–কই, কি চিঠি, দেখি?
অনঙ্গ একখানা খামের চিঠি আনিয়া স্বামীর হাতে দিল। গদাধর চা খাইতে খাইতে খাম খুলিয়া পড়িলেন। লেখা আছে–তোমার দেখা পেলাম না এসে। শুনলাম নাকি আড়তের কাজে বার হয়েচো। দেশ থেকে বাবা চিঠি লিখেছেন, তাঁর শরীর অসুস্থ একবার দেশে যেতে হবে। একটা কথা, শোভারানী তোমার কথা সেদিন জিগ্যেস করছিল–সময় পেলে একদিন এসো না? আমার ওখানে এসো, আমি নিয়ে যাবো। নির্মল এখনও কোন্নগর থেকে ফেরে নি। সে একটা গুরুতর কাজ করে গিয়েচে, সেজন্যে শোভারাণীর সঙ্গে একবার তোমার দেখা করা জরুরী দরকার। এলে সব কথা বলবো। সেইজন্যেই শোভা তোমার খোঁজ করেচে।
চিঠি পড়িয়া গদাধর বিস্মিত হইলেন। শচীন কখনো তাহার বাড়ী আসে না, আসার রেওয়াজ নাই। সে আসিয়া এমন একখানি জরুরী চিঠি দিয়া গেল। নির্মল কি করিয়াছে? শোভারাণী মস্ত-বড় অভিনেত্রী–তাঁর সঙ্গে নির্মলের কি সম্বন্ধ? তাহাকেই বা তাঁহার নিজের দরকার–ব্যাপার কি?
স্বামীর মুখ দেখিয়া অনঙ্গ কৌতূহলের সহিত বলিল–কি চিঠি গা?
–য়্যা চিঠি! হ্যাঁ, ও একটা…
–কোনো খারাপ খবর নয় তো?
–নাঃ। এ অন্য চিঠি। …আচ্ছা, আমি চলে গেলে নির্মল এখানে এসেছিল আর?
–একদিন এসেছিল বটে। কেন বলো তো? তার কিছু হয়েচে নাকি?
–না, সে-সব নয়। সে বাড়ী যায় নি কিনা…
–সুধাদের সঙ্গে দেখা করেচিলে?
-না, আমার সময় কোথায়? কখন যাই ও-পাড়ার সুধাদের বাড়ী?
–খেলে কোথায়?
–সিধুদা’দের বাড়ী। হৈম এসে ডেকে নিয়ে গেল।
গদাধরের কিন্তু এসব কথা ভালো লাগিতেছিল না। কি এমন ঘটিল, যাহার জন্য শোভারাণী খোঁজ করিয়াছেন! নির্মল গ্রামে ফিরে নাই, অথচ তিনদিনের মধ্যেই তাহার ফিরিবার কথা।
শোভারাণীই বা তাঁহার খোঁজ করিলেন কেন? তাঁহার সহিত এসব ব্যাপারের সম্পর্ক কি?
গদাধর স্ত্রীকে বলিলেন–ক’টা বাজলো দেখ তো?
–এই তো দেখে এলাম সাতটা বাজে। কেন, এখন আবার বেরুবে নাকি?
–এক জায়গায় যেতে হবে এখুনি। আড়তের কাজ–ফিরতে দেরি হতে পারে।
আড়তের কাজ শুনিয়া অনঙ্গ আপত্তি করিল না–নহিলে ক্লান্ত স্বামীকে সে কিছুতেই এখনি আবার বাহিরে যাইতে দিত না।
গদাধর প্রথমে শচীনের বাসায় আসিয়া শুনিলেন, সে বাহির হইয়া গিয়াছে, কখন আসিবে ঠিক নাই। গদাধর ঘড়ি দেখিলেন, আটটা বাজে। একা এত রাত্রে শোভরাণীর বাড়ী যাওয়া কি উচিত হইবে? অথচ নির্মল কি এমন গুরুতর কাজ করিয়াছে, তাহা না কে জানিলেও তো তাহার স্বস্তি নাই।
সাত-পাঁচ ভাবিয়া গদাধর একাই শোভারাণীর বাড়ী যাইবেন স্থির করিলেন। বাড়ীর নম্বর তিনি সেদিন দেখিয়াছেন, নিশ্চয় বাহির করিতে কষ্ট হইবে না।
বাড়ীর যত নিকটবর্তী হইতে লাগিলেন, বুকের মধ্যে ভীষণ ঢিপঢিপ করিতে শুরু করিল, জিভ যেন শুকাইয়া আসিতেছে, কান দিয়া ঝাল বাহির হইতেছে–বুকের ভিতরে তোলপাড় কিছুতে শান্ত হয় না। এমন তো কখনো হয় নাই। গদাধর খানিকটা বিস্মিত, খানিকটা ভীত হইয়া উঠিলেন।
অনেকখানি আসিয়া ঠিক করিলেন, থাক আজ, সেখানে শচীনের সঙ্গে যাওয়াই ভালো। মহিলাদের সঙ্গে তেমন করিয়া আলাপ করা তাঁহার অভ্যাস নাই, কখনো করেন নাই–বড় বাধো-বাধো ঠেকে। তাছাড়া তিনি যদি কিছু মনে করেন?
