বাধ্য হয়ে এ বিদ্রুপ হজম করতে হল। শিবু আর একবার ন্যাকা সেজে মান বাঁচাবার চেষ্টা করলে, মসিয়ে সুস্তেল-এর না আসাটা কিন্তু আশ্চর্য!
ঘনাদা একটু হাসলেন এবার। অবজ্ঞাভরে বললেন, সুস্তেল যে আসবে না আমি জানতাম!
আপনি জানতেন! বেশ সন্ত্রস্ত হয়েই আমরা ঘনাদার দিকে তাকালাম। কিন্তু যা ভয় করছিলাম ঘনাদা সেদিক দিয়ে গেলেন না। শিশিরের দিকে তর্জনী ও মধ্যম আঙুল ফাক করে ডান হাতটা বাড়িয়ে দিয়ে অনুকম্পার সুরে বললেন, হ্যাঁ, জানতাম। আমি ছিলাম না জেনেই সোনি এসেছিল, নইলে আমার সামনে এসে দাঁড়াবার ওর সাহস নেই।
পরম স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে সাগ্রহে এবার উসকানি দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কেন বলুন তো? অমন পৃথিবীজোড়া নাম, অতবড় কার্নোগ্রাফার!
হুঃ, কাটোগ্রাফার! ঘনাদা নাসিকাধ্বনি করলেন।
শিশির তৈরি হয়েই এসেছিল। ততক্ষণে ঘনাদার আঙুলের ফাঁকে যথারীতি সিগারেট বসিয়ে দিয়ে দেশলাইয়ের কাঠি জ্বেলে ফেলেছে।
ঘনাদা প্রথমে টানটি দিয়ে খানিক চুপ করে থেকে ধোঁয়া ছাড়লেন। আমরা চাতকের মতো তাঁর মুখের দিকে তাকিয়ে। ঘনাদার শ্রীমুখ থেকে কী শুধু ধোঁয়াই বেরুবে?
ধৈর্য ধরতে না পেরে শিবু একটু ঝাঁকুনি দেবার চেষ্টা করলে, সত্যি কাটোগ্রাফার নয় বুঝি? জাল?
জাল হবে কেন? ঘনাদা মৃদু ধমক দিলেন, আসল কাটোগ্রাফারই বটে। তাতে হয়েছে কী? নাম-ই গালভরা, আসলে জরিপদারের জেঠা ছাড়া তো কিছু নয়। বনজঙ্গল পাহাড়-পর্বতেরই খবর রাখে। জানে কি সোম অ্যাবিস্যাল প্লেন কোথায় আর কতখানি, মেপেছে কখনও মুইর কি প্লেটো সী মাউন্ট কত উঁচু?
অভিভূতের মতো বললাম, মঙ্গল গ্রহের ভূগোলে আছে বুঝি? নাম তো কখনও শুনিনি!
নাদা অনুকম্পার হাসি হাসলেন তোমাদের ওই সুস্তেলই কি জানত! ডোবার পুঁটি হয়ে গেছল সমুদ্রের তিমির সঙ্গে ফচকেমি করতে! এই শিশিটা না থাকলেই হত খতম।
তক্তপোশের ওপর থেকেই হাত বাড়িয়ে পেছনের শেলফ থেকে যে-শিশিটি তুলে ঘনাদা আমাদের এবার দেখালেন তাতে আমরা তো থ!
ওই শিশি? ওটা হোমিওপ্যাথিক ওষুধের না?
শিবুর অসাবধান মুখ থেকে এক মুহূর্তের জন্যে ফসকে গিয়ে প্রায় ঘাটে এসে ভরাড়ুবি হয়েছিল আর কী!
হোমিওপ্যাথিক! ঘনাদা প্রায় ফেটে পড়ছিলেন।
শিবুই তাড়াতাড়ি সামলে নিয়ে বললে, মানে প্রায় সেইরকম দেখতে কিনা। বোকা লোকেরা তফাত ধরতেই পারবে না।
ঘনাদা ফণা নামালেন, একটু অবজ্ঞাভরে হেসে বললেন, তোমাদের ওই সুস্তেলও পারেনি। সাত সাগর খুঁজে নারবরো দ্বীপে আমায় চুরি করতে আসবার সময়ে ও অন্তত জানত না যে এই শিশির মধ্যে তাদের পরমায়ু লুকোনো থাকবে।
আপনাকে চুরি! হাসি চাপতে গিয়ে বিষম খেয়ে প্রায় যাই আর কী! অতিকষ্টে সেটা সামলে ও কেলেঙ্কারি বাঁচিয়ে বললাম, এত বড় সাহস!
