আঠারো দিনের হয় মানে! গৌরের সঙ্গে আমরাও এবার অবাক!
গৌর ঝাঁঝালো গলায় বলেছে, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ যে মোট আঠারো দিনে শেষ হয়েছিল এ কথা তো পাঁচ বছরের ছেলেও জানে! সঞ্জয়ের কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের বর্ণনা পড়লে কারও তা জানার বাকি থাকে না।
ও, সঞ্জয়ের যুদ্ধ বৃত্তান্ত? ঘনাদার গলায় যেন চাপা টিটকিরি—সঞ্জয় বুঝি আঠারো দিনেরই কথা বলেছে?
হ্যাঁ, বলেছেই তো!—গৌর যেন ঘনাদার অজ্ঞতাকে লজ্জা দেবার সুরে জানাল——তাও জানেন না?
হ্যাঁ, জানি একরকম? ঘনাদা বিদ্রুপের সুরটা একটু চড়িয়েই এবার বললেন, সঞ্জয় যা বলেছে তার ওপর আর কথা নেই।
নেই তো! স্বয়ং ব্যাসদেব ধৃতরাষ্ট্রের কাছে কী বলে সঞ্জয়কে কাজে লাগিয়ে দিয়েছিলেন, জানেন!—গৌর যেন কিস্তিমাত-এর চাল চেলে ঘনাদাকে তার কণ্ঠস্থ ছত্রগুলো শুনিয়ে দিলে—
ক্ষণেক চিন্তিয়া তিনি কহেন বিধান।
তব প্রিয় সঞ্জয় তো মহা বিচক্ষণ॥
দিব্যচক্ষু বর আমি দিতেছি উহারে।
সকল যুদ্ধের কথা কহিবে তোমারে॥
বর দিয়ে সঞ্জয়েরে করি নিয়োজিত।
অন্তর্ধান হইয়া ব্যাস গেলেন ত্বরিত॥
ছত্রগুলো শুনিয়ে যেন মনে ভাল করে দাগ কাটবার একটু সময় দিয়ে গৌর আবার বললে, স্বয়ং ব্যাসদেব যাকে ভারতযুদ্ধের বর্ণনা দেবার জন্যে দিব্যচক্ষু দিয়েছিলেন তার ওপর কথা বলার কেউ আর থাকতে পারে?
পারে না বলছ? বেশ! বেশ!—ঘনাদার গলার সুরটা কেমন একটু বাঁকা মনে হল—কিন্তু ব্যাসদেব এই দিব্যচক্ষু দিয়ে ধৃতরাষ্ট্রের কাজে সঞ্জয়কে লাগিয়েছিলেন কবে থেকে?
কবে থেকে আবার? যুদ্ধের গোড়া থেকে! গৌরের চটপট জবাব।
ওঃ, যুদ্ধের গোড়া থেকে? ঘনাদা একটু চিবিয়ে চিবিয়ে বললেন, কিন্তু যুদ্ধের গোড়া বলতে কী বুঝব সেইটে একটু পরিষ্কার হলে হত না?
পরিষ্কার আবার কী হবে?—গৌরের স্বরে তাচ্ছিল্য—গোড়া মানে যুদ্ধ যেদিন আরম্ভ হয় সেদিন। অর্থাৎ ভীষ্মের সেনাপতিত্বে কুরুরা আর ধৃষ্টদ্যুম্নের সেনাপতিত্বে পাণ্ডবেরা যেদিন লড়াই শুরু করল।
যেদিন যুদ্ধ শুরু করল? ভাল! ভাল! ঘনাদা যেন সরল ভাবে জিজ্ঞাসা করলেন, তা শুরুটা করলেন কোথায়?
কোথায় আবার? ঘনাদার মূর্খতাকে লজ্জা দেওয়া সুরে গৌর বললে, কুরুক্ষেত্রে।
ও, কুরুক্ষেত্রে?—ঘনাদার সুরটা এবার কেমন গোলমেলে—তা কুরুক্ষেত্রটা ওদের পায়ের তলাতে ছিল, না যেতে হয়েছিল সেখানে?
