মাস দুয়েক বিনা কাজে মাইনে নিয়ে কাপকিন খুড়োই একদিন বেঁকে দাঁড়াল। খুড়োর সঙ্গে এই দুমাসে আমার একটা সত্যিকার স্নেহের সম্পর্কই গড়ে উঠেছে। ত্রেচান্দিরির পাটাতনে বসে দুজনে কফি খাচ্ছি, হঠাৎ সে আমার পিঠে একটা চাপড় মেরে কফির পেয়ালাটা উপুড় করে রেখে বললে, তোমার পয়সায় আর খাব না, দাস। এই শেষ!
কেন, হল কী খুড়ো? হেসে বললাম, আমার তো আর জাল জুয়াচুরির পয়সা নয়। আর তা ছাড়া তুমি তো নিজের রোজগারের পয়সায় খাচ্ছ!
নিজের রোজগারের পয়সায় খাচ্ছি? খুড়ো চটে উঠে বললে, এই দুমাসে কবার ড়ুবুরির পোশাক চড়িয়েছি বলো তো? জাত ব্যবসা শেষে ভুলিয়ে ছাড়বে দেখছি। স্পঞ্জ যদি না-ই তোমার দরকার তা হলে আমাকে বসিয়ে বসিয়ে মাইনে দিচ্ছ কেন?
হেসে বললাম, মাইনে কি মিছিমিছি দিচ্ছি! স্পঞ্জ তোমায় দিয়ে ভোলাব। তবে আমার তো যে-সে স্পঞ্জে চলবে না, আসল ইউস্পঞ্জিয়া অফিসিনালিস মলিসিমা
চাই।
আমরা শুধু কেশে উঠলাম। কিন্তু রাহা নতুন লোক—জিজ্ঞাসা না করে পারলেন না, কী বললেন?
সব চেয়ে দামি স্পঞ্জের বৈজ্ঞানিক নাম। ঘনাদা একটু হেসে বুঝিয়ে দিলেন, চলতি নাম অবশ্য সরেস তুর্কি পেয়ালা। ওরকম নরম মোলায়েম উঁচু দরের স্পঞ্জ আর হয় না। এক সের তুলতে পারলেই শ-খানেক টাকা।
যেন আমাদের প্রতিবাদের আশায় একটু থেমে ঘনাদা আবার বলতে শুরু করলেন, কিন্তু যা-ই বলি, কাপকিন খুড়োকে বিশ্বাস করাতে পারলাম না। খানিক চুপ করে থেকে সে গম্ভীর হয়ে বললে, তোমার মতলব আমি বুঝেছি!
কী আমার মতলব? আমি অবাক হবার ভান করলাম।
আচ্ছা তোমার মতলবই হাসিল করব, বলে খুড়ো সেই যে চুপ করল আর তার কাছ থেকে কোনও কথা বার করতে পারলাম না।
সত্যি করে মুখ সে খুলল প্রায় দু হপ্তা বাদে। বোদরুম থেকে বেরিয়ে কুমালি অন্তরীপ ঘুরে সিমি দ্বীপের উত্তর দিয়ে তখন মার্মারিস উপসাগরের ভেতর ঢুকে এক সন্ধ্যায় আমরা নোঙর ফেলেছি।
এতদিন সাধারণ দরকারি আলাপ ছাড়া দুজনের মধ্যে এই অজানা পাড়ির ব্যাপারে কোনও কথাই হয়নি। এবারের যাত্রার আয়োজন খুড়ো কাপকিন একাই সব করেছে আমায় চুপ করে শুধু দেখতে বলে। আমাদের ত্রেচান্দিরিতে এবার মাসখানেকের রসদ তো আছেই, তা ছাড়া আছে ড়ুবুরির পোশাকের বদলে দুজনের অ্যাকোয়া-লাংস বা জল-ফুলফুস। কাঁচের মুখোশ সুদ্ধ এই অ্যাকোয়া-লাংসের হাওয়ার থলি পিঠে বেঁধে আর পায়ে ফ্লিপার বা পা-ডানা পরে সমুদ্রের তলায় মাছের মতোই চরে বেড়ানো যায়।
নোঙর যেখানে আমরা ফেলেছিলাম সে জায়গাটা একেবারে নির্জন। আমাদের বাঁ দিকে পাথুরে জনমানবহীন সমুদ্রতীর। উত্তরে সংকীর্ণ উপসাগরের ওপারে সন্ধ্যার অন্ধকারে কয়েকটা ঝাপসা পাহাড় মিলিয়ে আসছে।
অন্ধকার আরও গাঢ় হবার পর পাটাতনে বসে তুর্কি হুঁকোয় তামাক থেকে খেতে খুড়ো প্রথম আমাদের এবারের পাড়ির আসল উদ্দেশ্যের কথা তুললে।
হেসে বললে, এখানে কী আছে, জানো তো?
বোকা সেজে বললাম, যে স্পঞ্জের জুড়ি নেই সেই সরেস তুর্কি পেয়ালা বোধ হয়!
