মহাশ্বেতা এইরূপ পরিচয় দিতেছেন এমন সময়ে নিশানাথ গগনমণ্ডলে উদিত হইলেন। তারাগণ হীরকের ন্যায় উজ্জ্বল কিরণ বিস্তার করিল। বোধ হইল যেন, যামিনী গগনের অন্ধকার নিবারণের নিমিত্ত শত শত প্রদীপ প্রজ্বলিত করিলেন। মহাশ্বেতা শীতল শিলাতলে পল্লবের শয্যা পাতিয়া নিদ্রা গেলেন। চন্দ্রাপীড় মহাশ্বেতাকে নিদ্রিতা দেখিয়া আপনিও শয়ন করিলেন। এবং বৈশম্পায়ন কত চিন্তা করিতেছেন, পত্রলেখা কত ভাবিতেছে, অন্যান্য সমভিব্যাহারী লোক আমার অনাগমনে কত উদ্বিগ্ন হইয়াছে; এইরূপ চিন্তা করিতে করিতে নিদ্রাগত হইলেন।
প্রভাত হইলে মহাশ্বেতা গাত্রোত্থান পূর্ব্বক সন্ধ্যোপাসনাদি সমুদায় প্রাতঃকৃত্য সমাপন করিয়া জপ করিতে আরম্ভ করিলেন। চন্দ্রাপীড়ও প্রাভাতিক বিধি যথাবিধি সম্পাদন করিতেছেন এমন সময়ে পীনবাহু, বিশালবক্ষঃস্থল, করে তরবারিধারী, বলবান্, ষোড়শবর্ষবয়স্ক, কেয়ূরকনামা এক গন্ধর্ব্বদারকের সহিত তরলিকা তথায় উপস্থিত হইল। অপরিচিত চন্দ্রাপীড়ের অলৌকিক সৌন্দর্য্য দর্শনে বিস্মিত হইয়া, ইনি কে? কোথা হইতে আসিলেন? এইরূপ চিন্তা করিতে করিতে মহাশ্বেতার নিকটে গিয়া বসিল। কেয়ূরকও এক শিলাতলে উপবিষ্ট হইল। জপ সমাপ্ত হইলে মহাশ্বেতা তরলিকাকে জিজ্ঞাসিলেন, তরলিকে! প্রিয়সখী কাদম্বরীর কুশল? আমি যাহা বলিয়া দিয়াছিলাম তাহাতে ত সম্মত হইয়াছেন? কেমন, তাঁহার অভিপ্রায় কি বুঝিলে? তরলিকা কহিল, ভর্ত্তৃদারিকে! হাঁ কাদম্বরী কুশলে আছেন, আপনার উপদেশবাক্য শুনিয়া রোদন করিতে করিতে কত কথা কহিলেন। এই কেয়ূরকের মুখে সমুদায় শ্রবণ করুন।
কেয়ূরক বদ্ধাঞ্জলি হইয়া নিবেদন করিল, কাদম্বরী প্রণয় প্রদর্শন পূর্ব্বক সাদর সম্ভাষণে আপনাকে কহিলেন, “প্রিয়সখি! যাহা তরলিকার মুখে বলিয়া পাঠাইয়াছ উহা কি গুরুজনের অনুরোধক্রমে, অথবা আমার চিত্ত পরীক্ষার নিমিত্ত, কি অদ্যাপি গৃহে আছি বলিয়া তিরস্কার করিয়াছ? যদি মনের সহিত উহা বলিয়া থাক, তোমার অন্তঃকরণে কোন অভিসন্ধি আছে, সন্দেহ নাই। এই অধীনকে একবারে পরিত্যাগ করিবে ইহা এত দিন স্বপ্নেও জানি নাই। আমার হৃদয় তোমার প্রতি যেরূপ অনুরক্ত তাহা জানিয়াও এইরূপ নিষ্ঠুর বাক্য বলিতে তোমার কিছুমাত্র লজ্জা হইল না? আমি জানিতাম তুমি স্বভাবতঃ মধুরভাষিণী ও প্রিয়বাদিনী। এক্ষণে এরূপ পরুষ ও অপ্রিয় কথা কহিতে কোথায় শিখিলে? আপাততঃ মধুররূপে প্রতীয়মান, কিন্তু অবসানবিরস কর্ম্মে কোন্ ব্যক্তির সহসা প্রবৃত্তি জন্মে? আমি ত প্রিয়সখীর দুঃখে নিতান্ত দুঃখিনী হইয়াছি। এ সময়ে কি রূপে অকিঞ্চিৎকর বিবাহের আড়ম্বর করিয়া আমোদ প্রমোদ করিব? এ সময় আমোদের সময় নয় বলিয়াই সেইরূপ প্রতিজ্ঞা করিয়াছি। প্রিয়সখীর দুঃখে দুঃখিত অন্তঃকরণে সুখের আশা কি? সম্ভোগেরই বা স্পৃহা কি? মানুষের ত কথাই নাই, পশুপক্ষীরাও সহচরের দুঃখে দুঃখ প্রকাশ করিয়া থাকে। দিনকরের অস্তগমনে নলিনী মুকুলিত হইলে তৎসহবাসিনী চক্রবাকীও প্রিয়সমাগম পরিত্যাগ পূর্ব্বক সারা রাত্রি চীৎকার