সে নিরুদ্দেশ হবার খবরটা আমাদের জানতে হল আবার বেতার-ঘঘাষণা মারফত!
বাহাত্তর নম্বরের দিকে সবাই মিলে ছুটে যেতে যেতে শেষ কখন ঘনাদাকে কোথায় কীভাবে দেখেছি তা নিজেদের মধ্যে কথা বলে ঠিক করবার চেষ্টা করলাম।
হ্যাঁ, টঙের ঘরের তাঁর সঙ্গে অদর্শনটা একটু বেশিক্ষণের জন্য হয়ে গেছে সে বিষয়ে সন্দেহ নেই! ব্যাপারটা সত্যিই একটু অস্বাভাবিক। সকালে তাঁর সঙ্গে সবদিন অবশ্য দেখা হয় না। কিন্তু সকালে না হলেও বিকেলে আড্ডাঘরে দেখা যে হবেই তা একরকম ধরেই নেওয়া যেতে পারে। সকালবিকেল দুবেলাই তাঁর দর্শন লাভ থেকে বঞ্চিত হয়েছি এমন ব্যাপার তো আঙুলে গোনা যায়।
এবারে যা ঘটে গেছে তা কিন্তু আরও একটু বেশি কিছু।
শুধু গতকালের সকালবিকেল আর আজকের দিনের সকাল নয়, নিজেদের মধ্যে আলাপ করে বুঝতে পারলাম, গতকালের আগে পরশু বিকেলটা দিব্যেন্দু বড়ুয়ার এক নতুন জুড়ি আমদানির হুজুগে মেতে এক দাবা প্রতিযোগিতার খেলা দেখতে গিয়ে আমাদের আড্ডাঘরে হাজিরা দেওয়াটা ফসকে গেছে।
কিন্তু চার না হোক, আমাদের এই পাঁচ বেলার অন্যমনস্কতাতেই ঘনাদা বাহাত্তর নম্বর ছেড়ে একেবারে নিরুদ্দেশ?
দেখাই শুধু হয়নি, নইলে ঘনাদার মেজাজে চিড় ধরাবার মতো এমন কিছু বেয়াদবিও তো করিনি আমরা কেউ!
আজকের দিন সকাল থেকে যে তাঁকে দেখা দিইনি সেও তো রাত্রের ভোজে তাঁকে একেবারে আহ্লাদে আটখানা করবার জন্য। তাঁর যা-যা বাদশাপসন্দ খানা, তা তো আছেই, তার ওপর একেবারে কিস্তিমাত-এর জন্য ব্যবস্থা আছে, স্মােকড হিলশা অর্থাৎ খই-এর ধোঁয়ায় পাকানো নিষ্কণ্টক মানে কাঁটা-ছাড়া খোশবু সমেত আসল গঙ্গার ইলিশ মাছের লম্বালম্বা কালি। শহরের এক পয়লা নম্বর হোটেলের পুরনো রসুইকরকে ভাড়া করে এনে ভোজের এই পদটি বিশেষ করে বানানো হয়েছে। যেমন ভোজ তার তেমনই তো মুখশুদ্ধির জন্য মোড়ের পানের দোকানের সেরা এই বেনারসি খিলির ব্যবস্থা।
এসব কিছু তা হলে বরবাদ মানে জলাঞ্জলি?
তার চেয়ে গুরুতর ব্যাপার হল এই যে ঘনাদা এরই মধ্যে নিরুদ্দেশ। কেন? কোথায় বা তিনি গেলেন? সে খবর বেতারে ঘোষিত হবার ব্যবস্থাই বা হল কী করে।
বাহাত্তর নম্বরে ফিরে রামভুজ আর বনোয়ারিকেও ডেকে আলোচনা করে এ রহস্যের কোনও কিনারাই হল না। এইটুকু শুধু জানা গেল যে আমাদের সঙ্গে দেখা না হলেও আজ সকাল পর্যন্ত বহাল তবিয়তে আমাদের এই বাহাত্তর নম্বরেই ছিলেন।
ছিলেন বটে, তবে কেমন একট অস্থির-অস্থির ভাব যে ছিল তা চা দিতে গিয়ে। আমাদের বনোয়ারিরও নজরে পড়েছে। কী এমন একটা তাড়াহুড়ো ভাবে যাতে তাঁর অতি পেয়ারের ফ্রেঞ্চ টোস্টও তিনি দুটোর জায়গায় দেড়খানা খেয়ে চায়ের পেয়ালাটা খালি না করেই চলে গেছেন।
সকালের চা-টোস্টের প্রতি এই অবহেলা বনোয়ারি অবশ্য সকালের খাবারের ট্রে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেই লক্ষ করেছে। ঘনাদা তখন ঘরে নেই। তাঁকে এর পর সে আর দেখেনি। দেখেনি রামভুজ বা বাহাত্তর নম্বরের আর কেউ।
