দুপুরের দিবানিদ্রা সেরে ওঠবার পর যথারীতি গড়গড়ায় তাম্রকূট সেবন করতে করতে ঘনাদাও নির্ঘাত সে আওয়াজ মাঝে মাঝে পেয়ে কৌতূহলী হয়েছেন। ঠাকুর রামভুজের মারফত খবরটাও তাঁর কাছে পৌঁছে দিতে ভুল হয়নি। যেমন মহলা দিয়ে শেখানো ছিল , রামভুজ সেইভাবে একটু সকাল সকালই চা নিয়ে গেছে এবং ঘনাদার প্রশ্নের অপেক্ষায় না থেকে নিজে থেকেই নালিশ জানিয়ে বলেছে, তিন বাজতে না বাজতে চা! বোলেন তো বড়বাবু, হামাদের কতো মুশকিল!
ঘনাদা নীচের গোলমাল সম্বন্ধে প্রশ্ন করবার সুযোগ পেয়েছেন আর রামভুজ তার হিন্দি বাংলার খিচুড়িতে যতখানি সম্ভব বিস্ময় ঢেলে দিয়ে বলেছে, আরে বাস রে! বহুৎ বড়া এক শিকারি আসিয়েছে সমুন্দরকে পারসে! কেনা শের গণ্ডার হাঁথি মারিয়েছে। বাবুলোগ সব ওহি কিত্সা শুনতে আছে!
আর ঘনাদা স্থির থাকতে পারেন!
তারপর রামভুজও চা দিয়ে নীচে নেমেছে, আর তার প্রায় পিছু পিছুই ঘনাদা। আড্ডাঘরে একবার এসে দাঁড়াবার জন্য প্রাণটা তাঁর ছটফট করছে তখন, পারছেন
শুধু মানের দায়ে! ছটফটানিটাই বনোয়ারির ওপর বকুনি হয়ে বেরিয়েছে, কিন্তু তাতেও যা ভেবেছিলেন তা হয়নি।
গল্প শুনতে আমরা এমন যেন মশগুল যে ঘনাদার ওই পাড়াজাগানো চিৎকার কানেই যায়নি।
এতক্ষণ পর্যন্ত যাওবা রাশ টানা ছিল—বনোয়ারির এক চেঙাড়ি বেগুনি ফুলুরি পাঁপরভাজা নিয়ে আড্ডাঘরে ঢোকার সঙ্গে তা ছিঁড়ে গেল।
বনোয়ারি টেবিলের ওপর চেঙাড়িটা রেখে বেরিয়ে যাবার আগেই, যেন ঘরে কেউ আছে কি নেই খেয়াল না করে, টেবিল থেকে খবরের কাগজটা নিতেই ঘনাদা ঢুকে পড়লেন।
ঢুকে পড়েই দাঁড়ালেন থমকে তাঁরই মৌরসিপাট্টা আরামকেদারায় শিবুর আধা মিলিটারি পোশাক-পরা মামাতো ভাইকে দেখে।
আমরা কিন্তু তখনও যেন গল্পেই মশগুল।
তারপর, মি. রাহা, গৌর চোখ বড় বড় করে ভয়ে বিস্ময়ে ধরা গলায় জিজ্ঞাসা করলে, বোমার ভেতর থেকে দুটো কিফারু তিনটে ফারু চারটে কিবাকো ছুটে আসছে আর আপনার হাতে স্রেফ একটা পাঙ্গা। কী করলেন আপনি তখন?
ঘাস কাটলেন?
এবার আর চমকে ফিরে ঘনাদাকে লক্ষ না করে উপায় নেই। আমাদের সকলের মুখেই হঠাৎ যেন অবাঞ্ছিত উপদ্রবে বিরক্তির ভান। কিন্তু তাতেও বিস্ময় যেন আর চাপা থাকছে না।
ঘনাদা আমাদের দিকে অনুকম্পাভরে তাকিয়ে জ্বালা-ধরানো ব্যঙ্গের সুরে বললেন, ঘাস ছাড়া আর কী কাটবে! কারণ আফ্রিকার সোহাইলি ভাষায় ঘাস কাটবার লম্বা ধারালো ছুরিকেই পাঙ্গা বলে। তা ছাড়া বোমা হল গ্রাম কি তাঁবু-টাবুর চার ধারে গাছপালার তৈরি কাঠের দেওয়াল। তার ভেতর মানুষ থাকে, জানোয়ার সেখান থেকে বেরোয় না! আর কিবাকো যদিও হিপোপোটেমাসের সোয়াহিলি নাম, কিন্তু কিফারু আর ফারু—আলাদা জানোয়ার নয়, কিফারুকেই সংক্ষেপে বলা হয় ফারু—মানে গণ্ডার।
আমরা ধাতস্থ হয়ে কিছু বলবার আগেই ঘনাদা রাহার দিকে আঙুল তুলে হাসিমুখে শাসানির ভঙ্গিতে বললেন, বোকাদের নিয়ে তামাশা করার স্বভাব এখনও তা হলে তোমার শোধরায়নি, কাসিম? এদের কাছে আবার রাহা হয়েছ? মনে আছে। বোদরুম-এ আমার সেই ত্রেচান্দিরি-র কথা?