করিয়া দুঃখ প্রকাশ করে। যাহার প্রিয়সখী বনবাসিনী হইয়া দিনযামিনী সাতিশয় ক্লেশে কাল যাপন করিতেছে, সে, সুখের অভিলাষিণী হইলে লোকে কি বলিবে? আমি তোমার নিমিত্ত গুরুবচন অতিক্রম, লজ্জা ভয় পরিত্যাগ ও কুলকন্যাবিরুদ্ধ সাহস অবলম্বন পূর্ব্বক, দুস্তর প্রতিজ্ঞা অবলম্বন করিয়াছি; এক্ষণে যাহাতে প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ না হয় ও লোকের নিকট লজ্জা না পাই, এরূপ করিও।” এই বলিয়া কেয়ূরক ক্ষান্ত হইল।
কেয়ূরকের কথা শুনিয়া মহাশ্বেতা মনে মনে ক্ষণকাল অনুধ্যান করিয়া কহিলেন, কেয়ূরক! তুমি বিদায় হও, আমি স্বয়ং কাদম্বরীর নিকট যাইতেছি। কেয়ূরক প্রস্থান করিলে চন্দ্রাপীড়কে কহিলেন, রাজকুমার! হেমকূট অতি রমণীয় স্থান, চিত্ররথের রাজধানী অতি আশ্চর্য্য, কাদম্বরী অতি মহানুভবা। যদি দেখিতে কৌতুক হয় ও আর কোন কার্য্য না থাকে, আমার সঙ্গে চলুন। অদ্য তথায় বিশ্রাম করিয়া কল্য প্রত্যাগমন করিবেন। আপনার সহিত সাক্ষাৎ হইয়া অবধি আমার দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয় অনেক সুস্থ হইয়াছে। আপনার নিকট স্ববৃত্তান্ত বর্ণন করিয়া আমার শোকের অনেক হ্রাস হইয়াছে। আপনি অকারণমিত্র। আপনার সঙ্গ পরিত্যাগ করিতে ইচ্ছা হয় না। সাধুসমাগমে অতি দুঃখিত চিত্তও আহ্লাদিত হয়, এ কথা মিথ্যা নহে। আপনার গুণে ও সৌজন্যে অতিশয় বশীভূত হইয়াছি, যতক্ষণ দেখিতে পাই তাহাই ভাল। চন্দ্রাপীড় কহিলেন, ভগবতি! দর্শন অবধি আপনাকে শরীর প্রাণ সমর্পণ করিয়াছি। এক্ষণে যে দিকে লইয়া যাইবেন, সেই দিকে যাইব ও যাহা আদেশ করিবেন তাহাতেই সম্মত আছি। অনন্তর মহাশ্বেতা সমভিব্যাহারে গন্ধর্ব্বনগরে চলিলেন।
নগরে উত্তীর্ণ হইয়া রাজভবন অতিক্রম করিয়া ক্রমে কাদম্বরীর ভবনের দ্বারদেশে উপস্থিত হইলেন। প্রতিহারীরা পথ দেখাইয়া অগ্রে অগ্রে চলিল। রাজকুমার অসংখ্য সুন্দরী-কুমারী-পরিবেষ্টিত অন্তঃপুরের অভ্যন্তরে প্রবেশ করিলেন। কুমারীগণের শরীরপ্রভায় অন্তঃপুর সর্ব্বদা চিত্রিতময় বোধ হয়। তাহারাও বিনা অলঙ্কারেও সর্ব্বদা অলঙ্কৃত। তাহাদিগের আকর্ণবিশ্রান্ত লোচনই কর্ণোৎপল, হসিতচ্ছবিই অঙ্গরাগ, নিশ্বাসই সুগন্ধি বিলেপন, অধরদ্যুতিই কুঙ্কুমলেপন, ভুজলতাই চম্পকমালা, করতলই লীলাকমল এবং অঙ্গুলিরাগই অলক্তকরস। রাজকুমার কুমারীগণের মনোহর শরীরকান্তি দেখিয়া বিস্ময়াপন্ন হইলেন। তাহাদিগের তানলয়বিশুদ্ধ বেণুবীণাঝঙ্কারমিলিত মধুর সঙ্গীত শ্রবণে তাঁহার অন্তঃকরণ আনন্দে পুলকিত হইল। ক্রমে কাদম্বরীর বাসগৃহের নিকটবর্ত্তী হইলেন। গৃহের অভ্যন্তরে প্রবেশিয়া দেখিলেন, কন্যাজনেরা নানা বাদ্যযন্ত্র লইয়া চতুর্দ্দিকে বেষ্টন করিয়া বসিয়াছে; মধ্যে সুচারু পর্য্যঙ্কে কাদম্বরী শয়ন করিয়া নিকটবর্ত্তী কেয়ূরককে মহাশ্বেতার বৃত্তান্ত ও মহাশ্বেতার আশ্রমে সমাগত অপরিচিত পুরুষের নাম, বয়স, বংশ ও তথায় আগমনহেতু সমুদায় জিজ্ঞাসা করিতেছেন। চামরধারিণীরা অনবরত চামর বীজন করিতেছে।