কিন্তু সেই সকালে বেরিয়ে ঘনাদা গেলেন কোথায়? তাঁর এই যাওয়াটা যে নিরুদ্দেশ হওয়া এমন খবরই বা বেতারে কে বা কারা পৌঁছে দিল আজকের দিনের মধ্যেই।
বাহাত্তর নম্বরের আড্ডাঘরে বসে যত আলোচনা করি তত আরও দিশাহাবা হয়ে উঠে শেষ পর্যন্ত এ বাড়ির নতুন সহায়ের পরামর্শ নিতে তাঁর খিদিরপুরের বাসাতেই গেছি।
খিদিরপুরের বাসা যে পরাশর বর্মার তা বলাই বাহুল্য। ঘনাদার সঙ্গে তাঁকে লাগিয়ে দিয়ে একটু মজা পাবার লোভে একদিন তাঁকে মিথ্যে ছুতোয় ডাকিয়ে এনেছিলাম। ভেবেছিলাম দুই মহামল্লের তাল ঠোকাঠুকিতে আগুনের ফুলকি ছিটোনো যে আতস বাজি হবে মজা করে তা দেখব।
কিন্তু কোথায় ঠোকাঠুকি! দেখা হওয়ার পর দুজনে যেন আমে দুধে মিশে গিয়েছিল। সেই গলাগলি সেই থেকে এমন চলছে যে বাহাত্তর নম্বরের একটা ঘটিবাটি হারালেও ঘনাদা আমাদের রহস্যভেদের জন্য পরাশর বর্মার কাছে পাঠান।
সুতরাং তাঁর কাছে তখনই যাব বলে ঠিক করলাম। কিন্তু যাবার জন্য নীচে যাবার সিঁড়িতে পা দেওয়ার আগেই বাধা।
বোয়ারি এসে খবর দিলে বড়বাবু মানে আমাদের টঙের ঘরের তাঁর সঙ্গে একজন দেখা করতে এসেছে।
দেখা করতে এসেছে তো হয়েছে কী? বনোয়ারিকে ধমক দিয়েই বললাম, বড়বাবু যে বাড়ি নেই তা বলতে পারোনি, হাঁদারাম?
হাঁদারাম করুণভাবে জানাল যে সেই কথাটা সে বলেছে, কিন্তু তাতে কাজ হয়নি। বনোয়ারির বড়বাবু আর আমাদের টঙের ঘরের তাঁর জন্যে যিনি এসেছেন তিনি নাকি সে সংবাদে কোনও গুরুত্ব না দিয়েই বলেছেন, এখন নেই তো কী হয়েছে! কোই বাত নেহি—আমি তাঁর জন্য অপেক্ষা করব।
বনোয়ারির এই বিবরণটুকু দেওয়ার মধ্যেই সিঁড়ির নীচে আগন্তুকদের দেখা গেল। হ্যাঁ, আর একজন নয়, দুজন। প্রথম জন কাশ্মিরি শালওয়ালা আর দ্বিতীয়জন তাঁর বেচতে-আনা শাল-দোশালার বোঝার বাহন।
ঘনাদার খোঁজে কাশ্মিরি শালওয়ালা আসার মানে? মানেটা শালওয়ালার সঙ্গে একটু আলাপ করে জানা গেল, শালওয়ালা রশিদ খাঁ সাম্প্রতিক ঘনাদা-মোহিতদের একজন। শীতের আগে এই কলকাতায় খানদানিদের মহলে প্রতি বছর সে কাশ্মিরি শাল-দোশালা বেচতে আসে। তার বাহককে নিয়ে কোনও খরিদ্দারের কাছে যাবার পথে ঘনাদার সঙ্গে তার দেখা হয়েছে, আর সেই পথের দেখাতেই সামান্য কিছু বোলচালেই ঘনাদার কাশ্মিরি শাল-দোশালার কারবার সম্বন্ধে গভীর জ্ঞান দেখে সে অবাক আর মুগ্ধ হয়ে তাঁকে। তার সেরা এমন কিছু সওদা দেখাতে এসেছে যার কদর তাঁর মতো জহুরিই শুধু বুঝবে। রশিদ খাঁ তারপর মামুলি পাহাড়ি ভেড়ার ললামে তৈরি মাল আর পাঁচ হাজার ফুটের নীচে যারা নামে না সেই ভেড়ার জাতের পশমে বোনা পশমিনার তফাত বোঝার মতো ওস্তাদের যে স্তবগান শুরু করেছে তা নেহাত ঘনাদার নিরুদ্দেশ-রহস্য-ভেদের দায়েই সবিস্তারে শোনার লোভ সংবরণ করে তাকে কোনও রকমে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে—দিন কয়েক বাদে এলেই দেখা হবার আশ্বাস দিয়ে বিদায় করতে হয়েছে।
