মহাশ্বেতা বসনাঞ্চলে নেত্রজল মোচন করিয়া কাতর স্বরে কহিলেন, মহাভাগ! যে নিষ্করুণা ও নির্লজ্জা পূর্ব্বে আপনাকে দারুণ শোকবৃত্তান্ত শ্রবণ করাইয়াছিল, সেই পাপীয়সী এক্ষণেও এক অপূর্ব্ব ঘটনা শ্রবণ করাইতে প্রস্তুত আছে। কেয়ূরকের মুখে আপনার উজ্জয়িনীগমনের সংবাদ শুনিয়া যৎপরোনাস্তি দুঃখিত হইলাম। চিত্ররথের মনোরথ, মদিরার বাঞ্ছা ও আপনার অভীষ্টসিদ্ধি না হওয়াতে সমধিক বৈরাগ্যোদয় হইল এবং কাদম্বরীর স্নেহপাশ ভেদ করিয়া তৎক্ষণাৎ আপন আশ্রমে আগমন করিলাম। একদা আশ্রমে বসিয়া আছি এমন সময়ে, রাজকুমারের সমবয়স্ক ও সদৃশাকৃতি সুকুমার এক ব্রাহ্মণকুমারকে দূর হইতে দেখিলাম। তিনি এরূপ অন্যমনস্ক যে তাঁহার আকার দেখিয়া বোধ হইল যেন, কোন প্রণষ্ট বস্তুর অন্বেষণ করিতে করিতে এইদিকে আসিতেছেন। ক্রমে নিকটবর্ত্তী হইয়া পরিচিতের ন্যায় আমাকে জ্ঞান করিয়া, নিমেষশূন্য নয়নে অনেক ক্ষণ আমার প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া রহিলেন। অনন্তর মৃদু স্বরে বলিলেন, সুন্দরি! এই ভূমণ্ডলে বয়স ও আকৃতির অবিসংবাদী কর্ম্ম করিয়া কেহ নিন্দাস্পদ হয় না। কিন্তু তুমি তাহার বিপরীত কর্ম্ম করিতেছ। তোমার নবীন বয়স, কোমল শরীর ও শিরীষকুসুমের ন্যায় সুকুমার অবয়ব। এ সময় তোমার তপস্যার সময় নয়। মৃণালিনীর তুহিনপাত যেরূপ সাংঘাতিক, তোমার পক্ষে তপস্যার আড়ম্বর সেইরূপ। তোমার মত নবযুবতীরা যদি ইন্দ্রিয়সুখে জলাঞ্জলি দিয়া তপস্যায় অনুরক্ত হয়, তাহা হইলে, মকরকেতুর মোহন শর কি কার্য্যকর হইল? শশধরের উদয়, কোকিলের কলরব, বসন্তকালের সমাগম ও বর্ষা ঋতুর আড়ম্বরের কি ফলোদয় হইল? বিকসিত কমল, কুসুমিত উপবন ও মলয়ানিল কি কর্ম্মে লাগিল?
দেব পুণ্ডরীকের সেই দারুণ ঘটনাবধি আমি সকল বিষয়েই নিরুৎসুক ছিলাম। ব্রাহ্মণকুমারের কথা অগ্নিশিখার ন্যায় আমার গাত্র দাহ করিতে লাগিল। তাহার কথা সমাপ্তি না হইতেই বিরক্ত হইয়া তথা হইতে উঠিয়া গেলাম। দেবতাদিগের অর্চ্চনার নিমিত্ত কুসুম তুলিতে লাগিলাম। তথা হইতে তরলিকাকে ডাকিয়া কহিলাম, ঐ দুর্ব্বৃত্ত ব্রাহ্মণকুমারের অসঙ্গত কথা ও কুৎসিত ভাবভঙ্গী দ্বারা বোধ হইতেছে, উহার অভিপ্রায় ভাল নয়। উহাকে বারণ কর, যেন আর এখানে না আইসে। যদি আইসে ভাল হইবে না। তরলিকা ভয়প্রদর্শন ও তর্জ্জন গর্জ্জন পূর্ব্বক বারণ করিয়া কহিল, তুমি এখান হইতে চলিয়া যাও, পুনর্ব্বার আর আসিও না। সেই হতভাগ্য সে দিন ফিরিয়া গেল বটে, কিন্তু আপন সঙ্কল্প এক বারে পরিত্যাগ করিল না। একদা নিশীথসময়ে চন্দ্রোদয়ে