আজ্ঞে হ্যাঁ, মিছরির মতো মিষ্টিগলায় সে বললে, কার পায়ের ধুলো এ জাহাজে পড়ল আমাদের একটু জানতে ইচ্ছে হয় বইকি!
বেশ। সাধু ইচ্ছে। নামটা মুখস্থ করে নিন। দাস, ঘনশ্যাম দাস। আপনার নামটা তা হলে?
অধীনের নাম কাসিম। বিনয়ে লোকটা যেন গলে যাবে। লোকটাকে একটু ভাল করে লক্ষ করলাম। তুর্কি না গ্রিক, মিশরি না সিরিয়ান কিছুই বোঝা যায় না। এমনকী বাঙালিও ভাবা যায়। অবিকল এই রাহার মতো চেহারা।
নাম তো জেনেছেন, কড়া গলায় এবার বললাম, এখন জাহাজটা একটু ঘুরে দেখতে পারি?
নিশ্চয়, নিশ্চয়। শুধু ঘুরে দেখতেই চান বুঝি? বিনয়ের অবতার জিজ্ঞাসা করলে।
না, শুধু ঘুরে দেখতে নয়, জাহাজের মালিক স্যাভেজ সাহেবের একটা পাওনাও মিটিয়ে দিতে। পাওনাটা আঙ্কা কাপকিনের হয়ে।
তা হলে সে পাওনা আমাকেই দিতে পারিস, মর্কট!
বাজ পড়ার মতো পিলে-চমকানো আওয়াজে পেছন ফিরে চেয়ে সত্যিই খুশি হলাম। একটা চেহারার মতো চেহারা বটে! জমাট কালো লোহার তৈরি একটা বিরাট দৈত্য! পরনে খাটো প্যান্ট আর একটা সোয়েটার। শরীরে ইস্পাতের পেশিগুলো একটু ফোলালেই যেন সে সোয়েটার ফাটিয়ে দেবে।
সসম্ভ্রমে বললাম, ও, আপনাকেই! কিন্তু খোদ স্যাভেজ সাহেবকে দিলেই ভাল হয় না?
তা হলে তো স্যাভেজ সাহেবের নাগাল পাবার জন্যে তোকে তুলে ধরতে হয়। ক্রেনের মতো শক্ত এক হাতেই আমার টুটিটা ধরে সে শূন্যে আমায় তুলে ফেললে।
আরে করেন কী! করেন কী! ভয় পেয়ে যাচ্ছি যে! কাতর ভাবে বললাম।
সোনা বাঁধানো দাঁত একটু ফাঁক করে শয়তানের মতো হেসে সে আমায় ওপর থেকেই ছেড়ে দিয়ে বললে, কী! শখ মিটেছে? স্যাভেজ সাহেবের নাগাল আর পেতে চাস?
তা চাই বই কী! আমি তাঁর নাগাল না পেলে তাঁরই বা তাঁর হয়ে আপনারই আমার নাগাল পাওয়া দরকার।
এক টানে ডেকের ওপর থুবড়ে পড়ার পর সেই সাক্ষাৎ যমের ভাঁটার মতো চোখ দুটো যেন টাটার কারখানার ফারনেস হয়ে উঠল।
তবে রে, নোংরা উকুন! লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে কলের মুগুরের মতো সে একটি ঘুষি চালাল।
জাহাজের রেলিংগুলো মজবুত। ভাঙল না, একটু বেঁকে গেল মাত্র। ধীরেসুস্থে গিয়ে তাকে তুলে ধরে বললাম, লাগল নাকি আপনার? আহা, আমাদের আঙ্কা কাপকিনেরও লেগেছিল। তবে এটা বোধ হয় অত লাগবে না।
এবার তুলতে হল কেবিনের ভেতর থেকে। দরজাটা পলকা ভেঙে গেছে।
মাপ করবেন। তুলে ধরে সবিনয়ে বললাম, ভুলে ডানদিকে মেরে ফেলেছি। আঙ্কা কাপকিনের বাঁ চোয়ালটা ভেঙেছিল।
ডেকের ওপর থেকে আবার তাকে তুলে ধরেছি এমন সময় পেছন থেকে গলা-ছাড়া হাসির শব্দের সঙ্গে শুনতে পেলাম—আরে! আরে! করছেন কী? গুণ্ডাদের মতো মারপিট করে কখনও আপনার মতো লোক!
