অনঙ্গ রাগ করিল বটে, সঙ্গে সঙ্গে বিস্মিতও হইল। স্বামীর এমন ব্যবহার যে ঠিক নতুন, তাহা নহে। ঝগড়াও কতবার হইয়া গিয়াছে দু-জনের মধ্যে–কিন্তু সে ঝগড়ার মধ্যে সত্যিকার ঔদাসীন্য বা তিক্ততা ছিল না। আজ গদাধর ঝগড়ার কথা কিছু বলিতেছেন না–খুব সাধারণ কথাই, অথচ তার নারীচিত্ত যেন বুঝিল, ওই সামান্য সাধারণ অতি তুচ্ছ প্রত্যাখানের পিছনে অনেকখানি ঔদাসীন্য এবং তিক্ততা বিদ্যমান।
অনঙ্গ চুপ করিয়া শুইয়া পড়িল।
গদাধর কিন্তু শুইয়া শুইয়া ফিল্ম-অভিনেত্রী শোভারাণীর ভাবনা ভাবিতেছিলেন, এ কথা বলিলে তাঁহার উপর ঘোর অবিচার করা হইবে। সত্যিই তিনি এক-আধবার ছাড়া তার কথা ভাবেন নাই। মেয়েদের কথা বেশিক্ষণ ধরিয়া ভাবিবার মত মন গদাধরের নয়। তিনি ভাবিতেছিলেন অন্য কথা।
তিনি ভাবিতেছিলেন-জীবনটা তাঁর বৃথায় গেল! মেকি লইয়া কাটাইলেন, আসল নারী কি বস্তু, তাহা কোনো দিন চিনিলেন না! আর একটি ছবি অন্ধকারে আধ-ঘুমের মধ্যেও বারবার তাঁর চোখের সম্মুখে ভাসিয়া উঠিতেছিল…
নির্যাতিত সুন্দরী বধূ কমলা শ্বশুরবাড়ি হইতে বিতাড়িতা হইয়া থরথর-কম্পিত-দেহে পুকুরপাড়ে একদৃষ্টে স্বামীর ঘরের জানালার দিকে চাহিয়া আছে।…
.
০৪.
দিন-দুই পরে গদাধরকে দেশের আড়তের কাজে যাইতে হইবে, ভড়মহাশয়ও সঙ্গে যাইবেন। অনঙ্গ স্বামীকে বলিল, সেও সঙ্গে যাইবে। গদাধর বলিলেন, চলো, ভালো কথাই তো। ছেলেরাও যাবে–গিয়ে স্কুল কামাই হবে, উপায় নাই। তোমায় কিন্তু ছেলেদের নিয়ে একলা থাকতে হবে ক’দিন। পারবে তো?
–কেন, তুমি কোথায় থাকবে?
–আমি যাচ্ছি মোকামে পাটের সন্ধানে। নারানপুর, আশুগঞ্জ, ঝিকরগাছা–এসব জায়গা ঘুরতে হবে। পাঁচশো গাঁট সাদা পাট অর্ডার দিয়েচে ডগলাস জুট মিল। এদিকে মাল নেই বাজারে–যা আছে, দরে পোষাচ্ছে না, আমি দেখিগে যাই এখন মোকামে মোকামে ঘুরে। মাথায় এখন আগুন জ্বলছে, বাড়ী বসে থাকবার সময় আছে?
–বাড়ীতে মোটে আসবে না?
–সেই মঙ্গলবারের দিকে যদি আসা ঘটে–তার আগে নয়।
অনঙ্গ যাইতে চাহিল না। শুধু ছেলেদের লইয়া একা সে দেশের বাড়ীতে গিয়া কি করিবে? স্বামী থাকিলে ভালো লাগিত। স্বামীকে ছাড়িয়া থাকা তার অভ্যাস নাই–বিবাহ হইয়া পর্যন্ত কেহ কাহাকেও ছাড়িয়া থাকে নাই–একা থাকিতে অনঙ্গর মন হু-হু করে। ছেলেদের লইয়া মনের শূন্যতা পূর্ণ হইতে চায় না।
ভড়মহাশয়কে লইয়া গদাধর চলিয়া গেলেন। বিভিন্ন মোকামে ঘুরিয়া সমস্ত পাটের যোগাড় করিতে সারাদিন লাগিয়া গেল। ফিরিবার পথে একবার গ্রামের বাড়ীতে গেলেন। ব্যবসায়-সংক্রান্ত কিছু খাতাপত্র এখানে পূবের ঘরের আলমারীতে ছিল। ক-মাস দেশ-ছাড়া–ইহার মধ্যেই বাড়ীর উঠানে চিড়চিড়ে ও আমরুল গাছের জঙ্গল বাঁধিয়া গিয়াছে। ছাদের কার্নিসে বনমূলার চারা দেখা দিয়াছে, ঘরের মধ্যে চামচিৎকার দল বাসা বাঁধিয়াছে। গ্রামের একটি বোষ্টমের মেয়েকে মাঝে মাঝে ঘর-বাড়ী দেখিতে ও ঝাঁট দিয়া পরিষ্কার রাখিতে বলিয়াছিলেন–প্রতি মাসে দুটি করিয়া টাকা এজন্য সে পাইবে, এ ব্যবস্থা ছিল–অথচ দেখা যাইতেছে সে কিছুই করে নাই।
ভড়মহাশয় বলিলেন–সে বিন্দি বোষ্টুমি তো একবারও ইদিকে আসেনি বলে মনে হচ্চে বাবু, তাকে একবার ডেকে পাঠাই! এই ও-মাসেও তার টাকা মনিঅর্ডার করে পাঠানো হয়েচে। ধর্ম আর নেই দেখচি কলিকালে! পয়সা নিবি অথচ কাজ করবি নে!
