রাস্তায় কোথাও পড়ে-উড়ে ছিল বোধ হয়! শিবুর মন্তব্য। কেউ বাজে জঞ্জাল বলে ফেলে-টেলে দিয়েছে! শিশিরের ফোড়ন। কিংবা কেউ হয়তো কাউকে ছুঁড়ে মেরেছে! গৌরের গবেষণা।
হ্যাঁ, ছুঁড়ে মারা জিনিসই বলতে পারো ঘনাদার মুখে রাগের বদলে আমাদের ওপর অবজ্ঞা মেশানো অনুকম্পাই ফুটে উঠল, ছুঁড়ে মারা একটা ঢিলই বটে। ওই ঢিলের কল্যাণে ভারতবর্ষের ইতিহাস যদিও বদলে লেখা যেত। কিন্তু ঢিলটা কোথা থেকে এসেছে, ভাবতে পারো?
আর ঘনাদাকে জ্বালানো উচিত হবে না, তাই মুখে অক্ষমতা ফুটিয়ে আমরা বোকা
সেজে রইলাম এবার।
ঘনাদাই নিজের জবাব নিজে দিলেন, এ-ঢিল এসেছে এক-কোটি দু-কোটি নয়, অন্তত দশ হাজার কোটি মাইল দূর থেকে!
মোটে! শিবু যেন হতাশ।
আমাদের গলায় কীরকম সব শব্দ, যা হাসি চাপবার চেষ্টা বলে ভুল হতে পারে। হ্যাঁ, তবে তার দশ-বিশ হাজার লক্ষগুণ দূর থেকেও হতে পারে। ঘনাদা নির্বিকার ভাবে বলে চললেন, অঙ্কের শূন্যগুলো যেন কালির ফোঁটা মাত্র।
কিন্তু আমাদের সবচেয়ে দূর গ্রহ প্লুটোই তো সূর্য থেকে তিনশো ষাট কোটি মাইলের বেশি দূর নয়। গৌর বিদ্যে জাহির করলে দুদিন আগে কোথায় একটা প্রবন্ধে পড়েছিল বলে।
হ্যাঃ, প্লুটো! ঘনাদা অবজ্ঞার নাসিকাধ্বনিতে প্লুটোকে নস্যাৎ করে বললেন, আমাদের সৌরমণ্ডলের সূর্য যে ছায়াপথ অর্থাৎ নক্ষত্রপুঞ্জের একটা নগণ্য তারা মাত্র, সেই ছায়াপথের এ-প্রান্ত থেকে ও-প্রান্ত কুড়ি হাজার কোটি কোটি মাইল দূর। প্লটো-টুটো নয়, এ-ঢিল সেই ছায়াপথেরও বাইরে থেকে এসেছে।
আমাদের গলা দিয়ে কিছু বেরুবার আগেই প্রতিবাদটা যেন অনুমান করে ঘনাদা আবার বললেন, না, উল্কা নয়, এ সম্পূর্ণ আলাদা জিনিস, বৈজ্ঞানিকেরা এর নাম দিয়েছেন টেটাইট। উল্কার সঙ্গে এর অনেক তফাত। উল্কা আমাদের সৌরমণ্ডলের না হোক, নিজেদের এই ছায়াপথেরই জিনিস। উল্কাপিণ্ডের ভেতর অন্য সব হালকা ধাতুর সঙ্গে লোহা নিকেল থাকবেই। কিন্তু টেকটাইটে লোহা নিকেল নেই। দেখতে তা রঙিন কাঁচের গোলগাল ডেলার মতো। তার ভেতর অ্যালুমিনিয়াম আর বেরিলিয়মের রেডিয়ো-আইসোটোপও পাওয়া গেছে। টেকটাইটের সব রহস্য এখনও জানা যায়নি। কিন্তু পণ্ডিতদের ধারণা, মহাশূন্যের এ সব ঢিল আমাদের ছায়াপথের সীমানার বাইরে অন্য নক্ষত্রলোক থেকে সম্ভবত এসেছে।
এই টেকটাইট এতদিন আপনার কাছে ছিল! আর আপনি তা হেলায় অছোয় যেখানে সেখানে ফেলে রাখতেন! শিশির অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করলে।
তোমাদের ওই ধনুর্ধর বনোয়ারি না আসা পর্যন্ত তাতে তো কোনও ক্ষতি হয়নি। তোমাদের কাছে তো ওটা কাঁচের কাগজচাপা! ঘনাদা টিটকিরি দিলেন।
যথাসম্ভব লজ্জিত হবার ভান করে বললাম, কিন্তু এ কাঁচের ঢিল থুড়ি টেটাইট আপনি পেলেন কোথায়?
