পরদিন পিতা মাতা এই সকল বৃত্তান্ত অবগত হইয়া পরিজন ও বন্ধুজনের সহিত এই স্থানে আইসেন ও নানাপ্রকার সান্ত্বনাবাক্যে প্রবোধ দিয়া বাটী গমন করিতে অনুরোধ করেন। কিন্তু যখন দেখিলেন, কোন প্রকারে অবলম্বিত অধ্যবসায় হইতে পরাঙ্মুখ হইলাম না, তখন আমার গমনবিষয়ে নিতান্ত নিরাশ হইয়াও অপত্যস্নেহের গাঢ়বন্ধনবশতঃ অনেক দিন পর্য্যন্ত এই স্থানে অবস্থিতি করিলেন ও প্রতিদিন নানাপ্রকার বুঝাইতে লাগিলেন; পরিশেষে হতাশ হইয়া দুঃখিত চিত্তে বাটী গমন করিলেন। তদবধি কেবল অশ্রুমোচন দ্বারা প্রিয়তমের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রদর্শন করিতেছি। জপ করিবার ছলে তাঁহার গুণ গণনা করিয়া থাকি। বহুবিধ নিয়ম দ্বারা পরাভূত এই দগ্ধ শরীর পোষণ করিতেছি। এই গিরিগুহায় বাস করি, ঐ সরোবরে ত্রিসন্ধ্যা স্নান করি, প্রতিদিন এই দেবাদিদেব মহাদেব অর্চ্চনা করিয়া থাকি। তরলিকা ভিন্ন আর কেহ নিকটে নাই। আমার ন্যায় পাপকারিণী ও হতভাগিনী এই ধরণীতলে কাহাকেও দেখিতে পাই না। পাপকর্ম্মের একশেষ করিয়াছি, ব্রহ্মহত্যারও ভয় রাখি নাই। আমাকে দেখিলে ও আমার সহিত আলাপ করিলেও দুরদৃষ্ট জন্মে। এই কথা বলিয়া পাণ্ডুবর্ণ বল্কল দ্বারা মুখ আচ্ছাদন করিয়া বাষ্পাকুল নয়নে রোদন করিতে আরম্ভ করিলেন। বোধ হইল যেন, শরৎকালীন শুভ্র মেঘ চন্দ্রমাকে আবৃত করিল ও বৃষ্টি হইতে লাগিল।
মহাশ্বেতার বিনয়, দাক্ষিণ্য, সুশীলতা ও মহানুভাবতায় মোহিত হইয়া চন্দ্রাপীড় তাঁহাকে প্রথমেই স্ত্রীরত্ন বলিয়া জ্ঞান করিয়াছিলেন। তাহাতে আবার আদ্যোপান্ত আত্মবৃত্তান্ত বর্ণনা দ্বারা সরলতা প্রকাশ ও পতিব্রতাধর্ম্মের চমৎকার দৃষ্টান্ত প্রদর্শন করাতে বিধাতার অলৌকিক সৃষ্টি বলিয়া বোধ হইল ও সাতিশয় বিস্ময় জন্মিল। তখন প্রীত ও প্রসন্ন চিত্তে কহিলেন, যাহারা স্নেহের উপযুক্ত কর্ম্মের অনুষ্ঠানে অসমর্থ হইয়া কেবল অশ্রুপাত দ্বারা লঘুতা প্রকাশ করে তাহারাই অকৃতজ্ঞ। আপনি অকৃত্রিম প্রণয় ও অকপট অনুরাগের উপযুক্ত কর্ম্ম করিয়াও কি জন্য আপনাকে অকৃতজ্ঞ ও ক্ষুদ্র বোধ করিতেছেন? বিশুদ্ধ প্রেম প্রকাশের নবীন পথ উদ্ভাবন পূর্ব্বক অপরিচিতের ন্যায় আজন্মপরিচিত বান্ধবজনের পরিত্যাগ এবং অকিঞ্চিৎকর পদার্থের ন্যায় সাংসারিক সুখে জলাঞ্জলি প্রদান করিয়াছেন; ব্রহ্মচর্য্য অবলম্বন পূর্ব্বক তপস্বিনীবেশে জগদীশ্বরের আরাধনা করিতেছেন; অনন্যমনা হইয়া প্রাণেশ্বরের সহিত সমাগমের উপায় চিন্তা করিতেছেন। এতদ্ব্যতিরিক্ত বিশুদ্ধ প্রণয় পরিশোধের আর পন্থা কি?
