দেখতে দেখতে বদ্ধ হওয়ার সব বিষ কেটে গেল।
সময়মতো যন্ত্রপাতি মেরামত হল। তারপর প্রায় একমাস ধরে সমুদ্রের তলায় সমস্ত রিফট গিরিখাদ আর মরক্কোর পশ্চিমের মাদিরা অ্যাবিস্যাল প্লেন থেকে প্লেটো আর অ্যাটল্যান্টিস সী-মাউন্ট হয়ে সার্গাসো সমুদ্রের উত্তরে সোহ অ্যাবিস্যাল প্লেন পেরিয়ে বার্মুদা পেডেস্টাল পর্যন্ত লস্ট অ্যাটলান্টিকের বিশাল অতল রাজ্যের সন্ধান নিয়ে একদিন নিউফাউন্ডল্যান্ডের এক নির্জন তীরে গিয়ে উঠলাম।
সেই শয়তান বুড়োর মতলব এবার স্পষ্ট বোঝা গেল। একটি নির্জন খাঁড়িতে ঢুকে সাবমেরিন থামবার পর বুড়ো এসে হঠাৎ বাইরে তার সঙ্গে একটু ঘুরে আসার অনুরোধ জানালে।
হেসে বললাম, যা কুয়াশার দেশ, এখানে টহল দেবার শখ আমার নেই।
তবু একবার বেড়িয়েই আসি চলোনা। এখানকার সীল মাছ একটা শিকারও করা যেতে পারে।
প্রতিবাদ নিল জেনে ওভারকোট পরে নিয়ে বেরুলাম। দেখলাম শুধু বুড়ো নয়, সুস্তেলও সঙ্গে চলেছে। শিকারের লোভ দেখালেও বন্দুক শুধু বুড়োরই হাতে।
তীর ছাড়িয়ে কিছুদূর যেতেই বুড়ো সোজাসুজি আসল কথা পাড়লে—লুকোনো ম্যাপটা এবার দাও, দাস।
উঁচিয়ে ধরা বন্দুকটা অগ্রাহ্য করেই অবাক হয়ে বললাম, অ্যাটলান্টিকের তলার ম্যাপ! সে তো সাবমেরিনেই আছে।
না, বুডোর গলার স্বরে যেন বাজ ডাকল, সে ম্যাপ ফাঁকি। সুস্তেল সব আমার কাছে স্বীকার করেছে। আসল ম্যাপ তুমি নিজের কাছে লুকিয়ে রেখেছ—দাও।
সুস্তেলের দিকে জ্বলন্ত দৃষ্টিতে তাকালাম। সে একেবারে অমানুষ নয়। অত্যন্ত অস্বস্তির সঙ্গে থতমত হয়ে চোখ ফিরিয়ে নিলে। বুডোর দিকে ফিরে বললাম, যদি না দিই।
তাহলেও এ-ম্যাপ আমি পাব, শুধু এই নির্জন তীরে তোমায় শেষ নিঃশ্বাস নিতে হবে। কেউ জানতেও পারবে না কিছু।
বুড়ো বন্দুকের সেফটিক্যাচটা সরাল।
সুস্তেল হঠাৎ এগিয়ে এসে বললে, দাঁড়ান, ওই ছুঁচোর জন্য গুলি খরচ করবার দরকার নেই। একবার আমায় বেকায়দায় কাবু করেছে, তার শোধ আমি নিজে হাতে নিতে চাই।
শোধ সে সত্যিই নিলে। দুবার আমার প্যাঁচে মাটি নিয়ে তিনবারের বার আমার পিঠের ওপর ঘটোৎকচের মতো চেপে বসল ঘাড়টা লোহার মতো হাতে আমার পেছনে টেনে ধরে। প্রায় মটকে যায় আর কী!
বুড়ো এবার এগিয়ে এসে সব খুঁজে শেষ পর্যন্ত জুতোর সুকতলার নীচে থেকে ভাঁজ করা ম্যাপটা বার করে নিয়ে বললে, ছেড়ে দাও কালো ভূতটাকে।
ছেড়েই তারা রেখে গেল। তারপর একা সেই জনমানবহীন খাঁড়ির পাড়ে পড়ে রইলাম।
দিন তিনেক উইলো-গ্রাউসের বাসা খুঁজে খুঁজে শুধু ডিম খেয়ে কাটাবার পর, এক সীল-শিকারি দলের মোটর বোট সেখানে না এলে আর ফিরতে হত না।
ঘনাদা থামলেন। শিশিরের মুখেই আমাদের সকলের প্রশ্ন সবিস্ময়ে বার হল। বলেন কী, ঘনাদা! আপনি সুস্তেলের কাছে হারলেন, আবার যে ম্যাপের জন্যে এত, তা-ও ওরা কেড়ে নিলে।
ঘনাদা রহস্যময় হাসি হেসে বললেন, সুস্তেলের কাছে না হারলে ওই জাল ম্যাপ ওরা বিশ্বাস করে কেড়ে নিয়ে যায়! সুস্তেলের সঙ্গে গোপনে ওই বোঝাপড়াই ছিল। সুস্তেলকে ওইটুকুর জন্যেই ক্ষমা করেছি।
অভিভূত হয়ে ঘনাদাকে শেষ একটা সিগারেট ধরিয়ে দিয়ে যাবার সময় শিশির মেঝে থেকে কী যেন একটা কুড়িয়ে নিল মনে হল!