সন্ধান লইয়া জানা গেল, বিন্দি বোষ্টুমি আজ কয়দিন হইল ভিন্-গাঁয়ে তাহার মেয়ের বাড়ী গিয়াচে। পাশের বাড়ীর সিধু ভট্টাচার্যির মেয়ে হৈম আসিয়া বলিল–মা ব’লে পাঠালেন, আপনি কি এখন চা খাবেন কাকা?
–এই যে হৈম মা, ভালো আছো? তোমাদের বাড়ীর সব ভালো? বাবা কোথায়?
–হ্যাঁ, সব একরকম ভালো। বাবা বাড়ী নেই। কাকীমাকে আনলেন না কেন?
–এ তো মা, আড়তের কাজে একদিনের জন্যে আসা। আজই এখুনি চলে যাবো।
–তা হবে না। মা বলেচে, আপনি আর ভড়-জ্যাঠা এবেলা আমাদের বাড়ী না খেয়ে যেতে পাবেন না। মা ভাত চড়িয়েছে। আমায় বলে দিলে–তোর কাকা চা খাবে কিনা জিগ্যেস করে আয়।
–তা যাও মা, নিয়ে এসোগে।
বৈকালে তিনটার ট্রেনে কলিকাতা যাওয়ার কথা–দুপুরে সিধু ভট্টাচার্যের বাড়ী দু’জনে খাইতে গেলেন। হৈমর মা হাসিমুখে বলিল–কি ঠাকুরপো, এখন শহুরে হয়ে পড়ে আমাদের ভুলে গেলে নাকি? বাড়ীটা যে জঙ্গল হয়ে গেল–ওর একটা ব্যবস্থা করো! অনঙ্গকে নিয়ে এলে না কেন?
–আনবো কি বৌদি, একবেলার জন্য আসা! তাও এখানে আসবো বলে আসিনি, ঝিকরগাছায় এসেছিলাম আড়তের কাজে। সে আসতে চেয়েছিল।
এবার একদিন নিয়ে এসো ঠাকুরপো। কতদিন দেখিনি, দেখতে ইচ্ছে করে।
–তার চেয়ে আপনি কেন চলুন না বৌদিদি, শহর ঘুরে আসবেন, দেখা-শোনাও হবে?
–আমাদের সে ভাগ্যি যদি হবে, তবে হাঁড়ি ঠেলবে কে দু’বেলা? ওকথা বাদ দ্যাও তুমি–যেমন অদেষ্ট করে এসেছিলাম, তেমনি তো হবে। তবে একবার কালীঘাটে গিয়ে মা’কে দর্শন করার ইচ্ছে আছে। বোশেখ মাসের দিকে, দেখি কতদূর কি হয়!
–আমায় বলবেন, আমি নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করবো, আমার ওখানে গিয়ে পায়ের ধুলো দেবেন।
বৈকালের ট্রেনে দুজনে কলিকাতায় ফিরিলেন। স্বামীকে দেখিয়া অনঙ্গ বড় খুশী হইল। কাছে বসিয়া-চা ও খাবার খাওয়াইতে খাওয়াইতে বলিল–উঃ, তুমি আসো না–কি কষ্ট গিয়েচে যে! গ্রামে হয়, তবুও এক কথা! এ ধরো, নিজের বাড়ী হলেও বিদেশ–এখানে মন ছটফট করে। হ্যাঁ ভালো কথা, তোমাকে একদিন শচীন ঠাকুরপো খুঁজতে এসেছিল–কি একখানা চিঠি দিয়ে গিয়েচে।
