না হে না, ঢিল মারার চেয়ে বেশি অন্যায় করেছে। শিশির এবার ব্যাপারটা বুঝিয়ে দিলে, ঘনাদার ঘরে একটা ভাঙা কাঁচের পেপারওয়েট পড়ে থাকে, দেখেছ তো৷ বনোয়ারি ভাঙা কাঁচের ঢেলা ভেবে ঝাঁট দেবার সময় সেটি কোথায় নাকি ফেলে দিয়েছে?
এই ব্যাপার।
আরেক চোট আমাদের হাসির হা উঠল। ব্যাপার যাই হোক আমাদের মতলব যে হাসিল হয়েছে, সামান্য একটা ভাঙা কাঁচের ঢেলা নিয়ে ঘনাদার হইচই বাধানোতেই তা বোঝা গেল।
ঘনাদার এখন একবার-ডাকিলেই-যাইব গোছের অবস্থা। কিন্তু সেই ডাকটি আর আমরা দিচ্ছি না। আমাদের ক-দিন যা জ্বালিয়েছেন তার একটু শোধ নিতেই হবে।
কী বিশ্রী কটা দিনই গেছে আমাদের। আমাদের কেন, শহরসুদ্ধ সবার। করপোরেশনের কল্যাণে একটু বর্ষণেই আমাদের মেসবাড়িটি একেবারে দ্বীপ হয়ে যায় বলে আমাদের দুরবস্থা একটু বেশি।
এদিকে আকাশ যেন ফুটো হয়ে দিনের পর দিন অবিশ্রান্ত বৃষ্টিতে সমস্ত শহর থইথই, ওদিকে দেশজোড়া ধর্মঘট। মেস থেকে নড়বার উপায় নেই, কিন্তু মেসে সারাক্ষণ ভাজবার মতো ভেরেণ্ডাও কই ছাই!
তাসপাশায় অরুচি ধরে গেছে, ক্যারম পিটে পিটে আঙুল টনটন। সময় যেন আর কাটে না।
ঘনাদা একটু কৃপা করলেই এ বন্দীদশা শাপে বর হয়ে ওঠে, কিন্তু তিনি মুখে একেবারে যেন উর্বল তালা লাগিয়েছেন পাছে কিছু বেরিয়ে যায় এই ভয়ে।
বড় জোর একটু হুঁ কি অ্যাঁ, হ্যাঁ কি না। তার বেশি শব্দজ্ঞানই যেন তাঁর হয়নি।
সাধ্যসাধনার ত্রুটি আমরা করিনি, ঘুষ দিয়েছি দরাজ হাতে, কিন্তু কিছুতেই ভবি ভোলবার নয়।
লোভ আমরা কম দেখাইনি, বাকি রাখিনি যত রকম সম্ভব উসকানি দিতে।
বিকেলবেলা ঘনাদার ঘর খোলা দেখে এক এক করে গিয়ে ঢুকেছি। ঘনাদা আপত্তি অবশ্য করেননি, কিন্তু এমনভাবে দরজার ভেতর দিয়ে বাইরের ছাদের বৃষ্টি পড়া মনোেযোগ দিয়ে দেখেছেন যেন আমরা মশা মাছির মতো অবাঞ্ছিত হলে সইতে বাধ্য হওয়া উপদ্রব মাত্র।
শিশির তবু সিগারেটের টিনটা খুলে ধরেছে এবং ঘনাদা অন্যমনস্কভাবে তা থেকে সিগারেট তুলে নেওয়ার পর উৎসাহিত হয়ে লাইটার জ্বেলে ধরিয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞাসা করেছে, এ রকম নাগাড়ে বৃষ্টি কলকাতায় আগে হত না, না ঘনাদা?
হুঁ, ঘনাদা সিগারেটে টান দিয়ে শব্দটুকু যেন নাকের ভেতর ধোঁয়ার সঙ্গে ছেড়েছেন।
এসব অ্যাটম বোস থেকে হচ্ছে, বুঝছিস না? গৌর উসকে দিতে চেয়েছে, দুনিয়ার আবহাওয়া সব বদলে যাবে দেখিস, বাংলা দেশে বরফ পড়বে আর অ্যালাস্কায় চলবে লু!