পায়ের তলায় থাকবে কেন?—গৌর আমাদেরই মত এবার ঘনাদার কথায় কোথায় যেন একটা প্যাঁচ আছে মনে করে একটু সন্দিগ্ধ—সেখানে যেতে হয়েছিল।
যেতে হয়েছিল!—ঘনাদার গলা এবারে ধাপে ধাপে চড়ছে—আর সে যাওয়াটার মানে বোঝো? দু-দশ হাজার নয়, পাণ্ডবদের সাত অক্ষৌহিণী আর কৌরবদের এগারো অক্ষৌহিণী বলতে কী বোঝায় তা জানা আছে নিশ্চয়? ঘনাদার প্রশ্নটা গৌরকে ছাড়িয়ে এবার আমাদের দিকেও ছুঁড়ে দেওয়া।
হ্যাঁ, জানা মানে—গৌর তখন আমতা আমতা করতে শুরু করেছে। আমরা তাকে সাহায্য করতে পারছি না।
থাক, থাক! আর মাথায় ড়ুবুরি নামাতে হবে না। ঘনাদা আমাদের যথাস্থানে নামিয়ে বসিয়ে বললেন, এক অক্ষৌহিণী হল ইষট্টি হাজার ছ-শো দশ ঘোড়া, একুশ হাজার আটশো সত্তর হাতি, রথও ওই অত, আর পদাতিক সেনা হল এক লক্ষ নয় হাজার তিনশো পাঁচ। এই রকম আঠারো অক্ষৌহিণীর ওই কুরুক্ষেত্রে গিয়ে ঘাঁটি গাড়াটা কীরকম তা একটু বোঝার চেষ্টা ওই কাশীরাম দাস থেকেই করা যেতে পারে। দুপক্ষের মধ্যে কারা প্রথম কুরুক্ষেত্রে গিয়ে চড়াও হয়? হয় পাণ্ডবেরা।
একটু চুপ করে যেন ভাল করে দম নিয়ে ঘনাদা গৌরের সঙ্গে পাল্লা দেওয়া শুরু করলেন,
এত শুনি আজ্ঞা দেন ধর্মের নন্দন।
সৈন্য সেনাপতি শীঘ্র করহ সাজন॥
পাইয়া রাজার আজ্ঞা চারি সহোদর।
সৈন্য সেনাপতিগণ সাজিল বিস্তর।
পঞ্চকোটি সহস্র শতেক মহারথী।
লক্ষ কোটি শ্রেষ্ঠ শ্রেষ্ঠ সাজে সেনাপতি॥
কোটি কোটি অশ্ব আর পত্তি অগণন।
সাত অক্ষৌহিণী সেনা করিল সাজন॥
ঘটোৎকচ বীর আসে পেয়ে সমাচার।
দুকোটি রাক্ষস হয় যার পরিবার।।
চতুরঙ্গ দলে সৈন্য সাজে অগণন।
এই মতো পাণ্ডু সৈন্য করিল সাজন।।
শূন্যে দেবগণ করে জয় জয় ধ্বনি।
অতি শুভক্ষণে চলে পাণ্ডব বাহিনী।।
সাত অক্ষৌহিণী সেনা করিয়া সাজন।
রহেন উত্তরে করি সিংহের গর্জন॥
ঘনাদা একটু থেমে বললেন, এ তো গেল পাণ্ডবদের কথা। কৌরবরাও কুরুক্ষেত্র দখলে কিছু কম যায় না। তাদের সৈন্য আর সাত নয়, এগারো অক্ষৌহিণী।
অসংখ্য সাজিল রথ লিখিতে না পারি।
অর্বুদ অর্বুদ কত সাজিল প্রহরী॥
গজ অশ্ব পত্তি সাজে রথ অগণন।
সমুদ্র প্রমাণ সৈন্য সাজে কুরুগণ॥
ধ্বজ ছত্র পতাকায় ঢাকিল আকাশ।
বাসুকী সৈন্যের ভারে পায় বড় ত্রাস॥
টলমল করে পৃথ্বী যায় রসাতলে।
প্রলয় কালেতে যেন সমুদ্র উথলে॥
একাদশ অক্ষৌহিণী করিল সাজন।
একশত ক্রোশ জুড়ি রহে সৈন্যগণ॥
একটু থেমে আমাদের মুখের ওপর সদর্পে চোখ বুলিয়ে ঘনাদা আবার বললেন, কুরুক্ষেত্রে এমনই করে যুদ্ধের জায়গা দখল কি যুদ্ধেরই একটা পালা নয়? সত্যি কথা বলতে গেলে, যুদ্ধের আসল মার পাণ্ডবেরা তো ওইখানেই মেরেছে। মাত্র সাত অক্ষৌহিণী তাদের সেনা, লড়তে হবে প্রায় দুগুণ—এগারো অক্ষৌহিণীর সঙ্গে। বুদ্ধি করে সাহসভরে আগেই তারা গিয়ে কুরুক্ষেত্রের উত্তরের পাথুরে এবড়ো খেবড়ো চড়াইয়ের দিকটাই দখল করেছে। আহাম্মক দুর্যোধন নিজেদের ক্ষমতার গর্বে– তারপর পশ্চিমে সুন্দর সবুজ সমতল দিকটায় গিয়ে উঠে ভেবেছে কী বাহাদুরিই না করেছে। যুদ্ধের পয়লা চালেই ভুল করে তারা যে তাইতে শেষ সর্বনাশ ডেকে এনেছে হামবড়া আহাম্মকদের তা মাথাতেই আসেনি। তা, সে যা হবার তা হয়েছে, কিন্তু গোড়াতে ওই! জায়গা দখলের দৌড় দিয়েই যে যুদ্ধের প্রথমদিন শুরু তাতে কি কোনও সন্দেহ থাকতে পারে। হ্যাঁ, দিনটা সঞ্জয়ের হিসেবে না আসতে পারে। আসবেই বা কেমন করে? কুরুক্ষেত্র দখলের দৌড় যখন চলছে তখন সে ছিল কোথায়? কুরুক্ষেত্রের ধারেকাছে অন্তত নয়। এর পরের দিন ভীষ্ম যেমন কৌরবদের সেনাপতি হয়েছেন তেমনই ধৃষ্টদ্যুম্ন পাণ্ডবদের। সেইদিনই ব্যাসদেব ধৃতরাষ্ট্রের স্বচক্ষে যুদ্ধ না দেখার দুঃখ ঘোচাবার জন্য দিব্যচক্ষু দিয়ে সঞ্জয়কে তাঁর কাছে ভিড়িয়ে দেন। সঞ্জয়ের কাছে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ তাই সেদিন থেকেই শুরু আর তাঁর গুনতিতে মোট আঠারো দিনেই শেষ। আসলে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ যে হয়েছিল কিন্তু পুরো উনিশটি দিন—তা আরও বুঝিয়ে বলতে হবে?
