তাহলে কী করে যাই বলুন। ভাঙা ইংরেজির বদলে যদি নিজের ভাষায় কথা বলতেন তবু আপনার জাতটা, দেশটা কী বুঝতে পারতাম। সুস্তেলের তো ওসব বালাই নেই। টিউনিশিয়ায় জন্ম, জার্মানিতে শিক্ষা। যুদ্ধের পর রুশেরা কিছুদিন আটকে রেখেছিল বলত। তারপর ইংল্যান্ডের হয়ে অজানা জায়গার মানচিত্র আঁকার ছুতোয় আফ্রিকায় আর বলিভিয়ায় ইকোয়েডরে কিছুদিন ঘোরাঘুরি করে হঠাৎ একদিন নিরুদ্দেশ বলে সবাই জানে। আপনাদের মতো দুই অজানা আঘাটার মানুষের সঙ্গে কিছু না জেনে যেতে কি মন চায়?
এত কথা যে-সুযোগের জন্য বলছিলাম তা এবার মিলে গেল। সুস্তেল আমার টিটকারিতে এতক্ষণ রাগে ফুলছিল। আমার কথা শেষ হতেই হুংকার দিয়ে উঠল, তবু তোকে যেতেই হবে, শুটকো বাঁদর। ভালয় ভালয় না যাস তো তার মতো পুঁচকে ফড়িংকে দু আঙুলে টিপে নিয়ে যাব!
তা চেহারার দিক দিয়ে সুস্তেল সে তম্বি করতে পারে। সুস্তেলকে তো দেখেছ? মাংসের একটা পাহাড়, কিং কং তার কাছে কোন ছার!
কিন্তু আমরা যে রোগা চিমসে দেখলাম! এমন একটা সুবিধে ছাড়তে না পেরে শিবু ফস করে বলে ফেললে।
সে তাহলে ভুগে ভুগে হয়েছে। তিন মাইল সমুদ্রের তলায় তিন দুগুণে ছহপ্তা ড়ুবে থাকা তো চারটিখানি কথা নয়। সেই থেকেই ওর অসুখ! অম্লান বদনে শিবুর খোঁচা এবার অগ্রাহ্য করে আমাদের সত্যিকার হাঁ করে দিয়ে ঘনাদা আবার শুরু করলেন, তখন সে একটা দৈত্যবিশেষ। কিন্তু গর্জনের সঙ্গে আচমকা আমার একটি হাইকিক-এ হাতের বন্দুকটা ছিটকে পড়তেই প্রথমটা একটু ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেল। তারপর মনে হল বুনন খ্যাপা একটা হাতিই ছুটে আসছে আমার দিকে। ডিগবাজি খেয়ে হাত পাঁচেক দুরে ছিটকে পড়েও তার রোখ কি যায়! গা ঝেড়ে ঝুড়ে উঠে, আগুনের ভাঁটার মতো দু-চোখ দিয়ে আমায় যেন ভস্ম করতে এবার সন্তর্পণে দু-হাত বাড়িয়ে এগুতে লাগল। ধোবি-পাটে তাকে রামপটকান দেবার জন্যে তৈরি হচ্ছি। এমন সময় ঘাড়ে পিপড়ের কামড়ের মতো কী একটা জ্বালা পেয়ে ফিরে দেখি সেই পাকানো লম্বা বুড়ো শয়তানের মতো আমার পিছনে হাতে কী একটা নিয়ে দাঁড়িয়ে।
তারপরে আর জ্ঞান নেই।
জ্ঞান যখন হল তখন প্রথমটা স্বপ্ন দেখছি কিনা বুঝতে পারলাম না। এ কোথায় এলাম! ছোট্ট একটা জানলা-দরজাহীন কোটর বললেই হয়। ছাদটা এত নিচু যে বিছানার ওপর উঠে বসলেই যেন মাথায় ঠেকে যাবে। নারবরো দ্বীপ বিষুবরেখার ওপরে বলে সেখানে ছিল বেশ গরম আর এখানে দিব্যি ঠাণ্ডা। তা ছাড়া বাতাসেও কেমন একটা ওষুধ ওষুধ গন্ধ। স্থির হয়ে ব্যাপারটা ভেবে নিচ্ছি এমন সময় খুট করে একটা আওয়াজ হয়ে সামনের দেওয়ালেরই খানিকটা যেন সরে গেল। একগাল হাসি নিয়ে পাহাড়ের মতো শরীরটা কোনওরকমে সেই গা-দরজার ফঁক দিয়ে গলিয়ে সুস্তেল আমার বিছানারই এক ধারে এসে পড়ে বলল, যাক, ঘুম তাহলে ভাঙল এতদিনে!