শিবুটাকে নিয়ে পারা যায় না। হঠাৎ দুম করে বলে বসল, মাথায় পড়েছিল বোধ হয়।
আহাম্মক কোথাকার! আমরা সামলাবার জন্যে ব্যস্ত হয়ে উঠলাম, দশহাজার কোটি কোটি মাইল, কি তার চেয়ে দূরের ঢিল মাথায় পড়লে কেউ বাঁচে! অবশ্য তোর মতো নিরেট মাথা হলে কথা নেই।
ঘনাদার মুখের মেঘটা জমতে গিয়েই কেটে গেল। প্রসন্ন মুখে তিনি বললেন, না, মাথায় ওটা পড়েনি। কারুর মাথায় টেটাইট কখনও পড়েছে বলে শোনা যায়নি। যদিও টেষ্টাইট নানাদেশে মাটির ওপরেই ছড়ানো পাওয়া যায়। উষ্কাপিণ্ডের মতো মাটিতে গেঁথে যায় না। হ্যাঁ, কোথায় পেয়েছিলাম জিজ্ঞেস করছ? ও-টোইট পেয়েছিলাম বোদরুম-এ।
ঘনাদা থামলেন।
তারপর আমাদের মুখগুলোর ওপর চোখ বুলিয়ে নিয়ে বললেন, বোদরুম শহর কোথায় জানো না নিশ্চয়! বোদরুম-এর নাম না শুনে থাকো, প্রাচীন হ্যালিকারনেসস-এর কথা আশা করি জানো। সেকালের সপ্তম আশ্চর্যের একটি আশ্চর্য। রাজা মৌসোলস-এর স্মৃতিস্তম্ভ ওইখানেই ছিল। শুধু তা-ই নয়, পাশ্চাত্য জগতের প্রথম ঐতিহাসিক হেরোডেটাস-এর ওই হল জন্মস্থান। সেকেন্দার শাহ এশিয়া জয় করতে যাওয়ার পথে হ্যালিকারনেসস ধ্বংস করে লুট করে যান। সেই ধ্বংসাবশেষের ওপর পেট্রোনিয়ম বলে এক শহর গড়ে ওঠে। পেট্রোনিয়ম নামটাই তুর্কিদের মুখে বিকৃত হয়ে হয়েছে বোদরুম।
প্রাচীন ইতিহাস যাই হোক, বোদরুম শহর এখন তুরস্কের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে একটা নগণ্য বন্দর মাত্র। বড় জাহাজ নয়, ঈজিয়ান সাগরের তলা থেকে স্পঞ্জ তোলা যাদের কাজ তাদেরই ত্রেচান্দিরি নৌকো সেখানে ভিড় করে থাকে।
স্পঞ্জ তোলার ব্যবসা করার নামে একটা স্রেচান্দিরি নৌকো ভাড়া নিয়ে তখন বোদরুম-এ থাকি। ত্রেচান্দিরি নেহাত ছোট নৌকো। ঠিক লঞ্চও তাকে বলা যায় না। আমার নৌকোটি লম্বায় মাত্র কুড়ি-বাইশ হাত, পালও আছে আবার একটা ঝরঝরে পুরোনো ডিজেল মোটরও। এই দুই-এর জোরেও ঘণ্টায় ছ-সাত মাইলের বেশি যায় না।
এ সব নৌকোর অবশ্য জোরে যাবার দরকার নেই। জায়গা বুঝে ড়ুবুরি নামিয়ে সমুদ্রের তলা থেকে স্পঞ্জ তোলাই হল তার আসল কাজ। তার জন্য চাই সত্যিকার ভাল ড়ুবুরি। বোদরুম-এর সেরা ড়ুবুরি আঙ্কা কাপকিন মানে কাপকিন খুড়ো আমার নৌকোয় কাজ করে। আমি নৌকো চালাই। আর ড়ুবুরির নিঃশ্বাসের নল ধরা থেকে অন্য ফাইফরমাশ খাটে স্যামি বলে এক নিগ্রো ছোকরা। বোদরুম আর কারাবাকলা দ্বীপের মাঝে চুকা প্রণালী থেকে কুমালি অন্তরীপ ঘুরে সিমি দ্বীপ পর্যন্ত আমাদের ত্রেচান্দিরি ঘোরাফেরা করে। কিন্তু স্পঞ্জ তোলা আর হয় না।
