এ দিকে পত্রলেখার মুখে চন্দ্রাপীড়ের আগমনবার্ত্তা শ্রবণ করিয়া কাদম্বরীর আনন্দের আর পরিসীমা রহিল না। প্রাণেশ্বরের সমাগমে এরূপ সমুৎসুক হইলেন যে, তাঁহার আগমন পর্য্যন্ত প্রতীক্ষা করিতে পারিলেন না। প্রিয়তমের প্রত্যুদ্গমন করিবার মানসে উজ্জ্বল বেশ ধারণ করিলেন। মণিময় অলঙ্কারে ভূষিত হইয়া গাত্রে অঙ্গরাগ লেপন পূর্ব্বক কণ্ঠে কুসুমমালা পরিলেন। সুসজ্জিত হইয়া কতিপয় পরিজনের সহিত বাটীর বহির্গত হইলেন। যাইতে যাইতে মদলেখাকে জিজ্ঞাসিলেন, মদলেখে! পত্রলেখার কথা কি সত্য, চন্দ্রাপীড় কি আসিয়াছেন? আমার ত বিশ্বাস হয় না। তাঁহার তৎকালীন নির্দ্দয় আচরণ স্মরণ করিলে তাঁহার আর কোন কথায় শ্রদ্ধা হয় না। আমার হৃদয় কম্পিত হইতেছে। পাছে তাঁহার আগমন বিষয়ে হতাশ হইয়া বিষণ্ণ চিত্তে ফিরিয়া আসিতে হয়। বলিতে বলিতে দক্ষিণ চক্ষু স্পন্দ হইল। ভাবিলেন এ আবার কি! বিধাতা কি এখনও পরিতৃপ্ত হন নাই? আবারও দুঃখে নিক্ষিপ্ত করিবেন? এইরূপ চিন্তা করিতে করিতে মহাশ্বেতার আশ্রমে উপস্থিত হইলেন। দেখিলেন, সকলেই বিষণ্ণ সকলের মুখেই দুঃখের চিহ্ন প্রকাশ পাইতেছে। অনন্তর ইতস্ততঃ দৃষ্টিপাত করিয়া পুষ্পশূন্য উদ্যানের ন্যায়, পল্লবশূন্য তরুর ন্যায়, বারিশূন্য সরোবরের ন্যায়, প্রাণশূন্য চন্দ্রাপীড়ের দেহ পতিত রহিয়াছে, দেখিতে পাইলেন। দেখিবামাত্র মূর্চ্ছাপন্ন হইয়া ভূতলে পড়িলেন, অমনি মদলেখা ধরিল। পত্রলেখা অচেতন হইয়া ভূতলে বিলুণ্ঠিত হইতে লাগিল। কাদম্বরী অনেক ক্ষণের পর চেতন হইয়া সস্পৃহ লোচনে চন্দ্রাপীড়ের মুখচন্দ্র দেখিলেন এবং ছিন্নমূলা লতার ন্যায় ভূতলে পতিত হইয়া শিরে করাঘাত করিতে লাগিলেন।
মদলেখা কাদম্বরীর চরণে পতিত হইয়া আর্ত্তস্বরে কহিল, ভর্ত্তৃদারিকে! আহা তোমা বই মদিরা ও চিত্ররথের কেহ নাই! তোমার হৃদয় বিদীর্ণ হইল, বোধ হইতেছে। প্রসন্ন হও, ধৈর্য্য, অবলম্বন কর। মদলেখার কথায় হাস্য করিয়া কহিলেন, অয়ি উন্মত্তে! ভয় কি? আমার হৃদয় পাষাণে নির্ম্মিত তাহা কি তুমি এখনও বুঝিতে পার নাই? ইহা বজ্র অপেক্ষাও কঠিন তাহা কি তুমি জানিতে পার নাই? যখন এই ভয়ঙ্কর ব্যাপার দেখিবামাত্র বিদীর্ণ হয় নাই, তখন আর বিদীর্ণ হইবার আশঙ্কা কি? হা এখনও জীবিত আছি! মরিবার এমন সময় আর কবে পাইব? সমুদায় দুঃখ ও সকল সন্তাপ শান্তি হইবার শুভ দিন উপস্থিত হইয়াছে। আহা আমার কি সৌভাগ্য! মরিবার সময় প্রাণেশ্বরের মুখকমল দেখিতে পাইলাম। জীবিতেশ্বরকে পুনর্ব্বার দেখিতে পাইব, এরূপ প্রত্যাশা ছিল না। কিন্তু বিধাতা অনুকূল হইয়া তাহাও ঘটাইয়া দিলেন। তবে আর বিলম্ব কেন? জীবিত ব্যক্তিরাই পিতা, মাতা, বন্ধু, বান্ধব, পরিজন