দিগ্বলয় জ্যোৎস্নাময় হইলে তরলিকা শিলাতলে শয়ন করিয়া নিদ্রায় অচেতন হইল। গ্রীষ্মের নিমিত্ত গুহার অভ্যন্তরে নিদ্রা না হওয়াতে আমি বহিঃস্থিত এক শিলাতলে অঙ্গ নিক্ষেপ করিয়া গগনোদিত সুধাংশুর প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া রহিলাম। মন্দ মন্দ সমীরণ গাত্রে সুধাবৃষ্টির ন্যায় বোধ হইতে লাগিল। সেই সময়ে দেব পুণ্ডরীকের বিস্ময়কর ব্যাপার স্মৃতিপথারূঢ় হইল। তাঁহার গুণ স্মরণ হওয়াতে খেদ করিয়া মনে মনে কহিলাম আমি কি হতভাগিনী! আমার দুর্ভাগ্যবশতঃ বুঝি দেববাক্যও মিথ্যা হইল! কই! প্রিয়তমের সহিত সমাগমের কোন উপায় দেখিতেছি না। কপিঞ্জল সেই গমন করিয়াছেন, অদ্যাপি প্রত্যাগত হইলেন না। এইরূপ নানাপ্রকার চিন্তা করিতেছি এমন সময়ে দূর হইতে পদসঞ্চারের শব্দ শুনিতে পাইলাম। যে দিকে শব্দ হইতেছিল, সেই দিকে দৃষ্টিপাত করিয়া জ্যোৎস্নার আলোকে দূর হইতে দেখিলাম, সেই ব্রাহ্মণকুমার উন্মত্তের ন্যায় দুই বাহু প্রসারিত করিয়া দৌড়িয়া আসিতেছে। তাহার সেইরূপ ভয়ঙ্কর আকার দেখিয়া সাতিশয় শঙ্কা জন্মিল। ভাবিলাম, কি পাপ! উন্মত্তটা আসিয়া সহসা যদি গাত্র স্পর্শ করে, তৎক্ষণাৎ এই অপবিত্র কলেবর পরিত্যাগ করিব। এত দিনে প্রাণেশ্বরের পুনর্দ্দর্শন প্রত্যাশার মূলোচ্ছেদ হইল। এত কাল বৃথা কষ্ট ভোগ করিলাম।
এইরূপ চিন্তা করিতেছি, এমন সময়ে নিকটে আসিয়া কহিল, চন্দ্রমুখি! ঐ দেখ কুসুমশরের প্রধান সহায় চন্দ্রমা আমাকে বধ করিতে আসিতেছে। এক্ষণে তোমার শরণাপন্ন হইলাম, যাহাতে রক্ষা পাই কর। তাহার সেই ঘৃণাকর কথা শুনিয়া আমার রোষানল প্রজ্বলিত হইয়া উঠিল। ক্রোধে কলেবর কাঁপিতে লাগিল। নিশ্বাসবায়ুর সহিত অগ্নিস্ফুলিঙ্গ বহির্গত হইতে লাগিল। ক্রোধে তর্জ্জন গর্জ্জন পূর্ব্বক ভর্ৎসনা করিয়া কহিলাম, রে দুরাত্মন্! এখনও তোর মস্তকে বজ্রাঘাত হইল না, এখনও তোর জিহ্বা ছিন্ন হইয়া পতিত হইল না, এখনও তোর শরীর শত শত খণ্ডে বিভক্ত হইয়া গেল না? বোধ হয় শুভাশুভ কর্ম্মের সাক্ষীভূত পঞ্চ মহাভূত দ্বারা তোর এই অপবিত্র অস্পৃশ্য দেহ নির্ম্মিত হয় নাই। তাহা হইলে, এত ক্ষণে তোর শরীর অনলে ভস্মীভূত, জলে আপ্লাবিত, রসাতলে নীত, বায়ুবেগে শতধা বিভক্ত ও গগনের সহিত মিলিত হইয়া যাইত। মনুষ্যদেহ আশ্রয় করিয়াছিস, কিন্তু তোকে তির্য্যগ্জাতির ন্যায় যথেচ্ছাচারী দেখিতেছি। তোর হিতাহিত জ্ঞান ও কার্য্যাকার্য্যবিবেক কিছুই নাই। তুই একান্ত তির্য্যগ্ধর্ম্মাক্রান্ত। তির্য্যগ্জাতিতেই তোর পতন হওয়া উচিত। অনন্তর সর্ব্বসাক্ষীভূত