এক লাফে টেবিলটার কাছে গিয়ে ড্রয়ারটা খুলে পিস্তলটা বার করে নিলাম। তারপর দরজা দিয়ে রেলিং ডিঙিয়ে সমুদ্রের জলে সেটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে বললাম, আমি গরিব চাষাড়ে মানুষ, টেক্টাইটের আর কী জানি। নিজের দেশের বাড়িতেও রেখে আসতে সাহস না করে আপনি সঙ্গে সঙ্গে নিজের কাছে নিয়ে ফেরেন বলে এইটেই দুনিয়ার সবচেয়ে দুর্লভ টেষ্টাইট মনে করে নিয়ে চললাম। সেই মূর্তিগুলোর কথা যদি কখনও মনে পড়ে তা হলে আমার কাছে পৌঁছে দিলেই এ-টেকটাইট থুড়ি পেপারওয়েট ফেরত পাবেন। আমার নামটা আপনার কাসিম জানে, ঠিকানাও একটা যাবার সময় দিয়ে যাচ্ছি।
সেই টেকটাইট নিয়েই চলে এসেছিলাম। আশা ছিল সুবুদ্ধি হলে স্যাভেজ একদিন সেই মূর্তিগুলো ফিরিয়ে দিয়ে যাবে।
ঘনাদা থামলেন। সঙ্গে সঙ্গে শিশিরের দীর্ঘ নিঃশ্বাস।
ওঃ, কী লোকসানটাই হল দুনিয়ার। এখন যদি স্যাভেজের সুবুদ্ধিও হয়, টেকটাইট না পেলে সে কি আর সে মূর্তিগুলো ফেরত দেবে! ভারতের ইতিহাসের হেঁড়া পাতাটা আর জোড়া লাগবে না।
সব দোষ ওই বনোয়ারির!
গৌরের আক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গেই দরজায় মূর্তিমানের নাটকীয় আবির্ভাব।
হামি রাস্তাসে বহুত খুঁজে খুঁজে আনলাম হুজুর। ভাল কোরে ধোকে আনিয়েছি! কাঁচুমাচু মুখে ভেতরে ঢুকে টেবিলের ওপর যে জিনিসটি বনোয়ারি রাখল তার দিকে চেয়ে আমরা একেবারে থ!
হুররে! শিবু চেঁচিয়ে উঠল, এই তো সেই সাত রাজার ধন এক মানিক। ছায়াপথের ওপারের ঢিল! ইতিহাসের হারানো খেই টেনে বার করবার চুম্বক!
এই? এই আমার সেই টেকটাইট! ঘৃণাভরে টেবিল থেকে কাঁচের ঢেলাটা ফেলে দিয়ে শিশিরের সিগারেটের টিনটা প্রায় ছোঁ মেরে নিয়ে ঘনাদা গট গট করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
পেপারওয়েট, থুড়ি ঘনাদার টেকটাইট মেঝেয় পড়ে চুরমার।
শিশি
আপনাকে চুরি!—প্রায় কেলেঙ্কারিই করে ফেলেছিলাম বেফাঁস কথাটার সঙ্গে কাশি চাপতে গিয়ে বিষম খেয়ে। তাড়াতাড়ি সামলে বললাম, এত বড় সাহস!
ঘনাদা ঠাণ্ডা হয়ে রহস্যময় হাসি হেসে বললেন, সাহস নয়, দায়!
ব্যাপারটা যে বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনের তা বলাই বাহুল্য, কিন্তু গোড়া থেকে শুরু করাই নিশ্চয় উচিত।
ফন্দিটা মাথায় এসেছিল গৌরের। আমরা সবাই সেটায় জোগান দিয়েছি মাত্র।
কিন্তু শেষে নিজেদের ফাদে নিজেরাই জব্দ হব কে জানত!
