তার সেই ব্যবস্থাতেই গত চারদিন ধরে আমাদের নিরামিষ স্যান্ডুইচের পালা চলছে। নিরামিষ পুরের অবশ্য রকম ফের আছে, যেমন একদিন আলু কপির মণ্ডের সঙ্গে বিট-এর গুঁড়ো, তার পরের দিন কড়াইশুটি বাটার সঙ্গে হিং-ফোড়ন বাঁধাকপি ভাজি, এইরকম আর কী? কিন্তু সে বৈচিত্র্যে আর যে-ই কেন, খুশি না হলেও, অন্তত মুখ বুজে থাকুক, টঙের ঘরের তিনি সে পাত্র নয়।
দু-দিনের পর তিনদিনের দিনেই তিনি স্যান্ডুইচের প্লেটগুলোর দিকে চেয়ে ভ্রুকুটিভরে বলেছেন, কী ব্যাপার হে? আমাদের যেন ভদ্রলোকের-এক-কথা চলছে বলে মনে হচ্ছে? চোখে ভ্রূকুটি থাকলেও মুখটা প্রসন্ন রেখেই তিনি তারপর বলেছেন, তা, ওই কী বলে আমাদের আজও তো নিছক বোট্যানিক্যাল গার্ডেনস মনে হচ্ছে।
আজ্ঞে হ্যাঁ, গৌর গম্ভীরভাবে জানিয়েছে, আজ স্কোয়াশ-এর সঙ্গে সয়াবিনস-এর একটা মিক্সচার মাস্টাড দিয়ে কী রকম জমেছে দেখুন না।
তা তত দেখতেই হবে, ঘনাদা একটা স্যান্ডুইচ যেন বেশ সন্দিগ্ধভাবে তুলে নিয়ে বলেছেন, এক্সপেরিমেন্ট বেশ ভালই করছ। কিন্তু ওই কী বলে স্যান্ডুইচ যদি হয় তো সেই চিকেন হ্যাম-ট্যাম বা সসেজ-টসেজও তো চালানো যায়?
আজ্ঞে না, গৌর সশ্রদ্ধ অথচ গম্ভীরভাবেই জানিয়েছে, এই হপ্তায় তা আর হবে না।
এই হপ্তায় আর হবে না? ঘনাদার চমকিত চোখমুখের বিস্মিত প্রশ্নটা আমাদের একজনের মুখ দিয়েই বেরিয়েছে, তার মানে?
তার মানে, গৌর ধৈর্য ধরে শান্তভাবে তার বক্তব্যটা বিশদ করেছে, এক-এক হপ্তায় এক-এক রকম ধারা চলবে। যেমন এ হপ্তায় নিরামিষ স্যান্ডুইচ, এবং পরের হপ্তায় হল আমিষ কাবাব কোপ্তা কাটলেটের।
ওঃ!—ঘনাদা যে রকম সুবোধ বালকের মতো ব্যবস্থাটা মেনে নিয়ে হাতে নেওয়া স্যান্ডুইচটি শেষ পর্যন্ত সদ্ব্যবহার করে উঠে গেছেন তাতে ফাঁড়াটা এবারের মতো কেটে গেছে ভেবেই আমরা মনে মনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছি।
কিন্তু তার পরদিন যা হয়েছে তাতে বুঝেছি ঘনাদাকে আমরা থোড়াই চিনি।
বিকেলের আসর তখন আমাদের বসে গেছে। গৌরের নব ব্যবস্থাপনায় টেবিলের ওপরে যথারীতি থাক-থাক স্যান্ডুইচ সাজানো। সেই নিরামিষই বটে, তবে রাজমা বাটার সঙ্গে চিজ আর অন্য মশলায় জিনিসটা অখাদ্যের বদলে যে বেশ উপাদেয়ই হয়েছে আমাদের জমে-ওঠা আলোচনাটাই তার প্রমাণ।
আলোচনাটা বসেছে এক-এক যুদ্ধে মহাযুদ্ধে কত মানুষ মরে তাই নিয়ে। পৃথিবীর সেই আদিকাল থেকে মহামারী আর যুদ্ধ জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ কীভাবে করে আসছে তার বিষয় বলতে বলতে গৌর তখন একেবারে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে পৌঁছে। গেছে।
