মানা আছে। তার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে তীব্রস্বরে বললাম, তাহলে দুনিয়ার ওয়াকিব মহলে যা কানাঘুষা চলেছে তা মিথ্যা নয়আমেরিকা ও রাশিয়া ছাড়া আর একটি গোপন তৃতীয় শক্তি কে বা কারা সত্যিই গড়ে তুলছে! আমেরিকা কি রাশিয়ার যে ভুল বা দোষই থাক তারা মানুষের সত্যি কল্যাণ চায়, কিন্তু এই তৃতীয় শক্তির সেসব কোনও দুর্বলতা নেই। আর যা-ই হোক, তোমার গায়ে ফরাসি রক্ত তো কিছু আছে, কী বলে শুধু পয়সার লোভে তুমি এদের কাছে নিজেকে বেচে দিয়েছ? নিজের দেশ বলে কিছু না মানো, মানুষ জাতের ওপরও কি তোমার মমতা নেই?
সুলে কীরকম যেন বিহ্বল হয়ে পড়ল। দুবার ঢোঁক গিলে বলল, দেখো, দাস, আমার চেহারাটা প্রকাণ্ড হলেও ভেতরে ভেতরে সত্যি আমি দুর্বল। মনের জোর এত কম যে অন্যায় বুঝেও হঠাৎ প্রলোভনের কাছে হার মেনে বসি। বিশ্বাস করো, যা আমি করেছি তার জন্যে আমার আফসোসের সীমা নেই। আমি পুরস্কারের লোভে তোমার খবর দিয়ে ওভাবে ধরবার ব্যবস্থা না করলে ওরা তোমার খোঁজও পেত না। কিন্তু এখন উপায় কী?
সুস্তেলের কথাগুলো যে আন্তরিক তা তার মুখ দেখেই বুঝলাম। এ কথার উত্তরে যা বলতে যাচ্ছিলাম তা কিন্তু আর বলা হল না। সেই শয়তানের মতো বুড়ো তখন। দরজায় এসে দাঁড়িয়েছে। কামরার ভেতর ঢুকে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে আমায় একবার লক্ষ করে সে ভাঙা ইংরেজিতে সুস্তেলকেই বললে, যা বোঝাবার বুঝিয়ে দিয়েছ তো?
হ্যাঁ, এই দিচ্ছি! বুড়ো হঠাৎ এসে পড়ায় সুস্তেল একটু যেন ভড়কে গেছে।
আচ্ছা, বুঝিয়ে কমিটিরুমে এসো। এখানে বেয়াড়াপনার শাস্তি যে কী তা-ও জানাতে ভুলো না বলে আমায় একটু সম্ভাষণ পর্যন্ত না জানিয়ে বুড়ো চলে গেল।
বুড়ো যেতেই আগ্রহভরে বললাম, উপায় কী তুমি জিজ্ঞাসা করেছিলে?
সুস্তেল সভয়ে ঠোঁটে আঙুল দিয়ে চাপা গলায় বললে, সাবধান! বেফাঁস আর কিছু বোলো না। এ ঘরে লুকোনো মাইক আছে। তোমার ঘুমের সময় বন্ধ ছিল, এখুনি চালু হবে।
তার কথা শেষ হতে না হতে প্রায় অস্পষ্ট খুট করে একটা আওয়াজে বুঝলাম মাইক সজাগ।
কী এখন করা যায়! সুস্তেলকে গোটাকতক কথা এখুনি না বললে নয়।
তাকে চোখের ইশারা করে ধীরে ধীরে বললাম, তিন, একশো বাইশ, সাতাত্তর।
সে খানিক হতভম্ব হয়ে থেকে হঠাৎ উৎসাহভরে বললে, ছয়!
বললাম, তেইশ, চারশো পাঁচ, এগারো।
সুস্তেল তৎক্ষণাৎ উঠে ওই কামরারই একটি টেবিলের ওপর থেকে কাগজ পেন্সিল নিয়ে এল।
ব্যাপারটা কী হল? আমরা হাঁ করে ঘনাদার দিকে তাকালাম।
কী আর, সাংকেতিক কথা! ঘনাদা একটু হাসলেন।
সাংকেতিক কথা তো বুঝলাম! গৌর বললে, কিন্তু ও তো শব্দ নয়, সংখ্যা। আর আপনি বলতেই সুস্তেল বুঝল কী করে?
