উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, মহেঞ্জদরো? হরপ্পা?
খুড়ো উৎসাহিত হয়ে বললে, হ্যাঁ, হ্যাঁ, ও-ই নাম। কী তাঁর আগ্রহ—কোথায় পেয়েছি জানবার। ও জিনিস এদিকের সদাগরি জাহাজে পাওয়াই নাকি কল্পনার বাইরে। লোকটা ভাল, কিন্তু তবু তাকে বলিনি কিছু। ওদেশের কাউকে এ জিনিস আবিষ্কারের বাহাদুরি নিতে দেব কেন?
ব্যাকুল হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম, জায়গা তুমি ঠিক চিনেছ তো খুড়ো?
হ্যাঁ, হ্যাঁ, কিছু ভাবনা নেই। এখান থেকে পঞ্চাশ গজ দুরে এক ড়ুবো পাহাড়ে লেগে জাহাজটা ড়ুবেছিল। ভাগ্যক্রমে তার অনেক জিনিস ডোবা পাহাড়ের একটা গুহা গোছের গহ্বরে গিয়ে পড়েছিল। সেখান থেকে তিন হাজার বছর ধরে যখন তারা খোয়া যায়নি, তিন প্রহর রাতেও…ও কী!
কথার মধ্যে খুড়ো হঠাৎ চিৎকার করে ওঠায় আমিও চমকে ফিরে তাকালাম। কিন্তু কোথায় কী? চারিদিক একেবারে অন্ধকারে লেপা।
কী, দেখলে কী খুড়ো? অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলাম।
একটা আলো। ওই দূরের সমুদ্রের বাঁকটার কাছে যেন জ্বলেই নিবে গেল!
এখানে আলো কোথা থেকে আসবে? আর ভুলে কোন নৌকো কি জাহাজ যদি এসেও থাকে, আলো জ্বলেই নিবে যাবে কেন? ও তোমার মনের ভুল।
তাই হবে বলে খুড়ো সায় দিলে।
কিন্তু খুড়োর মনের ভুল যে নয়, সাংঘাতিক ভাবে বুঝলাম তার পরের দিন ভোর হতেই।
উত্তেজনায় প্রথম দিকটা ভাল করে ঘুমই হয়নি। মহেঞ্জদরোর মূর্তি বলতে তো ব্রোঞ্জ বা অ্যালাবাস্টারের তৈরি কোনও দেবীমূর্তিই হবে। ফরাসি পণ্ডিত যদি অক্ষর দেখে মহেঞ্জদরোর বলে চিনে থাকেন তা হলে এ মূর্তিতে সেই মহেঞ্জদরোর মার্কামারা গড়ন নিশ্চয় আছে। এ মূর্তি এখানে পেলে তো ইতিহাস বদলে লিখতে হবে। ভারতের সিন্ধুনদের প্রাচীন সভ্যতার সঙ্গে এদিকের যোগাযোগের এর চেয়ে স্পষ্ট প্রমাণ তো আর হতে পারে না! এই মূর্তি যদি সত্যি এখানে উদ্ধার করতে পারি তো আমায় পায় কে?
অর্ধেক রাত এই সব ভাবনায় কাটিয়ে শেষে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। ভোরের দিকে খুডোর ঠেলাঠেলিতে ধড়মড় করে জেগে উঠলাম।
সর্বনাশ হয়ে গেছে, বেটা দাস।
কী সর্বনাশ, খুড়ো! চোখ রগড়ে তখন উঠে বসেছি।
আমাদের অ্যাকোয়া-লাংস দুটোই কে চুরি করে নিয়ে গেছে!