শাস্ত্রকারেরা অনুমরণকে যে কৃতজ্ঞতা প্রকাশের প্রণালী বলিয়া নির্দ্দেশ করেন উহা ব্যামোহমাত্র। মূঢ় ব্যক্তিরাই মোহবশতঃ ঐ পথে পদার্পণ করে। ভর্ত্তা উপরত হইলে তাঁহার অনুগমন করা মূর্খতা প্রকাশ করা মাত্র উহাতে কিছুই উপকার নাই। না উহা মৃত ব্যক্তির পুনর্জীবনের উপায়, না তাঁহার শুভলোকপ্রাপ্তির হেতু, না পরস্পর দর্শন ও সমাগমের সাধন। জীবগণ নিজ নিজ ধর্ম্মানুসারে শুভাশুভ লোক প্রাপ্ত হয়। সুতরাং অনুমরণ দ্বারা যে পরস্পর সাক্ষাৎ হইবে তাহার নিশ্চয় কি? লাভ এই, অনুমৃত ব্যক্তিকে আত্মহত্যাজন্য মহাপাপে লিপ্ত হইয়া ঘোর নরকে চিরকাল বাস করিতে হয়। বরং জীবিত থাকিলে সৎকর্ম্ম দ্বারা স্বীয় উপকার ও শ্রাদ্ধতর্পণাদি দ্বারা উপরতের উপকার করিতে পারা যায়, মরিলে কাহার কিছুই উপকার নাই। অনুমরণ পতিব্রতার লক্ষণ নয়। দেখ, রতি, পতির মরণের পর ত্রিলোচনের নয়নানলে আত্মার আহুতি প্রদান করেন নাই। শূরসেন রাজার দুহিতা পৃথা, পাণ্ডুর মরণোত্তর অনুমৃতা হন নাই। বিরাটরাজের কন্যা উত্তরা, অভিমন্যুর মরণে আপন প্রাণ পরিত্যাগ করেন নাই। ধৃতরাষ্ট্রের কন্যা দুঃশলা, জয়দ্রথের মরণোত্তর অর্জ্জুনের শরানলে আপনারে আহুতি দেন নাই। কিন্তু উঁহারা সকলেই পতিব্রতা বলিয়া জগতে বিখ্যাত। এইরূপ শত শত পতিপ্রাণা যুবতী পতির মরণেও জীবিত ছিলেন শুনিতে পাওয়া যায়। তাঁহারাই যথার্থ বুদ্ধিমতী ও যথার্থ ধর্ম্মের গতি বুঝিতে পারিয়াছিলেন। বিবেচনা করিলে স্বার্থপর লোকেরাই দুঃসহ বিরহযন্ত্রণা সহ্য করিতে না পারিয়া অনুমরণ অবলম্বন করে। কেহ বা অহঙ্কার প্রকাশের নিমিত্ত এই পথে প্রবৃত্ত হয়। ফলতঃ ধর্ম্মবুদ্ধিতে প্রায় কেহ অনুমৃত হয় না। আপনি মহাপুরুষ কর্ত্তৃক আশ্বাসিত হইয়াছেন, তিনি যে মিথ্যা কথা দ্বারা প্রতারণা করিবেন এমন বোধ হয় না। দৈব অনুকূল হইয়া আপনার প্রতি অনুকম্পা প্রকাশ করিবেন, সন্দেহ নাই। মরিলে পুনর্ব্বার জীবিত হয়, এ কথা নিতান্ত অসম্ভাবিত নহে। পূর্ব্ব কালে গন্ধর্ব্বরাজ বিশ্বাবসুর ঔরসে মেনকার গর্ভে প্রমদ্বরা নামে এক কন্যা জন্মে। ঐ কন্যা আশীবিষদষ্ট ও বিষবেগে উপরত হইয়াছিল; কিন্তু রুরুনামক ঋষিকুমার আপন পরমায়ুর অর্দ্ধেক প্রদান করিয়া উহাকে পুনর্জীবিত করেন। অভিমন্যুর তনয় পরীক্ষিৎ অশ্বত্থামার অস্ত্র দ্বারা আহত ও প্রাণবিযুক্ত হইয়াও পরমকারুণিক বাসুদেবের অনুকম্পায় পুনর্ব্বার জীবিত হন। জগদীশ্বর সানুগ্রহ ও অনুকূল হইলে কিছুই অসাধ্য থাকে না। চিন্তা করিবেন না, অচিরাৎ অভীষ্টসিদ্ধ হইবেক। সংসারে পদার্পণ করিলেই পদে পদে বিপদ আছে। কিছুই স্থায়ী নহে। বিশেষতঃ দগ্ধ বিধি অকৃত্রিম প্রণয় অধিক কাল দেখিতে পারেন না। দেখিলেই অমনি যেন ঈর্ষান্বিত হন ও তৎক্ষণাৎ ভঙ্গের চেষ্টা পান। এক্ষণে ধৈর্য্য অবলম্বন করুন; অনিন্দনীয় আত্মাকে আর মিথ্যা তিরস্কার করিবেন না। এইরূপ নানাবিধ সান্ত্বনাবাক্যে মহাশ্বেতাকে ক্ষান্ত করিলেন। মনে মনে মহাশ্বেতার এই আশ্চর্য্য ঘটনাই চিন্তা করিতে লাগিলেন। ক্ষণ কাল পরে পুনর্ব্বার জিজ্ঞাসা করিলেন, ভদ্রে! আপনার সমভিব্যাহারিণী ও দুঃখের অংশভাগিনী পরিচারিকা তরলিকা এক্ষণে কোথায়?
