–আজ্ঞে না, তাড়া নেই। চা কিন্তু একবার খেয়ে–
–সেটা উচিত হয় নি, এখানে যখন সকালে আসছেন। কোনো আপত্তি নেই তো?
গদাধর তটস্থ হইয়া বলিলেন–আজ্ঞে না, আপত্তি কি?
শোভা বলিল–ওরে নিয়ে আয়, ও লালচাঁদ!
গদাধর দেখিলেন, এ অন্য-একজন চাকর। শোভারাণীর অবস্থা তাহা হইলে বেশ ভালো। তিনজন চাকর আছে, ঝিও একটা ঘুরিতেছে–ঠাকুর নিশ্চয়ই আছে। স্টার অভিনেত্রী শোভারাণী নিশ্চয় নিজের হাতে রান্না করেন না!
লালচাঁদ ট্রেতে দু-পেয়ালা চা, আর দুখানা প্লেটে ডিমভাজা, টোস্ট, ও দুটি করিয়া কলা লইয়া দুটি টিপয়ে সাজাইয়া দিয়া চলিয়া গেল।
শোভা বলিল–নুন দেয় নি দেখচি। আপনাকেও দেয় নি? আঃ, এদের নিয়ে–ও লালচাঁদ!
–আপনি তো অনেক বেলায় চা খান! এখন নটা বাজে!
–আমি? হ্যাঁ, তাই হয়। ঘুম থেকে উঠতে দেরি হয়ে যায়, প্রায় সাড়ে-সাতটা—এক একদিন তার বেশিও হয়। স্টুডিওতে অনেক রাত পর্যন্ত কাজ হচ্চে আজকাল–রাত এগারোটা হয় এক-একদিন ফিরতে।
গদাধর স্টুডিও কি ব্যাপার ভালো জানিতেন না, কৌতূহলের সহিত জিজ্ঞাসা করিলেন–আচ্ছা, সেখানে কি হয়? ছবি তৈরী হয় বুঝি?
শোভা বিস্ময়ের সহিত বলিল–আপনি জানেন না? দেখেন নি কখনো? টালিগঞ্জের ওদিকে কখনো–ও!…
–আজ্ঞে, আমরা হলাম গিয়ে পল্লীগ্রামের লোক, আড়তদারি ব্যবসা নিয়েই দিন কেটে যায়। সত্যি কথা বলতে, কখনই বা সময় পাবো, আর কখনই বা সেই টালিগঞ্জে গিয়ে স্টুডিও
হাসিয়া শোভা বলিল–তা তো বটেই। বেশ, চলুন না একদিন আমার গাড়িতে যাবেন আমার সঙ্গে, স্টুডিও দেখে আসবেন।
গদাধর কান খাড়া করিয়া শুনিলেন, আমার গাড়ী! মানে? তাহা হইলে মোটরও আছে। গদাধর যাহা মনে করিয়াছিলেন তাহা নয়, এ মেয়েটির অবস্থা হয়তো তাঁহার অপেক্ষাও ভালো। কলিকাতার লোককে বাহিরে দেখিয়া চেনা যায় না। তিনি এতদিন পাটের ব্যবসা করিয়া পাটের ফেঁসো খাইয়া মরিলেন, মোটরগাড়ীর মুখ দেখিতে পাইলেন না। অথচ মেয়েটি এই অল্পবয়সে–দেখ একবার! বিনীতভাবে তিনি উত্তর দিলেন–আজ্ঞে, তা গেলেই হয়, আপনি যদি–তা বরং একদিন…
–আর এক পেয়ালা চা?
–আজ্ঞে না, আর…
–আমার কিন্তু দু’পেয়ালার কমে হয় না। সারাদিনের মধ্যে দশ-বারো বার হয়ে যায়–স্টুডিওতে তো খালি চা আর খালি চা– না হলে পারিনে হাঁপিয়ে পড়ি–যেমন পরিশ্রম, তেমনি গরম–
চাকর এক পেয়ালা চা আনিয়া শোভার পাশের টিপয়ে রাখিয়া তাহার মুখের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাহিল। শোভা তাহাকে বলিল–না, এখন যা–আপনি সত্যিই নেবেন না আর-এক–
–আজ্ঞে না, আমার শরীর খারাপ হয় বেশি চা খেলে। তেমন অভ্যেস নেই তো!
–আপনার শরীর দেখে মনে হয় বোধহয় ম্যালেরিয়া হয় মাঝে মাঝে?