সব দিক বেঁধে-হেঁদেই ব্যবস্থা করেছিলাম, কিন্তু কোথায় যে ছিদ্রটুকু ছিল আগে ধরতে পারিনি।
শিবু দামি কার্ডটা ছাপিয়ে এনেছে। তার আগে ঘনাদার দিবানিদ্রার সুযোগে আমরা কজনে মিলে চিঠিটার ভাষার খসড়া করেছি অনেক মাথা ঘামিয়ে।
সুবিধে ছিল এই যে সে সময়ে বিজ্ঞান কংগ্রেস হচ্ছে কলকাতাতেই। দেশ-বিদেশের বড় বড় সব বিজ্ঞানের রথী মহারথীরা এসেছেন এই শহরে। যেন তাঁদেরই একজনের নাম দিয়ে কার্ডটা ছাপানো। ভূগোলবিশারদ নামকরা মানচিত্রকার সঁসিয়ে সুস্তেল যেন পৃথিবীর অজ্ঞাত দুর্গমতম স্থানের অদ্বিতীয় আবিষ্কারক ও পর্যটক ঘনশ্যাম দাস এই কলকাতা শহরেই সশরীরে উপস্থিত এই আশাতীত খবর পেয়ে আহ্লাদে গদগদ হয়ে তাঁকে বিজ্ঞান কংগ্রেসের এক বিশেষ ভূগোল-বৈঠকে উপস্থিত দেশ-বিদেশের সুধীমণ্ডলীকে তাঁর ভাষণ শুনিয়ে কৃতার্থ করবার জন্যে বিনীত অনুরোধ জানিয়েছেন। কবে ও কখন তিনি স্বয়ং গাড়ি নিয়ে ঘনশ্যাম দাসকে নিতে আসবেন তা-ও এ-অনুরোধের চিঠিতে জানানো আছে।
আগে থাকতে মহলা দিয়ে যেমন যেমন ঠিক করে রাখা গিয়েছিল ঠিক সেই মতোই প্রথম অভিনয় সবাই করেছি। বসবার ঘরের মার্কামারা আরামকেদারায় ঘনাদা এসে গা এলিয়ে বসবামাত্র শিশির যথারীতি তার সিগারেটের টিন সামনে খুলে ধরেছে। আমি লাইটার জ্বেলে সিগারেট ধরিয়ে দিয়েছি সসম্ভমে। ঘনাদা প্রথম টান দিয়ে ধোঁয়া ছেড়ে শিশিরের দিকে ফিরে জিজ্ঞাসা করেছেন, কত হল?
বেশি নয়, এই চার হাজার দুশো একুশ মাত্র! শিশির জানিয়েছে সংকুচিতভাবে।
একুশ কেন হবে, উনিশ না? ঘনাদার – কুঞ্চিত হতে-না-হতে শিশির তাড়াতাড়ি পকেট থেকে নোটবই বার করে খুলে দেখে লজ্জায় জিভ কেটেছে। হ্যাঁ, হ্যাঁ, উনিশ-ই তো?
ঘনাদা সন্তুষ্ট হয়ে আর একটি টান দিয়ে চোখ দুটি প্রায় নিমীলিত করার পরই আমি আনন্দে যেন কথাটা চাপতে না পেরে বলেছি, আমরা কিন্তু সবাই শুনতে যাচ্ছি সেদিন, ঘনাদা!
সবাই শুনতে যাচ্ছ? ঘনাদা চোখ খুলে তাকিয়েছেন, কী শুতে? বাঃ, আপনার বক্তৃতা! আমি যেন ঘনাদার বিস্মৃতিতে অবাক হয়েছি। ঘনাদা দন্তস্ফুট করার আগেই শিশির সোৎসাহে বলে উঠেছে, একেবারে ভোরবেলা থেকে কিউ দিতে হবে কিন্তু। নইলে জায়গা মিলবে না।
ভোরবেলা থেকে কী! শিবু শিশিরকে ধমকেছে, আগের রাত্তির থেকে বল! মোহনবাগান ইস্টবেঙ্গলের শিল্ড ফাইন্যাল হার মেনে যাবে দেখিস। সায়েন্স কংগ্রেসে একটা দাঙ্গাহাঙ্গামা না হয়ে যায় না!
ঘন ঘন সিগারেট টানা আর চোখ-মুখের ভাব দেখেই ঘনাদার অবস্থাটা বুঝতে পারা গেছে তখন। নেহাত মানের দায়েই সোজাসুজি রহস্যটা সম্বন্ধে কিছু জিজ্ঞাসা করতে পারছেন না।
শেষ পর্যন্ত ধৈর্য ধরতে আর পারেননি। যথাসম্ভব গম্ভীর হয়ে নিজের চাল বজায় বেখে একটু ঘুরিয়ে বললেন, সায়েন্স কংগ্রেসে আমি বক্তৃতা দিচ্ছি, তোমরা জানলে কোথা থেকে?
কোথা থেকে জানলাম। আমরা সমস্বরে নিজেদের বিস্ময় প্রকাশ করেছি।
