শিবু বিশদ ব্যাখ্যার ভার নিয়েছে—শহরে কে না জানে! তবে মসিয়ে সুস্তেল নিজে সব আয়োজন করেছেন আর নিজেই যে তিনি আসছেন আপনাকে নিয়ে যেতে
এটা অবশ্য সবাই জানে না।
ঘনাদার মুখে আশানুরূপ আশঙ্কার ছায়া দেখে আমরা উৎসাহিত হয়ে উঠেছি। ঘনাদা অস্বস্তিটা বিরক্তির ছলে প্রকাশ করেছেন, ঃ! মসিয়ে সুস্তেল বলে তো আমার গুরুঠাকুর নয়। তিনি এসে ধরলেই আমায় যেতে হবে! সায়েন্স কংগ্রেসে বক্তৃতা দেবার জন্য আমি হেদিয়ে মরছি নাকি?
কী যে বলেন ঘনাদা! শিশির সমস্ত সায়েন্স কংগ্রেসের হয়ে যেন ঘনাদার রাগ ভাঙাবার জন্যে ব্যাকুল হয়ে উঠেছে, আপনি হেদিয়ে মরলেন কি, হেদিয়ে মরছে তো তারা! এ যে কত বড় সৌভাগ্য তা কি তারা জানে না। নইলে মসিয়ে সুস্তেল নিজে বাড়ি বয়ে এসে আপনাকে নিমন্ত্রণের চিঠি দিয়ে যান!
নিমন্ত্রণের চিঠি! কী চিঠি? ঘনাদা সত্যিই আকাশ থেকে পড়েছেন। আমরাও একেবারে যেন অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেছি, সে কী! নিমন্ত্রণের চিঠি দেখেননি? আপনি তখন বিকেলে লেক-এ বেড়াতে গেছেন। মসিয়ে সুস্তেল কত খোঁজ করে এসে কতক্ষণ বসে রইলেন, তারপর আমাদের কাছে চিঠিটা দিয়ে দেখা না হওয়ার জন্যে কত দুঃখু করে গেলেন। বার বার করে বলে গেলেন যে আপনাকে নিতে তিনি নিজেই পরশু মানে শনিবার বিকেল চারটেতে আসছেন! সে চিঠি—সে চিঠি, হ্যাঁ গৌরই তো চিঠিটা রাখলে আপনাকে দেবার জন্য।
আমরা যেন রেগে আগুন হয়ে বারান্দায় বেরিয়ে এসে গৌরের নাম ধরে ডাকাডাকি শুরু করেছি তারপর। গৌরও শশব্যস্ত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে বিরক্তির ভান করেছে, কী ব্যাপার, কী! হঠাৎ এত চেঁচামেচি কীসের!
চেঁচামেচি কীসের! আমরা গৌরকে গালাগাল দিতে আর বাকি রাখিনি, আহাম্মক, অকর্মার ধাড়ি কোথাকার! কলকাতা শহরের মুখে চুনকালি দিয়ে সায়েন্স কংগ্রেসকে তুমি ভোবাতে বসেছ! মসিয়ে সুস্তেলের সে-চিঠি তুমি ঘনাদাকে দাওনি!
গৌর লজ্জায় যেন মাটিতে মিশিয়ে গিয়ে হাতে ধরা পড়া চোরের মতো মুখ কাঁচুমাচু করে ঘর থেকে কার্ডটি এনে ভয়ে ভয়ে ঘনাদার হাতে দিয়ে বলেছে, মাপ করবেন ঘনাদা। একেবারে মনে ছিল না।
তাচ্ছিল্যভরে কার্ডটা ধরলেও ঘনাদার চোখ দেখে বোঝা গেছে কী মনোযোগ দিয়ে কার্ডটা তিনি পড়ছেন।
কার্ডে কোনও খুঁত যে নেই তা আমাদের জানা, ঘনাদাও নিশ্চয় ধরতে পারেননি।
ভেতরে যাই তোক বাইরে ঠাট বজায় রেখে একটু অবজ্ঞার সুরে বলেছেন, সুস্তেল! দাঁড়াও, দাঁড়াও, কোন সুস্তেল ঠিক মনে পড়ছে না!