আমাদের সঙ্গে রাহারও তখন চোখ কপালে উঠেছে। প্রায় তোতলা হয়ে গিয়ে তিনি বলবার চেষ্টা করলেন, দেখুন, আমি…কী বলে…
বুঝেছি! বুঝেছি! ঘনাদা রাহাকে কথাটা আর শেষ করতে না দিয়ে বললেন, সেসব দিনের কথা মনে করালে লজ্জা পাও একটু। সেও ভাল। তবে তোমার আর বিশেষ কী দোষ! মনিবের হুকুম তামিল করেছ মাত্র। এখানেও আজ তারই হুকুমে এসেছ জানি। দাম যা চেয়েছিলাম তা নিয়েও এসেছ নিশ্চয়, কিন্তু বড়ই দুঃখের কথা, তোমার মনিব স্যাভেজকে বোলো গিয়ে, সে-জিনিস আর তাকে দিতে পারলাম না। যার জন্যে স্যাভেজ প্রাণটা বাদে সব কিছু দিতে প্রস্তুত, সে-জিনিস আর আমার কাছে নেই!
ঘনাদার নাক থেকে ফোঁস করে একটা স্টিম ইঞ্জিনের মতো আওয়াজ বার হল। তাঁর বোধহয় ধারণা, তিনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
আমরা তখনও অবশ্য হাঁ হয়ে আছি। রাহাই আমতা আমতা করে বললেন, আমার নাম কিন্তু, ওই কী বললেন, কাসিম নয়, আমি হলাম শিবুর মামাতো ভাই।
অনিল রাহা।
কী? ঘনাদা যেন আকাশ থেকে পড়ে রাহার দিকে তাকালেন, তারপর ধীরে ধীরে ভুল ভেঙে গিয়ে লজ্জা পাবার ভঙ্গিতে বললেন, ছি ছি, আমারই ভুল। আশ্চর্য কিন্তু চেহারার মিল! যাক, তবু ভাল, স্যাভেজের কাছে কথার খেলাপটা আপাতত হল না। দেখি, এখনও সেটা খুঁজে পাই কিনা!
ঘনাদা দরজার দিকে পা বাড়ালেন।
বলা বাহুল্য এবার আমাদেরই উঠে গিয়ে ধরে আনতে হল।
শিবুর চোখের ইশারায় রাহা তখন আরামকেদারা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়েছেন। সেই আরামকেদারায় ঘনাদাকে প্রায় পাঁজাকোলা করে নামিয়ে দিয়ে যে যেখানে পারি বসে পড়ে জিজ্ঞাসা করলাম, কী খুঁজতে চান, ঘনাদা?
ওই তোমাদের মূর্তিমান বনোয়ারি যা ফেলে দিয়েছে!ঘনাদার রাগটা যেন সঙ্গে সঙ্গে চেঙাড়ির বেগুনি ফুলুরির ওপরই গিয়ে পড়ল! শিশিরের এগিয়ে দেওয়া সিগারেটটা অগ্রাহ্য করে সেগুলো সাবাড় করবার জন্যে হুমড়ি খেয়ে পড়লেন।
বনোয়ারি ফেলে দিয়েছে? সেটা তো একটা ভাঙা কাঁচের পেপারওয়েট! আমার মুখ দিয়ে বেরিয়ে গেছল।
ভাঙা কাঁচের পেপারওয়েট!
প্রায় অর্ধেক চেঙাড়ি শেষ করে মিনিট দশেক বাদে ঘনাদা আমার দিকে কটমটিয়ে তাকালেন, জানো, ওটা কী বস্তু? জানো, ওটা কোথা থেকে পাওয়া?