ভগবান্ চন্দ্রমার প্রতি নেত্রপাত করিয়া কৃতাঞ্জলিপুটে কহিলাম, ভগবন্! সর্ব্বসাক্ষিন্! দেব পুণ্ডরীকের দর্শনাবধি যদি অন্য পুরুষের চিন্তা না করিয়া থাকি, যদি কায়মনোবাক্যে তাঁহার প্রতি ভক্তি থাকে, যদি আমার অন্তঃকরণ পবিত্র ও নিষ্কলঙ্ক হয়, তাহা হইলে, আমার বচন সত্য হউক অর্থাৎ তির্য্যগ্জাতিতে এই পাপিষ্ঠের পতন হউক। আমার কথার অবসানে, জানি না, কি মদনজ্বরের প্রভাবে, কি আত্মদুষ্কর্ম্মের দুর্ব্বিপাকবশতঃ, কি আমার পাপের সামর্থ্যে, সেই ব্রাহ্মণকুমার অচেতন হইয়া ছিন্নমূল তরুর ন্যায় ভূতলে পতিত হইল। তাহার সঙ্গিগণ কাতর স্বরে হা হতোঽস্মি! বলিয়া শব্দ করিয়া উঠিল। তাহাদের মুখে শুনিলাম তিনি আপনার মিত্র। এই বলিয়া লজ্জায় অধোমুখী হইয়া মহাশ্বেতা রোদন করিতে লাগিলেন।
» ২.১৩ চন্দ্রাপীড় নয়ননিমীলন পূর্ব্বক
চন্দ্রাপীড় নয়ননিমীলন পূর্ব্বক মহাশ্বেতার কথা শুনিতেছিলেন; কথা সমাপ্ত হইলে কহিলেন, ভগবতি! এ জন্মে কাদম্বরীসমাগম ভাগ্যে ঘটিয়া উঠিল না। জন্মান্তরে যাহাতে সেই প্রফুল্ল মুখারবিন্দ দেখিতে পাই এরূপ যত্ন করিও। বলিতে বলিতে তাঁহার হৃদয় বিদীর্ণ হইল। যেমন শিলাতল হইতে ভূতলে পড়িতেছিলেন, অমনি তরলিকা মহাশ্বেতাকে ছাড়িয়া শশব্যস্তে হস্ত বাড়াইয়া ধরিল এবং কাতর স্বরে কহিল, ভর্ত্তৃদারিকে! দেখ দেখ কি সর্ব্বনাশ উপস্থিত! চন্দ্রাপীড় চৈতন্যশূন্য হইয়াছেন। মৃত দেহের ন্যায় গ্রীবা ভগ্ন হইয়া পড়িতেছে। নেত্র নিমীলিত হইয়াছে। নিশ্বাস বহিতেছে না। জীবনের কোন লক্ষণ নাই। একি দুর্দ্দৈব!—একি সর্ব্বনাশ!—হা দেব, কাদম্বরীপ্রাণবল্লভ! কাদম্বরীর কি দশা ঘটিল। এই বলিয়া তরলিকা মুক্ত কণ্ঠে রোদন করিয়া উঠিল। মহাশ্বেতা সসম্ভ্রমে চন্দ্রাপীড়ের প্রতি চক্ষু নিক্ষেপ করিলেন এবং সেইরূপ অবস্থা দেখিয়া হতবুদ্ধি ও চিত্রিতের ন্যায় নিশ্চেষ্ট হইয়া রহিলেন। আঃ—পাপীয়সি, দুষ্টতাপসি! কি করিলি, জগতের চন্দ্র হরণ করিলি, মহারাজ তারাপীড়ের সর্ব্বস্ব অপহৃত হইল, মহিষী বিলাসবতীর সর্ব্বনাশ উপস্থিত হইল, পৃথিবী অনাথা হইল। হায় এত দিনের পর উজ্জয়িনী শূন্য হইল! এক্ষণে প্রজারা কাহার মুখ নিরীক্ষণ করিবে, আমরা কাহার শরণাপন্ন হইব? এ কি বিনা মেঘে বজ্রাঘাত? চন্দ্রাপীড় কোথায়? মহারাজ এই কথা জিজ্ঞাসা করিলে আমরা কি উত্তর দিব। পরিচারকেরা হা হতোঽস্মি! বলিয়া উচ্চৈঃস্বরে এই রূপে বিলাপ করিয়া উঠিল। ইন্দ্রায়ুধ চন্দ্রাপীড়ের প্রতি দৃষ্টিপাত করিয়া রহিল। তাহার নয়নযুগল হইতে অজস্র অশ্রুবারি বিনির্গত হইতে লাগিল।