ও সখীগণের অপেক্ষা করে। এখন আর তাঁহাদিগের অনুরোধ কি? এত দিনে সকল ক্লেশ দূর হইল, সকল যাতনা শান্তি হইল, সকল সন্তাপ নির্ব্বাণ হইল। যাহার নিমিত্ত লজ্জা, ধৈর্য্য, কুলমর্য্যাদা পরিত্যাগ করিয়াছি; বিনয়ে জলাঞ্জলি দিয়াছি; গুরুজনের অপেক্ষা পরিহার করিয়াছি; সখীদিগকে যৎপরোনাস্তি যাতনা দিয়াছি; প্রতিজ্ঞা লঙ্ঘন করিয়াছি; সে জীবন-সর্ব্বস্ব প্রাণেশ্বর প্রাণ ত্যাগ করিয়াছেন, আমি এখনও জীবিত আছি! সখি! তুমি আবার সেই ঘৃণাকর, লজ্জাকর প্রাণ রাখিতে অনুরোধ করিতেছ! এ সময় সুখে মরিবার সময়, তুমি বাধা দিও না।
যদি আমার প্রতি প্রিয়সখীর স্নেহ থাকে ও আমার প্রিয়কার্য্য করিতে ইচ্ছা হয়, তাহা হইলে শোকে পিতা মাতার যাহাতে দেহ অবসান না হয়, বাসভবন শূন্য দেখিয়া সখীজন ও পরিজনেরা যাহাতে দিগ্দিগন্তে প্রস্থান না করে, এরূপ করিও। অঙ্গনমধ্যবর্ত্তী সহকারপোতকের সহিত তৎপার্শ্ববর্ত্তিনী মাধবীলতার বিবাহ দিও। সাবধান, যেন মদারোপিত অশোকতরুর বাল পল্লব কেহ খণ্ডন না করে। শয়নের শিরোভাগে কামদেবের যে চিত্রপট আছে, তাহা গতমাত্র পাটিত করিও। কালিন্দী শারিকা ও পরিহাস শুককে বন্ধন হইতে মুক্ত করিয়া দিও। আমার প্রীতিপাত্র হরিণটীকে কোন তপোবনে রাখিয়া আসিও। নকুলীকে আপন অঙ্কে সর্ব্বদা রাখিও। ক্রীড়াপর্ব্বতে যে জীবঞ্জীবকমিথুন এবং আমার পাদসহচরী যে হংসশাবক আছে, তাহারা যাহাতে বিপন্ন না হয়, এরূপ তত্ত্বাবধান করিও। বনমানুষী কখন গৃহে বাস করে না, অতএব তাহাকে বনে ছাড়িয়া দিও। কোন তপস্বীকে ক্রীড়াপর্ব্বত প্রদান করিও। আমার এই অঙ্গের ভূষণ গ্রহণ কর, ইহা কোন দীন ব্রাহ্মণকে সমর্পণ করিও। বীণা ও অন্য সামগ্রী যাহা তোমার রুচি হয় আপনি রাখিও। আমি এক্ষণে বিদায় হইলাম, আইস, একবার জন্মের শোধ আলিঙ্গন ও কণ্ঠগ্রহণ করিয়া শরীর শীতল করি। চন্দ্রকিরণে, চন্দনরসে, শীতল জলে, সুশীতল শিলাতলে, কমলিনীপত্রে, কুমুদ কুবলয় ও শৈবালের শয্যায় আমার গাত্র দগ্ধ ও জর্জ্জরিত হইয়াছে। এক্ষণে প্রাণেশ্বরের কণ্ঠ গ্রহণ পূর্ব্বক উজ্জ্বলিত চিতানলে শরীর নির্ব্বাপিত করি। মদলেখাকে এই কথা বলিয়া মহাশ্বেতার কণ্ঠ ধারণ পূর্ব্বক কহিলেন, প্রিয়সখি! তুমি আশারূপ মৃগতৃষ্ণিকায় মোহিত হইয়া ক্ষণে ক্ষণে মরণাধিক যন্ত্রণা অনুভব করিয়া সুখে জীবন ধারণ করিতেছ। এই অভাগিনীর আবার সে আশাও নাই। এক্ষণে জগদীশ্বরের নিকট প্রার্থনা, যেন জন্মান্তরে প্রিয়সখীর দেখা পাই। এই বলিয়া চন্দ্রাপীড়ের চরণদ্বয় অঙ্কে ধারণ করিলেন। স্পর্শমাত্রে চন্দ্রাপীড়ের দেহ হইতে উজ্জ্বল জ্যোতিঃ উদ্গত হইল। জ্যোতির উজ্জ্বল আলোকে ক্ষণকাল সেই প্রদেশ কৌমুদীময় বোধ হইল।