বাঃ-সঁসিয়ে সুস্তেলকে মনে পড়ছে না! শিশির ঘনাদার স্মৃতিশক্তিকে একটু উসকে দেবার চেষ্টা করেছে, সেই বিখ্যাত কাটোগ্রাফার, মানে মানচিত্রের ব্যাপারে দুনিয়ায় যাঁর জুড়ি নেই বললেই হয়।
হুঁ! সংক্ষিপ্ত একটি ধ্বনিতে যা বোঝাবার বুঝিয়ে ঘনাদা ঘর থেকে উঠে গেছেন।
তারপর শনিবার দিন সকাল থেকেই আমরা সজাগ। আধা নয়, সে শনিবার কীসের যেন একটা পুরো ছুটি ছিল। দুপুরের খাওয়া-দাওয়া পর্যন্ত কিছু হবে না তা জানতাম। কারণ ছুটির দিন বলে সকালে বাজারটা একটু ভালরকম করা হয়েছে। মাছের থলের বড় বড় গলদা চিংড়িগুলো ঘনাদাকে কায়দা করে দেখিয়ে রাখতে ভুলিনি।
বেলা একটা নাগাদ ভূরিভোজ শেষ হবার পরই আমাদের সজাগ থাকার সময়।
এবারের সজাগ থাকা একটু অবশ্য আলাদা ধরনের। ঘনাদা পাছে পালিয়ে যান সেই ভয়ে পাহারা দেওয়া নয়, তিনি কোন ফাঁকে কী ভাবে মেস থেকে সরে পড়েন, নিজেরা গা ঢাকা দিয়ে লুকিয়ে তাই দেখে মজা করা।
দুপুরের খাওয়ার সময়ই জমি তৈরি করে রাখা হয়েছে। ভরপেট খেয়ে আমাদের সকলেরই যেন ঘুমে চোখের পাতা জুড়ে আসছে। ছুটির দিন বলে সেদিন আর তাই খেলাধলো আজ্ঞা নয়, যে যার বিছানায় পড়ে ঘুম—এই কথাটাই জানিয়ে রেখেছি।
কিন্তু বিছানায় কতক্ষণ মটকা মেরে শুয়ে থাকা যায়! একটার পর দুটো বাজল। দুটোর পর তিনটে। ঘনাদা এখনও করছেন কী! ঘরের দরজা জানালা বন্ধ। কান খাড়া করে আছি ঘনাদার পায়ের শব্দের জন্য। পালা করে জানালার খড়খড়ির ফাঁক দিয়ে তেতলা থেকে নামবার সিঁড়িটার ওপর চোখও রাখছি, কিন্তু ঘনাদার কোনও সাড়াশব্দই নেই।
তিনটের পর চারটে বাজল। ঘনাদা কি সত্যিই ছাদ ডিঙিয়ে পালালেন! কিন্তু সেদিকেও তো আমাদের রামভুজকে পাহারায় রেখেছি, ঘনাদার সে রকম কোনও চেষ্টা দেখলেই নীচে থেকে রামা হো বলে গান ধরবে। তাহলে? ঘনাদা কি সত্যিই অন্তর্ধানমন্ত্ৰ গোছের কিছু জানেন নাকি!
ঘনাদার ঘরের দিকেই একবার খোঁজ করে আসব কিনা ভাবছি এমন সময়ে সশব্দে তাঁর ঘরের দরজা খোলার শব্দ শোনা গেল। তারপর তেতলার সিঁড়ির ওপর থেকে তাঁর পাড়া-কাঁপানো ডাক, কই হে! সব গেলে কোথায়! দিনের বেলা আর কত ঘুমোবে!
এ ওর মুখের দিকে তাকালাম ফ্যাল ফ্যাল করে। শেষে ঘনাদাই আমাদের খুঁজছেন নিজে থেকে!
ঘনাদার ডাক না শুনে উপায় কী! গুটি গুটি করে একে একে ভিজে বেড়ালের মতো তাঁর তেতলার ঘরে গিয়ে ঢুকলাম!
শিবু ওরই মধ্যে একটু নিজেদের মুখরক্ষার চেষ্টা করে বললে, আপনি এখনও তৈরি হননি, ঘনাদা! চারটের সময়ে না আপনাকে নিয়ে যাবার কথা!
নিজের আধময়লা ফতুয়া আর ধুতিটার দিকে একবার চেয়ে বিছানার মাঝখানটিতে উঠে বসে ঘনাদা অদ্ভুত মুখভঙ্গি করে বললেন, আর কী তৈরি হব! কেন, এই সাজে যাওয়া যাবে না?
