ঘনাদার রণংদেহি চাউনিটা সোজা এবার গৌরের দিকে! গৌর কি কোনও জবাব দেবে?
সে মুখ খোলার সুযোগ পাওয়ার আগেই আমরা সমস্বরে ঘনাদাকে সমর্থন করে বললাম, না, না। যা বললেন তারপর কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ ক-দিনে শেষ কেউ প্রশ্ন করে দেখুক দিকি?
হারের খেসারত হিসেবে গৌর প্রস্তাব যা করল তাতে আমরা তো বটেই, ঘনাদাও বুঝি একটু তাজ্জব।
গৌর বেশ একটু যেন মুগ্ধস্বরেই বলল, ভাবছি কুরুক্ষেত্র সম্বন্ধে এমন একটা যুগান্তকারী গণনার সম্মানে সত্যিকার স্পেশাল কিছু আজ করা দরকার। এই যেমন বড় রাস্তা মোড়ের দোকানের চিকেন প্যাটিস আর ফিশরোল হলে কেমন হয়?
এ প্রস্তাব স্বয়ং গৌরের! আমাদের কারও মুখে খানিকক্ষণ আর কথা নেই। ঘনাদারও না।
ঘনাদা ফিরলেন
ফিরে এলেন ঘনাদা?
তা ফিরতে গেলে তো যেতে হয় আগে। তিনি গেলেন কখন যে ফিরে আসবেন?
যাবার মধ্যে বাহাত্তর নম্বরে এসে অধিষ্ঠিত হবার পর একবারই এ আস্তানা ছেড়েছিলেন!
সেই বাপি দত্তের সময়ে।
বাপি দত্ত মানে যে বিগড়ি হাঁসে অরুচি ধরানো সেই বুনো বাপি দত্ত, তা নিশ্চয় আর বলতে হবে না। কোটি কুবেরের ধনের সমান এক আশ্চর্য ভারী জলের হ্রদের ভৌগোলিক ঠিকানা লেখা চিরকুট যার মধ্যে ভরা, ঘনাদার সেই নস্যির কৌটো উদ্ধার করে দুনিয়ার সব আমিরের ওপর টেক্কা দেবার আশায় যখন সে দিনের পর দিন একরকম বিগড়ি হাঁসযজ্ঞ চালিয়ে যাবে তখন একদিন হঠাৎ সত্যিই এক বিগড়ি হাঁসের পেটে এক খুদে কৌটো পেয়ে সমস্ত বাহাত্তর নম্বর প্রথমে একেবারে থ, তারপর আনন্দে আটখানা হয়ে ঘটা করে কৌটো খোলবার অনুষ্ঠান দেখাবার জন্য ঘনাদাকে প্রায় টেনে হিঁচড়ে ডেকে এনেছিল বাপি দত্ত নিজে।
সে কৌটো খোলর পর বাপি দত্তের অবস্থা দেখবার জন্য ঘনাদা আর দাঁড়াননি। কৌটো খুলে ভেতরকার চিরকুটটা বার করে গৌর না শিশির কে একজন তা পড়ে দেবার সঙ্গে সঙ্গে ঘনাদাকে সেখানে দেখা যায়নি। দেখা যায়নি বাহাত্তর নম্বরেই আর দিনের পর দিন, হপ্তার পর হপ্তা, মাসের পর মাস।
বাপি দত্তও সেইদিন বিকাল থেকেই সেই যে বাহাত্তর ছেড়ে দিল আর আসেনি।
কী ছিল এমন মোক্ষম মারাত্মক ওই নস্যির কৌটোয় ভরা চিরকুটে?