চুরি করে? এই জনমানবহীন জায়গায় আমাদের নৌকো থেকে? এ কী ভুতুড়ে কাণ্ড নাকি।
ভুতুড়ে নয়। কাল আমি ভুল দেখিনি। দুরের সমুদ্রে একটা আলো কাল সত্যিই জ্বলেছিল। সে আলো জ্বলা আর আমাদের নৌকোয় চুরির রহস্যের পেছনে কী আছে তা-ও আমি বুঝেছি। কিন্তু চলল। এখন ফিরে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই।
ফিরেই গেলাম তারপর।
হপ্তাখানেক বাদে বোদরুম-এর বন্দরে আমাদের ত্রেচান্দিরি ঠেকতে না ঠেকতেই খুড়ো লাফিয়ে পড়ল জেটির ওপরে।
এখুনি কোথায় যাচ্ছ, খুড়ো? অবাক হয়ে চিৎকার করে জিজ্ঞাসা করলাম।
আঙুল তুলে খুড়ো যা দেখাল সেটা দুরের বড় জেটিতে বাঁধা একটা ঝকঝকে ছোটখাটো শৌখিন জাহাজ।
আরে, ওটা তো বোদরুম শহরটাই যে প্রায় কিনে রেখেছে সেই স্যাভেজ সাহেবের কেচ—আমিও তখন নেমে খুড়োর পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছি।
খুড়ো আমার দিকে অদ্ভুতভাবে খানিক চেয়ে থেকে বললে, এখনও তুমি কিছু বোঝনি! ওই স্যাভেজ সাহেবের সঙ্গেই আমার বোঝাপড়া। লোভ দেখিয়ে, ভয় দেখিয়ে যা পারেনি, স্যাভেজ শয়তানি করে সেই কাজ হাসিল করেছে এতদিনে। সেদিন ওই কেচ-এর আলোই এক মুহূর্তের জন্যে দেখেছিলাম। লুকিয়ে পিছু নিয়ে আসল জায়গাটা জেনে নিতে দুরে ও জাহাজের আলো নিবিয়ে অপেক্ষা করছিল। অসাবধানে একবার বুঝি কোনও আলো হঠাৎ জ্বলে ওঠে। আমি আহাম্মক, তাই সাবধান হইনি। রাত্রের অন্ধকারে আমাদের ঘুমের সুযোগ নিয়ে কেউ সাঁতরে এসে আমাদের ক্ৰেচান্দিরিতে ওঠে। তারপর অ্যাকোয়ালাংস দুটি চুরি করে আমাদের ফুটো করে দিয়ে যায়। আমরা ওখান থেকে যতদিনে এসেছি তার মধ্যে ওখানকার সব কিছু নিশ্চয় লুট করেই ওই জাহাজ ফিরেছে। আমাদের সাতদিনের রাস্তা ও কেচ-এর কাছে একদিনের ওয়াস্তা। না, আমায় বাধা দিয়ো না। যত বড় বিদেশি আমিরই হোক, তুরস্কের বুকে বসে এ শয়তানি করার শোধ আমি নেবই।
খুড়ো কাপকিন চলে গেল। চেহারা তার দশাশই পালোয়ানের মতো হলেও সরল হাসি-মাখানো মুখই এতদিন দেখেছি। কিন্তু আজ যেন সে সত্যি খ্যাপা দানব হয়ে উঠেছে।
সমস্ত সকাল খুড়োর জন্য বৃথাই অপেক্ষা করলাম। দুপুরবেলা খবর এল হাসপাতাল থেকে। আঙ্কা কাপকিন নাকি জেটি থেকে পড়ে গিয়ে দারুণ জখম হয়েছে। এখুনি আমার যাওয়া দরকার।
গিয়ে যা দেখলাম তাতে শরীরের সমস্ত রক্ত আগুন হয়ে উঠল। খুডোর প্রায় সর্বাঙ্গে ব্যান্ডেজ। আমার দিকে করুণ চোখে চেয়ে বললে, পারলাম না, বেটা দাস, পারলাম না। স্বয়ং যমকে যে ও পাহারায় রেখেছে কেমন করে জানব।
আচ্ছা, যমের চেহারাটাই একবার দেখে আসি, বলে উঠে পড়লাম।
ওই অবস্থাতেই কাতরে উঠে খুড়ো বললে, না না, যেয়ো না তুমি, দাস। সে যে কী ভয়ানক দৈত্য তুমি ভাবতে পারো না, তোমায় খুঁড়িয়ে পিষে ফেলবে।
কোনও উত্তর না দিয়ে বেরিয়ে গেলাম।
সেখান থেকে সোজা জেটিতে স্যাভেজ সাহেবের কেচ-এ।
জেটি থেকে জাহাজে পা দিতেই সামনের এক কেবিন থেকে একজন বেরিয়ে এসে অত্যন্ত অমায়িক ভাবে হেসে বললেন, আসুন, আসুন—জাহাজ দেখতে এসেছেন বুঝি? আপনার নামটা একটু জানতে পারি?
নামটা জানা কি বিশেষ দরকার?