হুঁ, তুর্কি পেয়ালাই বটে। খুড়ো হেসে উঠে বললে, আর চালাকিতে দরকার নেই। শোনো তা হলে—যে খবর আমার সঙ্গে কবরেই নিয়ে যাব ঠিক করেছিলাম তা-ই আজ তোমার কাছে বলছি। বলছি তোমার ওপর আমার মায়া পড়ে গেছে বলে। আর তোমার চামড়া কালো বলে। এই খবর নেবার জন্যে টাকা যাদের কাছে খোলামকুচি সেরকম কত মার্কিন আমির আমায় সোনায় মুড়ে দিতে চেয়েছে। বুড়ো হয়ে আসছি। ড়ুবুরির কাজ করতে করতে একদিন হয়তো দম ফেটে কি পক্ষাঘাত হয়ে মরব। ওদের কাছে এ-খবর বেচে সেই টাকায় শেষ বয়সটা পায়ের ওপর পা দিয়ে কাটাতে পারি। কিন্তু তবু ওদের এ খোঁজ আমি দিইনি, দেব না। চাঁদির জোরে ওরা ধরাকে সরা দেখছে, দুনিয়ার সব জিনিস ওরা যেন পয়সা দিলেই কিনতে পারে। এখানে এই সমুদ্রের তলায় যা আছে ওরা তা চায় শুধু নিজেদের বাড়িতে, বড় জোর জাদুঘরে, রেখে জাঁক দেখাবার জন্য। আমাকে দু বছর ধরে লোভ দেখিয়ে, এমনকী শাসিয়ে, যে অতিষ্ঠ করে মারছে তার এ সব জিনিসের ওপর ভক্তিশ্রদ্ধাও নেই। সে শুধু মালিক হবার দেমাকেই দুনিয়ার সব কিছু দুর্লভ জিনিস কিনতে চায়। কানাঘুষায় আমার এ আবিষ্কারের কথা সে শুনেছে, কিন্তু রাজত্বের লোভ দেখিয়েও পেটের কথা বার করতে পারেনি।
খুড়োর কথা শুনতে শুনতে মাথায় যেন ঘোর লাগছিল। ধরা গলায় বললাম, সত্যিই এমন দুর্লভ জিনিস এখানে আছে?
আছে, আছে। সকালেই ড়ুব দিয়ে নিজের চোখে দেখতে পাবে। পাঁচ বছর আগে স্পঞ্জের খোঁজে এ অঞ্চলে এসে দৈবাৎ আমি আবিষ্কার করি। বোদরুম-এ ফিরে গিয়ে দু-চার জন ইয়ার বন্ধুর কাছে আসল জায়গায় হদিস না দিলেও একটু-আধটু গল্প করেছিলাম। তাই থেকেই ওই সব শকুনগুলোর টনক নড়েছে। কিন্তু তারাও কল্পনা করতে পারে না কী ঐশ্বর্য এই নোনা জলের তলায় লুকোনো আছে। আমি আধামুখখু ড়ুবুরি, কিন্তু ডাঙার ওপর বেকুফ হলেও ড়ুব দিলেই আমি খলিফা। জলের তলার জিনিস আমি চিনি। তা ছাড়া দু বছর জার্মানির এক মিউজিয়মের হয়ে ড়ুবুরির কাজও করেছি। বোরুম ছেড়ে যে-জলপথ ধরে আমরা এলাম, হাজার হাজার বছর আগে রোডস সাইপ্রাস রোম, এমনকী মিশর থেকে, এ-ই ছিল সেদিনকার পালতোলা সদাগরি জাহাজের রাস্তা। এখানকার ড়ুবো পাহাড়ে লেগে কত জাহাজ তলিয়ে গেছে। সমুদ্রের তলায় সেসব জাহাজের সওদা ছড়ানো। সেযুগের আশ্চর্য সব জিনিস, কাঁসার, তামার, সোনার। তা ছাড়া অ্যাস্ফোরা যাকে বলে সেই দুদিকে হাতল দেওয়া অপরূপ কারুকাজের গ্রিস ও রোমের মাটির পাত্র তো অঢেল। ইউরোপ আমেরিকা থেকে কত দল এসে ড়ুবুরি লাগিয়ে সেসব জিনিস খুঁজে নিয়ে গেছে, কিন্তু তারা যে সব ড়ুবো জাহাজের জিনিস পেয়েছে সেগুলো বড় জোর দু হাজার বছর আগেকার। কিন্তু এইখানে যা আছে তার বয়স কম পক্ষেও তিন হাজারের ওপর। শুধু পেতল কাঁসা সোনার জিনিস নয়, এখানে যে-জাহাজ ড়ুবেছিল তাতে ছিল কাঁসা আর এক রকম চুনা পাথরের অদ্ভুত কয়েকটা মূর্তি। সমুদ্রের তলায় এতদিন থেকেও সেগুলি একেবারে নষ্ট হয়নি। অন্য কিছু আমি ছুঁইনি, শুধু একটি ছোট বুড়ো আঙুল প্রমাণ মূর্তি কুড়িয়ে নিয়ে গেছলাম। ঘসে ধুয়ে পরিষ্কার করে সে মূর্তি একজনকে শুধু দেখাই। তিনি একজন ফরাসি পণ্ডিত। এক মিউজিয়মের হয়ে এই সব ড়ুবো জাহাজের খোঁজেই এসেছিলেন। মূর্তি দেখে তাঁর চক্ষুস্থির। চমকে বলে উঠেছিলেন, আরে, এ তো ভারতবর্ষের জিনিস। মূর্তিতে খোদাই কটা অক্ষরের মতো চিহ্ন দেখে কী একটা নামও যেন করেছিলেন। মনে পড়ছে না এখন।