এতদিনে! মনে যা হল মুখে তা প্রকাশ করলাম না। বরং তাচ্ছিল্যের সুরে একটু হেসে বললাম, ভাঙল নয়, তোমরা ভাঙালে বলো! তা, কতদিন ওষুধপত্র দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে রাখলে?
তা মন্দ কী! প্যাসিফিক-এ শুয়েছ আর অ্যাটলান্টিক-এ জাগলে। এখন আইসল্যান্ড ছাড়িয়ে চলেছি।
হুঁ, একটু চুপ করে থেকে বললাম, কিন্তু এ-নিউক্লিয়ার সাবমেরিনটি কোথায় পেলে? অ্যাটমিক সাব তো শুধু মার্কিন মুলুকেরই আছে জানতাম।
অ্যাটমিক সাব! সুস্তেল সত্যিই চমকে উঠল, কে বললে তোমায়!
ঘুমের মধ্যে স্বপ্নে জেনেছি বোধহয়, যেমন সাত সমুদ্র খুঁজে আমায় কী জন্য চুরি করে এনেছ তাও জানতে পেরেছি।
সুস্তেল প্রথম অবাক হওয়ার ধাক্কাটা খানিকটা সামলে বললে, কী জন্য এনেছি বলো দেখি?
যে জন্য এনেছ অ্যাটলান্টিকের তলা দিয়ে লুকিয়ে যাবার সে একটি মাত্র রাস্তার খোঁজ জিজ্ঞাসা করলে তো আমি এমনই বলে দিতে পারতাম। তার জন্য ছুঁচ ফুটিয়ে অজ্ঞান করে চুরি করে আনবার দরকার ছিল না।
দরকার ছিল। বলে সস্তেল একটু হাসল। আন্দাজ তমি অনেকটা করেছ, সবটা পারোনি। অ্যাটলান্টিকের তলায় রিফট ভ্যালির খাদের খবর তোমার চেয়ে ভাল কেউ জানে না এটা ঠিক, কিন্তু সে-খাদ ছকে দেওয়ার চেয়ে বড় কাজ তোমায় দিয়ে করাতে হবে।
ঘনাদা থামলেন। শিবুর কাশিটা মাঝে মাঝে এমন বেয়াড়া হয়ে ওঠে।
ফাঁক পেয়ে আর ঘনাদার মেজাজ পাছে বিগড়ে যায় এই ভয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, রিফট ভ্যালিটা কী ব্যাপার, ঘনাদা?
ঘনাদা খুশি হয়ে বললেন, পৃথিবীর ওপরকার নয়, অ্যাটলান্টিক সমুদ্রের তলার এ একটা আঁকাবাঁকা জোড়া পাহাড়ের মাঝখানকার লম্বা গিরিখাত, আইসল্যান্ডের তলা থেকে শুরু হয়ে দক্ষিণ আমেরিকার মাথা ছাড়িয়ে চলে গেছে। এক ধারে মিডঅ্যাটলান্টিক রিজ আর এক ধারে রিফট পাহাড়। এ রাস্তায় কোনও সাবমেরিন চুপিসারে গেলে আমেরিকা কি ইউরোপ হদিসও পাবে না। সুস্তেলের কথায় জানলাম শুধু এই ডোবা গিরিখাত চেনানো নয়, আটলান্টিকের ক-টি ড়ুবো পাহাড়ের হদিসও আমায় দিয়ে তারা পেতে চায়। ডাঙার পাহাড়-পর্বতের তুলনায় এ সব ড়ুবো পাহাড় যে পেট্রোল থেকে শুরু করে দামি সব ধাতুর কুবেরের ভাণ্ডার এ খবর তারা জানে।
সমস্ত কথা শুনে একটু হেসে বললাম, আমায় যদি এতই দরকার তাহলে এ সাবমেরিনটা কাদের আমায় বলা উচিত নয় কি?
অস্বস্তিভরে এদিক ওদিক চেয়ে সুস্তেল যেন একটু ভয়ে ভয়েই বললে, বলতে মানা আছে।