লেখা ছিল দুটি মাত্র শব্দ—ঘনাদার গুল।
বাপি দত্ত না ফিরলেও ঘনাদা একদিন আবার ফিরেছিলেন আচমকা অপ্রত্যাশিতভাবে।
ফিরেছিলেন সমস্ত ঘনাদা বৃত্তান্তের মধ্যে মাত্র একবারের জন্য দেখা দেওয়া সেই দাদা উপাখ্যানে। তাঁকে নিয়ে দাদার উপহাসের গল্পের যেন জীবন্ত জবাব হয়ে।
ফিরে আসাটা যেমন নাটকীয়, আগের বারের যাওয়ার মতো সামান্যই হোক, তেমনই একটু হুশিয়ারির ভূমিকা ছিল।
বিগড়ি হাঁসের পেটে নস্যির কৌটোয় কুবেরের হতাশাখানার হদিস পাওয়ার আশা নেহাত আজগুবি কল্পনার ফাঁপা ফানুস হলেও তা কখন ফাটে বলে মনের মধ্যে কৌতূহলের একটু সুড়সুড়ি অন্তত ছিল।
এবার কিন্তু একেবারে যেন বিনামেঘে বজ্রাঘাত।
ছুটির দিন দুপুরবেলায় একটু এলাহি খাওয়া-দাওয়ার পর সন্ধ্যায় জমাটি আড্ডার জন্য তৈরি হতে যে যার ঘরে একটু বিশ্রাম করে নীচে যাবার আগে দু-দশ মিনিটের চুটকি আলাপের ফাঁকে যোলো আনা খোশমেজাজে হাজির দেখে গেছি, দোতলার বারান্দা থেকে ন্যাড়া ছাদের তাঁর টঙের ঘরে যাবার একানে সিঁড়ি দিয়ে ওঠবার আগে যিনি রাত্রের মেনুটা শিশিরের কাছে জেনে নিয়ে প্রুফ দেখার মতো করে তাতে ক-টা কমা-সেমিকোলন বদল করেছেন মাত্র সেই বাহাত্তর নম্বরের একমেবাদ্বিতীয় তিনি হঠাৎ সন্ধ্যা হতে না হতেই একেবারে নিরুদ্দেশ!
আর সে খবর আমাদের জানতে হল ঘনাদার নতুন শখ বা নেশা করা, জরদা-তবক-জড়ানো বেনারসি খিলি সাজিয়ে নিয়ে যাবার জন্য সারা চৌরাস্তা যার খোশবুতে ভুরভুর করে, মোড়ের সেই হিন্দি বাংলা ইংরেজিতে সাইনবোর্ড মারা পানের দোকানে অপেক্ষা করতে করতে দোকানেরই রেডিয়োয় ঘোষণা শুনে?
এমনিতে রাস্তাঘাটের বেতারের পরিবেশন আর পাঁচটা শহুরে হই-হট্টগোলের থেকে আলাদা হয়ে কানে বড় একটা যায় না।
এ বেতার-ঘঘাষণাটা কিন্তু গেল! এবং গেল কর্ণকুহর যেন বিদীর্ণ করে একেবারে মরমে।
বেতার-ঘোষণাটা হচ্ছিল নিরুদ্দিষ্টের সংবাদের। এবং ভাষাটা ছিল ইংরাজি।
সেই ইংরাজি ঘোষণায় হঠাৎ বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেন শুনেই চমকে উঠেছিলাম। তার পরে যা শুনলাম তাতে শুধু হতভম্ব নয়, সমস্ত শরীর যেন হঠাৎ জমে ঠাণ্ডা পাথর।
যা শুনেছি তাতে নিজেদের কানগুলোকেই বিশ্বাস করতে পারছি না। কী বলছে কী বেতার-বিজ্ঞপ্তি? গতকাল বিকাল থেকে বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেন থেকে নবীন ও প্রবীণ প্রাজ্ঞ মহলে সুপরিচিত শ্রীঘনশ্যাম দাস মহাশয় নাকি নিরুদ্দেশ।
নিরুদ্দেশ? ঘনশ্যাম দাস মানে ঘনাদা?
কী বলছে কী বেতারের প্রলাপ? বলে নিজেদের যখন প্রশ্ন করছি তখন নিরুদ্দিষ্টের সন্ধান পেলে খবর জানাবার ঠিকানা হিসাবে বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনের ঠিকানাটাই আবার উচ্চারিত হয়ে ঘোষণাটি শেষ হল।
না, গভীর নিদ্রার ঘোরে দুঃস্বপ্ন কিছু দেখছি না আমরা। বড় রাস্তার মোড়ে সুবিখ্যাত বেনারসি পানের দোকানের সামনে বহাল তবিয়তে যথার্থই উপস্থিত আছি।
রাস্তা দিয়ে ট্রাম বাস লরি গাড়ি রিকশ ও পদাতিকের ভিড় যথারীতি প্রবাহিত হচ্ছে। অথচ—অথচ-বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেন থেকে নবীন প্রবীণ দুই মহলে ঘনাদা আর ঘনশ্যাম দাস নামে এক ডাকে সবাই যাঁকে চেনে সেই তিনিই নাকি নিরুদ্দেশ!