লোগোগ্রাফি জানলেই বুঝবে! ঘনাদা অনুকম্পাভরে আমাদের দিকে চেয়ে বললেন, লোগাগ্রাফিতে দু হাজার পর্যন্ত সংখ্যা দিয়ে মোটামুটি সব কিছুই বলা যায়। সকলের অবশ্য অত মুখস্থ থাকে না। সঙ্গে লোগোগ্রাফির আলাদা অভিধান রাখতে হয়।
এর পরে আর ট্যাঁ ফোঁ করবার কিছু নেই, তবু চোখ কপালে তুলে বললাম, আপনার বুঝি সব মুখস্থ?
ঘনাদার মুখে স্বৰ্গীয় হাসি দেখা দিতেই শিবু জিজ্ঞাসা করলে, ওই সব হিজিবিজি অঙ্ক যে বলাবলি করলেন তার মানে কী?
মানে? ঘনাদা বুঝিয়ে দিলেন, মানে প্রথমে জিজ্ঞাসা করলাম, তুমি লোগোগ্লাফি জানো? সুস্তেল তাতে জানালে, হাঁ। তখন তাকে খাতা পেন্সিল
আনতে বললাম।
একটু থেমে আমাদের মুখের চেহারাগুলো দেখে নিয়ে ঘনাদা আবার শুরু করলেন, খাতা পেনসিল আনবার পর কাগজে লিখে সব কথাবার্তা সেরে ফেললাম। চুক্তি হয়ে গেল যে দুশমনদের চোখে ধূলো দেবার ফন্দিতে সুস্তেল আমার সহায় হবে গোপনে। কিন্তু সুস্তেলের সব সাধু সংকল্প শেষ পর্যন্ত তার মনের দুর্বলতায় ভণ্ডুল হয়ে গেল। তার এবং সাবমেরিনের সকলের প্রাণ বাচানোর কৃতজ্ঞতাটুকু পর্যন্ত সে দেখাল না। লোগোগ্রাফিতে তার কাছে জেনে নিয়েছিলাম যে নারবরো দ্বীপ থেকে আমায় অজ্ঞান করে আনবার সময় নিমারাকে সঙ্গে না নিলেও আমার কটি দরকারি বাকস ব্যাগ তারা সাবমেরিনে তুলে নিয়েছিল। আইসল্যান্ড ছাড়িয়ে রিফট ভ্যালির খাদে সাবমেরিন ঢোকবার পর সেই ব্যাগ আর বাকস না থাকলে এ গল্প আর এখানে বসে করতে হত না। সেইখানেই সাবমেরিনটির কবর হয়ে যেত।
কেন! অ্যাটমিক সাবমেরিন না? মুখ থেকে বেরিয়ে গেল আপনা থেকে।
হ্যাঁ, অ্যাটমিক সাবমেরিনও বেগড়ায়। একসঙ্গে তখন ওপরে ভাসিয়ে তোলার আর হাওয়া শোধনের কল গেছে খারাপ হয়ে। সে সব যন্ত্র মেরামত করতে যতক্ষণ লাগবে তার আগেই কার্বন-ডায়াইড গ্যাসে আমাদের কারুর আর জ্ঞান থাকবে না? সুস্তেলের মুখ তো ছাইয়ের মতো ফ্যাকাশে। সেই শয়তান বুড়ো পর্যন্ত কেমন একটু দিশাহারা!
আমার ব্যাগ থেকে ওই শিশি তখন বার করলাম।
ওই শিশি, এক সঙ্গে সবাই বলে উঠলাম। ওই শিশিতে সাবমেরিন ভাসল?
সাবমেরিন ভাসবে কেন? ঘনাদা অধৈর্যের সঙ্গে বললেন, হাওয়ার সমস্যা মিটল।
ওই শিশিতে? আমরা আবার হাঁ।
হ্যাঁ, ওই শিশিতে। ও-শিশিতে কী ছিল জানো? ক্লোরেলা নামে একরকম আণুবীক্ষণিক ফাস—যাকে ছত্রাক বা ছাতা বলে। সিকি আউন্স জলে প্রায় চার কোটি ক্লোরেলা থাকে। কার্বন-ডায়াসাইড থেকে তাড়াতাড়ি অকসিজেন হেঁকে বার করতে তার জুড়ি নেই। শিশি থেকে নানান পাত্রে সেই ক্লোরেলার ফোঁটা জলে ফেলে সমস্ত সাবমেরিনের নানা জায়গায় রাখবার ব্যবস্থা করলাম।