কিন্তু গদাধর ফিরিতে পারিলেন না। উত্তেজনা ও ভয়ের পিছনে মনের গভীর গহনে একটা আনন্দের ও কৌতূহলের নেশা–সেটা চাপিয়া রাখা অসম্ভব।
বাড়ী খুঁজিয়া বাহির করিয়া গদাধর খানিকক্ষণ বন্ধ-দরজার সামনে চুপ করিয়া দাঁড়াইলেন। কড়া নাড়িবেন কি নাড়িবেন না? চলিয়া যাওয়াই বোধহয় ভালো। একবার চলিয়া যাইতে গিয়া আবার ফিরিয়া আসিলেন এবং মরীয়া হইয়া সজোরে কড়া নাড়া দিলেন। প্রথম দু’একবার নাড়াতে কেহ সাড়া দিল না। মিনিট তিন-চার পরে ছোকরা চাকর আসিয়া দরজা খুলিয়া বলিল– কাকে চান আপনি?
গদাধর বলিলেন–মিস শোভারাণী মিত্র আছেন?
তাঁহার গলার স্বর কাঁপিয়া গেল।
চাকর বলিল–হ্যাঁ, আছেন। আপনার কি দরকার?
–আমার বিশেষ দরকার আছে, একবার দেখা করবো।
–কি নাম বলবো?
–বলো, গদাধরবাবু,–শচীনের সঙ্গে যিনি এসেছিলেন।
একটু পরে চাকর আবার ফিরিয়া আসিল, বলিল–চলুন ওপরে।
উপরের হলঘর পার হইয়া সেদিনের সেই কামরাতে চাকর তাঁহাকে লইয়া গেল। গদাধর গিয়া দেখিলেন, শোভা একটা ঈজিচেয়ারে শুইয়া কি বই পড়িতেছেন–পাশের টিপয়ের উপর পেয়ালা ও ডিস, বোধহয় এইমাত্র চা-পান শেষ করিয়াছেন।
গদাধর ঢুকিতেই শোভা ঈজিচেয়ার হইতে আধ-ওঠা অবস্থায় বলিল–আসুন গদাধরবাবু আসুন।
–আজ্ঞে, নমস্কার।
–নমস্কার। বসুন।
গদাধর বসিলেন। শোভারাণী পড়িতে লাগিল। কিছুক্ষণ কাহারো মুখে কথা নাই। আন্দাজ পাঁচ-মিনিট পরে শোভা হাতের বইখানি পাশের টিপয়ে রাখিতে গিয়া সেখানে চায়ের পেয়ালা দেখিয়া বিরক্তির সুরে বলিল–আঃ, এগুলো ফেলে রেখেচে এখনো! ওরে ও গোবিন্দ!
গদাধর আমতা-আমতা করিয়া বলিলেন–এই এলাম, শচীন একখানা চিঠি লিখে রেখে এসেছিল আমার বাড়ীতে। আপনার সঙ্গে দেখা করা দরকার নাকি, নির্মলের জন্যে–তাই।
এতক্ষণ পরে শোভার মুখে ঈষৎ হাসি দেখা দিল। সে বলিল– নির্মলবাবুর কথা ছেড়ে দিন। আপনি কি নির্মলবাবুর বিশেষ বন্ধু?
–আজ্ঞে, হ্যাঁ। আমি ওর বাল্যবন্ধু।
–নির্মলবাবুর অবস্থা ভালো নয় বোধহয়?
