর নয়। নির্মল মাঝে মাঝে এমন করিয়া থাকে। তাঁহার চেক ভাঙাইতে গিয়াও সে এমন করিয়াছে। তবে তিনি বাল্যবন্ধু–তাঁহার বেলা যাহা করা চলে, সব ক্ষেত্রে তাহা করা উচিত? নির্মলটার বুদ্ধিসুদ্ধি যে কবে হইবে!
তিনি বলিলেন–তাই তো, ভারি অন্যায় দেখছি তার। আমার সঙ্গে একবার দেখা হলে আচ্ছা করে ধমকে দেবো।
–হ্যাঁ, দেবেন তো–দেওয়াই উচিত।
মৃদু উদাসীন কণ্ঠস্বর শোভার। রাগ বা ঝাঁঝ তো নাই-ই–এমন কি, এতটুকু উদ্বেগের রেশ পর্যন্ত নাই! গদাধর মুগ্ধ হইলেন। এক্ষেত্রে তাঁহাকে সামনে পাইয়া চেঁচামেচি করা এবং টাকার একটা কিনারা হওয়া সম্বন্ধে উদ্বেগ প্রদর্শন, পরামর্শ আহ্বান করা ইত্যাদিই স্বাভাবিক। পাড়াগাঁয়ের মেয়েদের মধ্যে ইহা অপেক্ষা অনেক তুচ্ছ ব্যাপার লইয়া ভীষণ চীৎকার ও রাগারাগি করিতে দেখিয়া আসিতেছেন তিনি আজীবন। কিন্তু দুশো টাকার ক্ষতি সহ্য করিয়াও এমন নিরুদ্বেগ শান্ত ভাব তিনি কখনো দেখেন। নাই–না মেয়েদের মধ্যে, না পুরুষদের মধ্যে।
গদাধর একটি সাহসের কাজ করিলেন। বিনীতভাবে বলিলেন– একটা কথা বলি–কিছু মনে করবেন না।
শোভা বলিল–কি, বলুন?
–আপনার টাকার দরকার বলচিলেন…ও টাকাটা আমি কাল সকালেই আপনাকে পাঠিয়ে দিচ্চি। নির্মলের কাছ থেকে চেকের টাকা আমি আদায় করে নেবো।
–আপনি? না না, আপনি কেন দেবেন?
–আমি এগারোটা পর্যন্ত আছি।
আজ্ঞে তা হোক। আপনি যদি কিছু মনে না করেন…
শোভা আর কোনো তর্ক না করিয়া বেশ নির্বিকার কণ্ঠে বলিল–বেশ, দেবেন।
গদাধর কৃতার্থ হইয়া গেলেন যেন। বলিলেন–কাল সকালে কি থাকবেন?–তাহলে আমি নিজেই ওটা নিয়ে আসবো।
–আপনি আবার কষ্ট করে আসবেন কেন–কাউকে দিয়ে পাঠিয়ে দেবেন না হয়।
গদাধর দেখিলেন, এ জায়গায় অন্য কাহাকেও চেক দিয়া পাঠানো চলিবে না–নতুবা ভড় মহাশয়কে পাঠাইয়া দিলে চলিত। ভড়মহাশয় বা অন্য কেহ মুখে কিছু না বলিলেও, নানারকম সন্দেহ করিতে পারে–কথাটা পাঁচ-কান হওয়াও বিচিত্র নয় সে অবস্থায়। সুতরাং তিনি বলিলেন–তাতে কি, কষ্ট করবার কি আছে এর মধ্যে! আমি নিজেই আসবো এখন।
–কলকাতায় আপনি কোথায় থাকেন?
–আজ্ঞে, লালবিহারী সা রোড, মানিকতলা।
–নির্মলবাবুকে চিনলেন কি করে?
