সারাদিনের ঘোরাফেরার পর ক্লান্ত শরীরে সবে তখন খাওয়া-দাওয়া সেরে একটু ঘুমিয়েছি, হঠাৎ নিমারা হুড়মুড় করে তাঁবুর দড়িদড়া ছিঁড়ে কাঁপতে কাঁপতে আমার একেবারে গায়ের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
বাঁচান, হুজুর বাঁচান!
ধড়মড়িয়ে জেগে উঠে প্রথমটা তো তাকে একটি চড় কষাতেই যাচ্ছিলাম। অনেক। কষ্টে নিজেকে সামলে জিজ্ঞাসা করলাম রেগে, কী হয়েছে, কী?
এবার শয়তান নিজেই এসেছে হুজুর। আর রক্ষে নেই!
রক্ষে যদি নেই জানিস তো আমার ঘুম ভাঙালি কেন, হতভাগা! বিছানা থেকে উঠে পড়ে বললাম, কই কোথায় তোর শয়তান, দেখাবি চল।
নিমারা সহজে কি যেতে চায়! শয়তানকে একবার সে দেখে এসেছে, আর একবার সামনে গেলেই তার দফা রফা এ বিষয়ে তার কোনও সন্দেহ নেই।
কোনওরকমে টানা-হেঁচড়া করে তাকে বাইরে নিয়ে গিয়ে তার ভীত ইশারায় যা দেখলাম তাতে আমারও চক্ষুস্থির।
নারবরো দ্বীপের মাঝখানে মরা আগ্নেয়গিরির প্রায় চূড়ার কাছে আমাদের তাঁবু খাটানো হয়েছে।
কৃষ্ণপক্ষের রাত। চারিদিকের সমুদ্রে যেন গাঢ় নীল কালি গোলা। সেই গাঢ় নীলকৃষ্ণ সমুদ্রের জলে নারবরো আর ইসাবেলা দ্বীপের মাঝখানের সংকীর্ণ প্রণালীতে বিরাট কী একটা জলজন্তু ভাসছে দেখতে পেলাম। সেটাকে সবচেয়ে বড় জাতের নীল তিমি বা সিবাল্ডস ররকোয়াল ভাবতে পারতাম, কিন্তু নীল তিমিও তো ছেষট্টি-সাতষট্টি হাতের বেশি লম্বায় কখনও হয় না। তা ছাড়া নীল তিমির গা থেকে থেকে-থেকে এরকম আলো ঠিকরে বেরোয় বলে তো কখনও শুনিনি। গ্যালাপ্যাগোসের সবই অদ্ভুত। অতল সমুদ্রের কোনও অজানা বিরাট বিভীষিকাই আমার দেখবার সৌভাগ্য হল নাকি?
দেখতে দেখতে বিরাট জলজন্তুটা সমুদ্রে ড়ুবে গেল। নিমারা তখন আর দাঁড়াতে পেরে বসে পড়ে দু-হাতে মুখ ঢেকেছে।
তাকে ধমক দিয়ে বললাম, অত ভয়ের কী আছে? তোমার শয়তান তো সমুদ্র থেকে ডাঙায় ওঠেনি। তা ছাড়া নিজেই সে ভয়ে ড়ুব মেরেছে—চেয়ে দেখো।
চোখ না খুলেই নিমারা বললে, না হুজুর, ও শুধু শয়তানের ছল। এখন ড়ুব দিয়েছে, কিন্তু দেখবেন ঠিক আবার অন্য মূর্তিতে এসে হাজির হবে।
নিমারার কথাই এক দিক দিয়ে অক্ষরে অক্ষরে তার পরদিন ফলল বলা যায়। রাত্রে-দেখা সেই অজানা বিশাল জলচরের কথা মাথায় থাকলেও, রোজকার মতো সকালে বেরিয়ে ক্যামেরায় কটি অদ্ভুত প্রাণী ও দৃশ্যের ছবি তখন তুলেছি। নারবরো দ্বীপে হিংস্র প্রাণী একেবারে নেই বলা ঠিক নয়। এক ধরনের সাপই এই অহিংসার রাজ্যের কলঙ্ক। একটা ফণিমনসা জাতের অদ্ভুত গাছের ঝোপে সেই সাপের একটি বড় গিরগিটি ধরে খাওয়ার ছবি তন্ময় হয়ে তুলছি, এমন সময় পিঠে একটা খোঁচা খেয়ে চমকে উঠলাম।