–আগে হয়ে গিয়েচে, এখন কলকাতায় আর হয় না।
–বাড়ী করেচেন তো এখানে? বেশ, এখানেই থাকুন। শচীনবাবু আপনার ভাই হয় সম্পর্কে? ও জানেন, আমাদের স্টুডিওতে কাজ করে। আমার সঙ্গে আজ দেখা হবে এখন–বলবো আপনার কথা।
শচীন স্টুডিওতে কাজ করে, তা তো জানতুম না।
–জানতেন না নাকি? বেশ। সেই নিয়েই তো আমার সঙ্গে জানাশোনা হলো–এখানে আসে যায় মাঝে মাঝে। আমার গানগুলো একবার সুর দিয়ে ওর সঙ্গে সেট করে নিই।
শচীন বাজাইতে পারে, গদাধর আগেই জানিতেন–সখের যাত্রার দলে বাঁশি বাজাইয়া বেড়াইয়া লেখাপড়া শিখিল না, কখনো বিষয়-আশয় দেখাশুনা করিল না। সে যে কলিকাতায় আসিয়া এত-বড় ‘বাজিয়ে’ হইয়া উঠিয়াছে, ফিলম্ তোলার স্টুডিওতে চাকরি করে–এত খবর তিনি রাখিতেন না। শুনিয়া আশ্চর্য হইলেন।
চা-পান শেষ হইলে গদাধর দু’এক কথার পর পুনরায় চেক বই বাহির করিলেন। একটু ইতস্ততঃ করিয়া বলিলেন–তাহ’লে ক্রস চেক দেবো কি? আপনার পুরো নামটা
–ও, চেকখানা? ও আপনাকে দিতে হবে না।
গদাধর এমন বিস্মিত হইলেন যে তাঁহার মনে হইল, তিনি কথার অর্থ ঠিক বুঝিতেছেন না। শোভার মুখের দিকে চাহিয়া পুনরায় বলিলেন,–না, মানে আমি বলচি, আপনার নামটা চেকে লিখে ক্রস করে দেব কিনা?
শোভা এবার বেশ ভাল ভাবেই হাসিল। মৃদুহাসি নয়, সত্যিকার আমোদ আর কৌতুকের হাসি। গদাধর মুগ্ধ হইয়া গেলেন সেই অতি অল্প দু’এক সেকেন্ডের মধ্যেই। হাসিলে, যে সব মেয়ে যথার্থ সুন্দরী, তাদের চোখে-মুখে কি সৌন্দর্য ও মোহ ফুটিয়া উঠে গদাধর পাটের বস্তা ওজন করিয়া মোকামে মোকামে ঘুরিয়া কাল কাটাইয়াছেন এতদিন–কখনো দেখেন নাই!
হাসিতে হাসিতে শোভা বলিল–আপনি ভারি মজার লোক– বেশ লাগে আপনাকে–শুনতে পেলেন না, কি বলচি? ও চেক দিতে হবে না আপনাকে।
–কেন বলুন তো?
–আপনার বন্ধু নিয়ে গেল টাকা আমার কাছ থেকে ঠকিয়ে আপনি কেন দণ্ড দেবেন? গেল, যাক্গে, আমারই গেল।
-না না, তা কখনও হয়? আমার তো বন্ধু, ও অভাবী লোক, ঠিক যে ঠকিয়ে নিয়েছে, তা নয়। ও টাকা আমি আদায় করবো। নিন আমার কাছ থেকে– আপনার পুরো নামটা
শোভার মুখশ্রী ও চোখের দৃষ্টি অত্যন্ত সদয় হইয়া আসিয়াছে– সে গর্বিত ও উদাস ভাব আর ওর মুখে-চোখে নাই। দুই হাত অদ্ভুত নাচের ভঙ্গিতে সামনের দিকে প্রসারিত করিয়া সে বলিল– না, আমি বলচি, কেন দুশো টাকা মিথ্যে দণ্ড দেবেন? যদি আদায় করতে পারি, আমিই করবো। আমি ফিলমে কাজ করি। অনেক লোকের সঙ্গে মিশি রোজ–মানুষ চিনি। আপনার বন্ধুটি আপনার মত ভালমানুষ লোককে কখনো টাকা শোধ করবে না–কিন্তু আমার কাছে করবে। চেক-বইটা পকেটে ফেলুন।