–আমার গাঁয়ের লোক…এক গাঁয়ে বাড়ী।
গদাধরের অত্যন্ত কৌতূহল হইল, শোভারাণীর সঙ্গে নির্মলের কিভাবে পরিচয় হইল জিজ্ঞাসা করেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত কথাটা জিজ্ঞাসা করিতে পারিলেন না। কিছুক্ষণ আবার দু’জনেই চুপ। গদাধর অস্বস্তি বোধ করিতে লাগিলেন, এবার বোধ হয় যাওয়া ভালো–বেশিক্ষণ থাকা হয়তো বেয়াদপি হইবে। কিন্তু হঠাৎ ওঠেনই বা কি বলিয়া।
শোভাই হঠাৎ বলিয়া উঠিল–চা খাবেন?
গদাধর জানাইলেন, এখন তিনি চায়ের জন্য কষ্ট দিতে রাজী নন–এইমাত্র খাইয়া আসিলেন, শোভারাণী আবার চুপ করিল।
কিছুক্ষণ উসখুস করিয়া গদাধর বলিলেন–তাহলে আমি এবার যাই–রাত হয়ে গেল।
শোভা বলিল–আচ্ছা,আসুন তবে।
গদাধর উঠিলেন, এবার শোভা এমন একটি ব্যাপার করিল, তার মত গর্বিতা মেয়ের নিকট গদাধর যাহা প্রত্যাশা করেন নাই–শোভা ঈজিচেয়ার হইতে উঠিয়া সিঁড়ির মুখ পর্যন্ত তাঁহাকে আগাইয়া দিতে আসিল। গদাধর সমস্ত দেহে এক অপূর্ব আনন্দের শিহরণ অনুভব করিলেন। নেশার মত সেটা তাঁহাকে আচ্ছন্ন করিয়া রাখিল সারা পথ। গদাধরের পক্ষে এ অনুভূতি এত নূতন যে, তিনি নিজের এই পরিবর্তনে কেমন ভীত হইয়া পড়িলেন।
স্বামীকে সিঁড়িতে উঠিতে দেখিয়া অনঙ্গ বলিল–বাপরে! এত দেরি করবে তা তো বলে গেলে না–আমি ব’সে ব’সে ভাবচি!
–ভাবার কি দরকার আছে? ছেলেমানুষ তো নই যে পথ হারিয়ে যাবো।
হঠাৎ সেই অপূর্ব অনুভূতি যেন ধাক্কা খাইয়া চুরমার হইয়া গেল। সাধারণ মানুষের মতই দৈনন্দিন একঘেয়েমি ও বৈচিত্র্যহীনতার মধ্যে গদাধর খাইতে বসিলেন।
পরদিন সকালে আটটার পরে গদাধর শোভারাণীর বাড়ী গিয়া কড়া নাড়িলেন। ছোকরা চাকরটি দরজা খুলিয়া তাঁহাকে দেখিয়া চিনিতে পারিল এবং উপরে লইয়া গিয়া বারান্দার বেতের চেয়ারে বসাইয়া বলিল–মাইজি নাইবার ঘরে–আপনি বসুন।
একটু পরে ভিজে এলো-চুলের রাশি পিঠে ফেলিয়া সদ্যস্নাতা শোভা সিমলের সাদা শাড়ী পরিয়া ঘরে ঢুকিয়া বলিল–এই যে, এসেচেন! নমস্কার! খুব সকালেই এসে পড়েছেন। বসুন, আমি আসছি।
শোভা পাশের ঘরে ঢুকিয়া দুখানা মাসিকপত্র, একখানা লেটারপ্যাড ও একটা ফাউন্টেন পেন লইয়া ঈজিচেয়ারটিতে আসিয়া বসিল এবং চেয়ারের চওড়া হাতলের উপর সেগুলি রাখিয়া গদাধরের দিকে চাহিয়া বলিল–তারপর?
তার মুখও অন্যান্য দিনের মত উদাসীন অপ্রসন্ন নয়। বেশ প্রফুল্ল। এমন কি ঈষৎ মৃদু হাসিও যেন কখনো অধরপ্রান্তে আসিতেছে, কখনও মিলাইয়া যাইতেছে।
শোভা হাসিমুখে বলিল–বসুন, চা খান, আমি এখনও চা খাই নি। স্নান না করে কিছু খাই না। আপনার তাড়া নেই তো?