নীচে নেমে জিজ্ঞাসা করলাম, কী একটা কুড়িয়ে নিলি তখন?
শিশির ভেঁড়া পাকানো কাগজটা আমাদের সামনে খুলে ধরে বললে, আমাদের
সব ফন্দি যাতে ফাঁস সেই আসল জিনিস।
দেখি ক-জনে মিলে সুস্তেলের নামে যে চিঠি বানিয়েছিলাম তারই হাতে লেখা খসড়াটা। ঘনাদা কখন কোথায় যে কুড়িয়ে নিয়েছে জানতেও পারিনি।
ঘনাদা ও মৌ-কা-সা-বি-স (গল্পগ্রন্থ)
আঠারো নয়, উনিশ
হ্যাঁ-কে না করা যায়?
এক-কে দুই, কি আঠারো-কে উনিশ?
আর কিছু পারা যাক বা না যাক আঠারো-কে যে উনিশ করা যায় হলফ করে ভার সাক্ষ্য দিতে পারি! কারণ সেটা আমাদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা।
আর এ ভানুমতীর খেল কে যে দেখাতে পারেন তা নিশ্চয় আর বিশদ করে বলতে হবে না।
হ্যাঁ, তাঁর কথাই বলছি। আমাদের বাহাত্তর নম্বরের ন্যাড়াছাদের টঙের ঘরের তিনি।
বিশেষ করে মেজাজ একটু বিগড়ে গেলে তো কথাই নেই।
যেমন বিকেলের আড্ডাঘরে এসে যদি দেখেন চায়ের সঙ্গে তাঁর মনের মতো টা-টা, যা দু-এক দিন আগে ঠারেঠোরে জানিয়ে দেওয়া সত্ত্বেও, গরহাজির। শুধু গরহাজির নয়, সেখানে যা হাজির তা কিছুদিন থেকে একরকম তাঁর দু-চক্ষের বিষ হয়ে দাঁড়িয়েছে, তা হলে সবকিছুই হতে পারে।
এবারের জিনিসটা হল নিজেদের হেঁশেলেই তৈরি ভেজিটেবল স্যান্ডুইচ।
আমাদের রামভুজ ঠাকুরের রান্নার কেরামতি যতই থাক, টোস্ট করা দু-টুকরো পাঁউরুটির মধ্যে নানা কায়দায় বদলানো নিরামিষ পুর দিয়ে কে পরপর ক-দিন জিভে-জল-আনা আহামরি কিছু আমাদের বিকেলের চায়ের আসরে হাজির করতে পারে?
কিন্তু তাই তাকে করতে হচ্ছে।
হচ্ছে আমাদের গৌর মহাপ্রভুর কথায়। অর্থাৎ বাহাত্তর নম্বরের যেমন দস্তুর সেই অনুসারে এ মাসের বিকেলের জলখাবারের তদারকির ভার পড়েছে গৌরের ওপর। সে ভার পেয়ে গৌর যে এমন গবেষণামূলক খাদ্যপরীক্ষা চালাবে তা কে জানত?
খাবার সে যে কিছু আজেবাজে সস্তা খাওয়াচ্ছে তা নয়। কিন্তু জলখাবার বিষয়ে সে তার নিজস্ব মৌলিক থিয়োরি খাটিয়েই যত গোলমাল বাধিয়েছে।
তার থিয়োরি হল নিত্য নিত্য বদল করলে অতি বড় উপাদেয় সবকিছুরও ধার ভোঁতা হয়ে যায়। সেরা সেরা সব খানাদানার মানও তাতে রাখা হয় না। সে তাই ব্যবস্থা করেছে যে আমাদের দুপুরের কি রাত্রের খাবারে যেমন চলছে তাই চলতে দিলেও বিকেলের জলখাবারে এক-এক ধারার অন্তত এক হপ্তায় আর বদল হবে না।