২.০৮ মহাশ্বেতা কহিলেন
মহাশ্বেতা কহিলেন, মহাভাগ! অপ্সরাদিগের এক কুল অমৃত হইতে সমুদ্ভূত হয় আপনাকে কহিয়াছি। সেই কুলে মদিরা নামে এক কন্যা জন্মে। গন্ধর্ব্বের অধিপতি চিত্ররথ তাঁহার পাণিগ্রহণ করেন এবং তাঁহার গুণে বশীভূত হইয়া ছত্র চামর প্রভৃতি প্রদান পূর্ব্বক তাঁহাকে মহিষী করেন। কালক্রমে মহিষী গর্ভবতী হইয়া যথাকালে এক কন্যা প্রসব করেন। কন্যার নাম কাদম্বরী। কাদম্বরী নির্ম্মলা শশিকলার ন্যায় ক্রমে ক্রমে বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইয়া এরূপ রূপবতী ও গুণবতী হইলেন যে, সকলেই তাঁহাকে দেখিলে আনন্দিত হইত ও অত্যন্ত ভাল বাসিত। শৈশবাবধি একত্র শয়ন, একত্র অশন, একত্র অবস্থান প্রযুক্ত আমি কাদম্বরীর প্রণয়পাত্র ও স্নেহপাত্র হইলাম। সর্ব্বদা একত্র ক্রীড়া কৌতুক করিতাম, এক শিক্ষকের নিকট নৃত্য, গীত, বাদ্য, বিদ্যা শিখিতাম, এক শরীরের মত দুই জনে একত্র থাকিতাম। ক্রমে এরূপ অকৃত্রিম সৌহার্দ্দ জন্মিল যে, আমি তাঁহাকে সহোদরার ন্যায় জ্ঞান করিতাম; তিনিও আমাকে আপন হৃদয়ের ন্যায় ভাবিতেন। এক্ষণে আমার এই দুরবস্থা শুনিয়া প্রতিজ্ঞা করিলেন, যাবৎ মহাশ্বেতা এই অবস্থায় থাকিবেন তাবৎ আমি বিবাহ করিব না। যদি পিতা মাতা অথবা বন্ধুবর্গ বলপূর্ব্বক আমার বিবাহ দেন তাহা হইলে অনশনে, হুতাশনে অথবা উদ্বন্ধনে প্রাণ ত্যাগ করিব। গন্ধর্ব্বরাজ চিত্ররথ ও মহাদেবী মদিরা পরম্পরায় কন্যার এই প্রতিজ্ঞা শুনিয়া অতিশয় দুঃখিত হইয়াছেন। কিন্তু এক অপত্য, অত্যন্ত ভাল বাসেন, সুতরাং তাঁহার প্রতিজ্ঞার বিরুদ্ধে কোন কথা উত্থাপন করিতে পারেন নাই। যুক্তি করিয়া অদ্য প্রভাতে ক্ষীরোদনামা এক কঞ্চুকীকে আমার নিকট পাঠাইয়াছিলেন। তাহার দ্বারা আমাকে বলিয়া পাঠান, “বৎসে মহাশ্বেতে! তোমা ব্যতিরেকে কেহ কাদম্বরীকে সান্ত্বনা করিতে সমর্থ নয়। সে এইরূপ প্রতিজ্ঞা করিয়াছে; এক্ষণে যাহা কর্ত্তব্য হয় কর।” আমি গুরুজনের গৌরবে ও মিত্রতার অনুরোধে ক্ষীরোদের সহিত তরলিকাকে কাদম্বরীর নিকট পাঠাইয়াছি। বলিয়া দিয়াছি, সখি! একেই আমি মরিয়া আছি, আবার কেন যন্ত্রণা বাড়াও? তোমার প্রতিজ্ঞা শুনিয়া অত্যন্ত দুঃখিত হইলাম। আমার জীবিত থাকা যদি অভিপ্রেত হয়, তাহা হইলে, গুরুজনের অনুরোধ কদাচ উল্লঙ্ঘন করিও না। তরলিকাও তথায় গেল; আপনিও এখানে আসিয়া উপস্থিত হইলেন।