সাহস নয়, দায়।ঘনাদার মুখে রহস্যময় হাসি দেখা গেল। আমাদের মুখগুলোর ওপর একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে তিনি শুরু করলেন, নারবরো দ্বীপের নাম নিশ্চয় শোনোনি, গ্যালাপ্যাগোসের নামই হয়তো জানো না। দক্ষিণ আমেরিকার উত্তর-পশ্চিমে ইকোয়েডর থেকে প্রায় ছশো পঞ্চাশ মাইল দূরের এই কটি ছোট বড় আগ্নেয়দ্বীপের জটলায় প্রায় সওয়া এক শতাব্দী আগে সেকালের একটি পালোলা জাহাজ টহল না দিতে গেলে বিজ্ঞানের এ যুগের সবচেয়ে একটা দামি মতবাদের জন্মই হত কিনা সন্দেহ। সে পালতোলা জাহাজের নাম এস এস বীগল, সে জাহাজের বৈজ্ঞানিকের নাম চার্লস ডারউইন, আর সে মতবাদ হল বিবর্তনবাদ।
গ্যালাপ্যাগোস দ্বীপগুলির মধ্যে সবচেয়ে বড় হল অ্যালবেমাৰ্ল বা ইসাবেলা। দেখতে অনেকটা ইংরিজি জে হরফের মতো। সেই ইসাবেলার মাথার বাঁ দিকে একটি বড় ফুটকি হল নারবরো দ্বীপ, ফার্নানডিনা-ও বলে কেউ কেউ। পৃথিবীর একমাত্র সামুদ্রিক গিরগিটির জাত সী-ইগুয়ানার ভাল করে পরিচয় নিতে সেই দ্বীপে তখন কিছুদিনের জন্যে ডেরা বেঁধেছি। পেরুর লিমা থেকে একটি ছোট স্টিমার আমাকে আর আমার এক অনুচর নিমারাকে সেখানে নামিয়ে দিয়ে গেছে। মাসখানেক বাদে আবার সেই ছোট স্টিমারই আমাদের নিয়ে যাবে।
আমার অনুচরটি ইকোয়েডরের আদিবাসীর জাত। এমনিতে কাজকর্মে চৌকশ কিন্তু একেবারে ভিতুর শেষ। একে এই জনমানবহীন পাথুরে দ্বীপ, তার ওপর চারদিকের বালির চড়ায় বিদঘুটে চেহারার ইগুয়ানারা গিজগিজ করছে সারাক্ষণ। দুদিন যেতেই নিমারার ভয়ে প্রায় নাড়ি-ছাড়ার অবস্থা। সে ধর্মে খ্রিস্টান। তার ধারণা কোনও অজানা পাপের শাস্তিতে বেঁচে থাকতেই সে নরকে পৌঁছে গেছে।
আমি যত তাকে বোঝাই যে দেখতে ভয়ংকর হলে কী হয়, দ্বীপের ওই সব প্রাণী একেবারে নিরীহ, মানুষকে পর্যন্ত তারা ভয় করতে শেখেনি, আর লড়াই-এর পাঁয়তাড়া কষলেও নিজেদের মধ্যেও রক্তারক্তি মারামারি কখনও করে না, কিন্তু ভবি ভোলবার নয়। রাত্রে সে ভাল করে ঘুমোয় না পর্যন্ত। তার বিশ্বাস চোখের দু-পাতা এক করলেই সাক্ষাৎ শয়তানের ওইসব দূত চুপি-চুপি হানা দিয়ে তাঁবু সুদ্ধ আমাদের চিবিয়ে শেষ করে দেবে।
নিমারার অবস্থা দেখে বেশ একটু ভাবনাতেই পড়ে গেলাম। খাওয়া নেই, ঘুম নেই, লোকটা শেষ পর্যন্ত পাগলই হয়ে যাবে নাকি! সঙ্গে যে খুদে ওয়্যারলেস ট্রাম্সমিটারটি ছিল তা-ই দিয়ে লিমাতে যেদিন স্টিমারটা তাড়াতাড়ি পাঠাবার জন্য খবর দিয়েছি সেই রাত্রেই নিমারা একেবারে খেপে গেছে মনে হল।