যমপুরুষকে ডেকের ওপরেই গড়িয়ে দিয়ে ফিরে দাঁড়ালাম।
হ্যাঁ, স্বয়ং শ্যাভেজই এসে হাজির হয়েছেন। নামে স্যাভেজ বটে, কিন্তু চেহারায় যেন গোলগাল হাসিখুশি সদাশিব। আমার দিকে চেয়ে হাসছেন, যেন কতকালের চেনা।
আমিও হেসেই বললাম, কী করব, বলুন। গুণ্ডা পোষবার মতো পয়সা তো নেই, তাই নিজেকেই কষ্ট করতে হয়।
আপনি যেন বড্ড রেগেছেন মনে হচ্ছে! স্যাভেজ হেসে উঠলেন আবার।
হ্যাঁ, আমারও সেই রকম সন্দেহ হচ্ছে। তবে আপনার সঙ্গে একটু আলাপ করলেই বোধহয় সব রাগ জল হয়ে যাবে।
তা হলে আর ভাবনা কী! আসুন, আসুন, যত খুশি আলাপ করবেন। স্যাভেজ আমাকে তাঁর খাস কেবিনের দিকে নিয়ে চললেন।
যেতে যেতে বললাম, আপনার ওই পুষ্যিটিকে একটু হাসপাতালে পাঠালে হত! আঙ্কা কাপকিনের পাশে একটা বেড বোধহয় খালি আছে এখনও।
স্যাভেজ হেসে উঠে বললেন, যা বলেছেন। দুজনের পাশাপাশি থাকাই ভাল। ততক্ষণে স্যাভেজের খাস কেবিনে আমরা পৌছে গেছি। বসুন, বসুন। আলাপ করা যাক।স্যাভেজ একটা সোফা আমায় দেখিয়ে দিলেন।
না, বসবার দরকার হবে না। আলাপও বেশি কিছু করবার নেই। শুধু মারমারিসের উপসাগরের ডোবা জাহাজ থেকে কী আনলেন একটু যদি জানান।
কী যে বলেন? স্যাভেজের আবার সেই প্রাণখোলা হাসি। ওখানে ডোবা জাহাজ আছে নাকি? আর থাকলেও তাতে আছে কী!
যা-ই থাক, আমার দরকার শুধু কয়েকটা ব্রোঞ্জ আর অ্যালাবাস্টারের মূর্তির। শুধু সেইগুলোর জন্যই আপনাকে বিরক্ত করতে আসা।
বিলক্ষণ! বিরক্ত আবার কীসের! কিন্তু মূর্তি-টুর্তি আমি পাব কোথায়? আমার নানান জিনিস জোগাড় করবার বাতিক আছে বটে। কিন্তু এখানে তো শখ করে বেড়াতে এসেছি। এই যা দেখছেন, তা ছাড়া কিছু এ-জাহাজে নেই।
কেবিনের চারিদিকে সাজানো জিনিসগুলোর ওপর চোখ বুলিয়ে বললাম, এ ছাড়া আর কিছুর কথা তা হলে আপনার মনে পড়ছে না? আপনার স্মরণশক্তিটা সত্যি দুর্বল দেখছি। একটা দাওয়াই দেওয়াই দরকার। আচ্ছা, এখান থেকে একটা কিছু যদি নিয়ে যাই কেমন হয়? যেটা নেই সেটার কথা ভাবতে ভাবতে যা আছে তার কথা মনে পড়ে যেতে পারে।
আপনার হেঁয়ালি বুঝলাম না, তবে নিন না আপনি যা খুশি! স্যাভেজ উদার হয়ে উঠলেন।
পাশের টেবিলের ওপর কটা কাগজপত্র যা দিয়ে চাপা দেওয়া ছিল সেইটে তুলে নিয়ে বললাম, এইটেই তা হলে নিই।
এক পলকের জন্যে স্যাভেজের মুখ ফ্যাকাসে মেরে গেল। তারপরেই হেসে উঠে তিনি বললেন, আরে এত ভাল ভাল জিনিস থাকতে ওই একটা ভাঙা সস্তা পেপারওয়েট নিচ্ছেন!
সস্তা যদি হয় তত আপনার আপত্তি কীসের! এ তো আর যে জিনিস সংগ্রহ করবার জন্য আপনি ফতুর হতে প্রস্তুত, আপনার চেয়ে যে জিনিসের দুর্লভ সংগ্রহ দুনিয়ার কারুর নেই সেই টেকটাইট নয়!—উঁহু, ওদিকে ঘেঁষতে যাবেন না, স্যাভেজ! কে জানে ওই ড্রয়ারে হয়তো একটা পিস্তল-টিস্তল থাকতে পারে। আপনার যেরকম মুখের চেহারা হয়েছে তাতে পিস্তল হাতে পেলে এই সামান্য পেপার-ওয়েটটার জন্য আপনি হয়তো ছুঁড়েই বসবেন?