কিন্তু এমন জমাটি সময় টঙের ঘরের তিনি কোথায়? আমরা উত্তেজিত আলোচনার মধ্যে কানটা ন্যাড়া ছাদের সিঁড়িটার দিকেই পেতে রেখেছি। – নিরামিষ স্যান্ডুইচের প্রতিবাদে ঘনাদা এ বিকেলের আসরই ত্যাগ করলেন নাকি শেষ পর্যন্ত? না, তা তিনি করেননি।
এলেন তিনি ঠিকই, তবে একটু দেরি করে। নিরামিষ স্যান্ডুইচ মুখে দেবার দায়টা যেন এড়াবার জন্যই।
আমাদের আলোচনাটাও তখন উত্তেজনার তুঙ্গে গিয়ে পৌঁছেছে বলা যায়। প্রতিদিন সে যুদ্ধে—গৌর চড়া গলায় আমাদের শোনাচ্ছে—এক অক্ষৌহিণী করে সৈন্য মারা পড়েছে তা জানো? এক অক্ষৌহিণী মানে না।
গৌরকে তার কথা আর শেষ করতে হয়নি। বারান্দার দরজা দিয়ে আড্ডাঘরে ঢুকে তাঁর মৌরসি আরাম-কেদারার দিকে আসতে আসতেই গৌবের বক্তব্যটা শুনে ঘনাদা বজ্র গম্ভীর স্বরে তার প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তারপর আরামকেদারায় বসতে বসতে বলেছেন, এক অক্ষৌহিণী নয়, কুরুক্ষেত্রের মহাসমরে প্রতিদিন মারা গেছে নয় অনিকিনি, এক চমূ, এক পৃতনা, দুই গণ, এক সোনামুখ আর দশমিক নয়-চার-সাত-তিন-ছয়-জন সেনা।
কয়েক সেকেন্ড ঘর একেবারে নিস্তব্ধ। তারপর গৌর বাদে আমাদের সকলের গলায় একই জিজ্ঞাসা উথলে উঠল—কী? কী বললেন—?
বললাম, ঘনাদা ধৈর্য ধরে তাঁর বক্তব্যটা আবার বলতে শুরু করলেন, এক অক্ষৌহিণী করে নয়, প্রতিদিন কুরুক্ষেত্রে মারা গেছে নয় অনিকিনি, এক চমু, এক পৃতনা—
কী বলছেন, কী?-ঘনাদার কথা শেষ হবার আগেই তীব্র প্রতিবাদ শোনা গেল এবার—কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কত সৈন্য প্রতিদিন মারা গেছে তারা সোজা হিসেব আপনি উলটে দিতে চান?
উলটে দিতে নয়—ঘনাদার অনুকম্পা মেশানো উক্তি—ভুলটা শুধরে দিতে চাই শুধু।
ভুল!–গৌর রীতিমত উত্তেজিত—কুরুক্ষেত্রে প্রতিদিন এক অক্ষৌহিণী করে সেনা মারা গেছে এটা আমাদের হিসেবের ভুল বলছেন আপনি? পাটিগণিতের সোজা যযাগ-বিয়োগ-গুণ-ভাগও আমরা কি ভুলে গেছি?
ঘনাদা কি ক্ষুব্ধ, ক্রুদ্ধ? না, তিনি নির্বিকারভাবে ঠাণ্ডা অথচ গায়ে-জ্বালা-ধরানো গলায় বলেছেন, গুণ-ভাগে না হোক, কিছুতে একটা ভুল করেছ বলেই মনে হচ্ছে!
ভুল করেছি মনে হচ্ছে? গৌর যেন অতি কষ্টে গলাটা উদারায় নামিয়ে রেখে হিসেবটা বোঝাতে চেয়েছে, মোট কত সেনা ছিল পাণ্ডবদের? সাত অক্ষৌহিণী! আর কৌরবদের ছিল এগারো। এগারো আর সাতে হল সবসুদ্ধ আঠারো অক্ষৌহিণী। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের শেষ জীবিত ছিল মাত্র দশজন! কৌরবদের তিন আর পাণ্ডবদের সাত। এই দশজনকে ধর্তব্য না করলে মোট আঠারো অক্ষৌহিণী সেনা যদি আঠারো দিনে সব শেষ হয়ে গিয়ে থাকে তা হলে প্রতিদিন এক অক্ষৌহিণী করে মারা যায় কি না!
তাই যাবার কথা—ঘনাদা যেন সায় দিতে গিয়েও সামান্য একটু ফ্যাকড়া তুলেছেন—যদি যুদ্ধটা আঠারো দিনের হয়?