নিমারার অবস্থা কাহিল। তাকে তাঁবুতেই রেখে এসেছি শুইয়ে। সুতরাং হঠাৎ একেবারে খেপে গেলেও সে এমন চুপি চুপি এসে আমার পিঠে নিশ্চয় খোঁচা দেবে না। তাহলে এই জনমানবহীন দ্বীপে কে এসে আমার পিছনে দাঁড়িয়ে খোঁচা দিয়েছে।
বলতে এতক্ষণ লাগলেও পলকের মধ্যে এসব ভাবনা বিদ্যুতের মতো মাথার মধ্যে খেলে গেল। তারপর পেছন ফিরতে যাচ্ছি, পিঠে আরও জোরে একটা খোঁচার সঙ্গে ভারি গম্ভীর গলায় শাসানি শুনতে পেলাম, ফেরবার চেষ্টা কোরো না, যেমন আছ সেইভাবে এগিয়ে চলো। তোমার পিঠে দোনলা বন্দুক ঠেকানো, তা বোধ হয় বুঝেছ।
শুধু ওইটুকুই নয়, আরও অনেক কিছুই তখন বুঝে ফেলেছি। কথাগুলো ফরাসিতে বলা হলেও তাতে একটু বাঁকা টান। আলজিরিয়া কি মরক্কোতে যারা কয়েক পুরুষ কাটিয়েছে সেই ফরাসিরা যেভাবে কথা বলে সেই রকম কতকটা। আশ্চর্যের বিষয়, এই গলার আওয়াজ আর এই কথার টান কেমন যেন আমার চেনা বলেই মনে হল। কিন্তু তাই বা কী করে সম্ভব?
কয়েক পা হুকুমমতো এগিয়ে গিয়েই হঠাৎ হেসে উঠে ফিরে দাঁড়ালাম। খবরদার! হাঁকের সঙ্গে সঙ্গে একটি বন্দুক আর একটি রিভলভার আমার দিকে উঁচিয়ে উঠল।
রিভলভার যার হাতে, তালগাছের মতো লম্বা রোগা পাকানো বুড়োটে চেহারার সে লোকটিকে কখনও দেখিনি, কিন্তু দোনলা বন্দক আমার পিঠে ঠেকিয়ে যে কম করেছিল শুধু গলা শুনেই তার পরিচয় ঠিকই অনুমান করেছিলাম। যাকে দেখলাম সে তোমাদের এই সুস্তেল।
গৌর হঠাৎ একটা হেঁচকিই যেন তুলল মনে হল।
ঘনাদা কথা থামিয়ে সন্দিগ্ধভাবে তার দিকে চাইতেই আমরা বলে উঠলাম, জল খেয়ে নে না একটু।
জল খাব কী! গৌরই খেঁকিয়ে উঠল আমাদের, ঘনাদার দিকে দু-দুটো বন্দুক ওঁচানো না? তা বন্দুক আর রিভলভার তারা ছুঁড়ল তো?
না। ঘনাদার মুখে রহস্যময় হাসি।
গুলি ছিল না বুঝি? না, খেলার বন্দুক? শিশিরের বোকার মতো প্রশ্ন।
খেলার বন্দুক নয়, গুলিও ছিল। ঘনাদার মুখ আবার গম্ভীর হল।
তবে? আমরা সবাই বেকুব।
ঘনাদা আবার হাসলেন, গুলি ছুঁড়বে কী করে? সেই কথাই হাসতে হাসতে তাদের বললাম। বললাম, কই ছোঁড়ো গুলি। দেখি। একটু চুপ করে থেকে হতভম্ব মুখগুলো একটু উপভোগ করে আবার বললাম, ভড়কিতে আর লাভ কী! সারা দুনিয়া ছুঁড়ে এই অখদ্দে দ্বীপে আমায় গুলি করে মারবার জন্য হানা যে দাওনি তা বুঝেছি। এখন মতলবটা কী খোলাখুলি-ই বলল।
খোলাখুলি-ই বলছি। বুড়োটে লম্বা লোকটিই বজ্রগম্ভীর স্বরে ভাঙা-ভাঙা ইংরেজিতে এবার কথা বললেন, আমাদের সঙ্গে আপনাকে যেতে হবে।
কোথায়? কেন?
জানতে পাবেন না। বুড়োর মুখ নয়, যেন লোহার মুখোশ।