ঘনাদা একবার শুধু গৌরের দিকে চেয়েছেন মাত্র, কিন্তু সলতে ধরেনি।
শিবু আরেক মাত্রা চড়িয়েছে এবার, তা-ই যদি হয় তো নতুন কী এমন? এই পৃথিবী একবার সত্যি উলটে গেছল জানিস? সাইবিরিয়ার তখন এ-হাল নয়। গাছপালা সবুজ ঘাস সবই ছিল। তারপর এক নিমিষে সেই সাইবিরিয়া একেবারে জমে বরফ।
শিশির সায় দিয়ে বলেছে, হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিকই তো। সাইবিরিয়ার তুষারে ঢাকা তেপান্তরে যেসব মরা ম্যামথ পাওয়া গেছে তাই থেকেই বোঝা যায় চোখের পলক ফেলতে না ফেলতে ব্যাপারটা ঘটেছিল। ম্যামথের লাশগুলো পাওয়া গেছে একদম নিখুঁত তাজা। একটা লোম পর্যন্ত নষ্ট হয়নি। তাদের পেটে যে ঘাস পাওয়া গেছে তা গরম দেশে ছাড়া হয়ই না। হঠাৎ পৃথিবী উলটে না গেলে ওরকম গোটা টাটকা ওসব লাশ থাকত না।
আমরা সবাই আড়চোখে ঘনাদার দিকে চেয়েছি।
কাকস্য পরিবেদনা।
ইতিমধ্যে আমাদের গোপন নির্দেশমাফিক ঠাকুর তেলমাখা ডালমুট মেশানো মুড়ির কাঁসি আর বনোয়ারি চায়ের ট্রে নিয়ে এসেছে।
ঘনাদা চায়ে চুমুক দিতে দিতে মুড়ির কাঁসিতে হাত চালাতে ভোলেননি, কিন্তু মুড়ি কড়াই চিবোনোর আওয়াজ ছাড়া মুখ দিয়ে তাঁর কিছু বার করা যায়নি।
হতাশ হয়ে হাল ছেড়ে আমাদের চলে যেতে হয়েছে। রাগও জমেছে মনে মনে।
ঘনাদার এ-বেয়াড়াপনার কারণ যে বুঝিনি তা নয়, কিন্তু সে তো পান থেকে চুন খসার বেশি কিছু নয়। এত তোয়াজেও তার মাফ নেই!
বৃষ্টি দুদিন নাগাড়ে পড়বার পরই ঘনাদা বায়না ধরেছিলেন খিচুড়ির সঙ্গে ইলিশ মাছ ভাজার।
ঘনাদাকে খুশি করতে বৃষ্টির মধ্যে গৌরই গেছল বনোয়ারিকে নিয়ে বাজার করতে।
তারপর খেতে বসে খিচুড়ির সঙ্গে পাতে মাছভাজা পড়তেই ঘনাদা আইসেনহাওয়ারের দিকে ক্রুশ্চেভের মতো ভুরু কুঁচকে গৌরের দিকে তাকিয়েছিলেন।
গৌর শশব্যস্ত হয়ে কৈফিয়ত দিয়েছিল, ভাল ইলিশ পেলাম না, ঘনাদা-তাই পারশে নিয়ে এলাম। খেয়ে দেখুন, একেবারে আসল ক্যানিং-এর কুলীন পারশে, ইলিশের মতো হেজি-পেঁজির সঙ্গে এক জলে সাঁতরায় না পর্যন্ত।
ঘনাদার পাতে আস্ত যে ভাজা পারশেটি পড়েছে, আমাদের সকলের পাতের লিলিপুটদের তুলনায় তা গালিভার। কিন্তু তাতে কী হয়! তখন আকাশের মেঘ ঘনাদার মুখে নেমেছে। ভাজা পার্শের সদ্ব্যবহার করতে করতে তিনি গম্ভীর মুখে যেন কাউকে উদ্দেশ না করে স্বগতোক্তি করেছেন, হুঁ, আমি আর কিছু বুঝি না! কাল ইস্টবেঙ্গল জিতেছে। আজ ইলিশ কখনও আসে!
বোকনো-সোঝানো, খোসামোদ অনেক তারপর হয়েছে, ইলিশও এসেছে সেদিন রাত্রেই। কিন্তু ঘনাদাকে গলানো যায়নি। বৃষ্টির কটা দিন আমাদের মাঠে মারা গেছে।
অনেক চেষ্টাচরিত্র করেও কিছু ফল না পেয়ে শেষে আমাদেরও মেজাজ গেছে। বিগড়ে! থাকুন ঘনাদা বোবা কালা হয়ে। ওঁকেও জব্দ না করে আমরা ছাড়ছি না।
সেই জব্দ করারই ফন্দিতে সেদিন তিনটে না বাজতেই আড্ডাঘরে আমরা সবাই জড়ো। শিবুর এক মামাতো ভাই সম্প্রতি আফ্রিকায় কবছর চাকরি করে ফিরেছেন। সকালে তিনি এসেছিলেন শিবুর সঙ্গে দেখা করতে। তাঁকে পেয়েই বুদ্ধিটা মাথায় এসেছিল। ভদ্রলোক রসিক। সব শুনে-টুনে আমাদের সঙ্গে জুটতে আপত্তি করেননি। জীবনে কোনও দিন বন্দুক না ধরলেও ভদ্রলোকের চেহারাটা জমকালো! আমাদের কথায় আধা মিলিটারি পোশাকে বিকেলে সেজে এসেছেন। আপাতত শিখিয়ে পড়িয়ে নিয়ে ঘনাদার মৌরসি আরামকেদারায় তাঁকে বসিয়েছি, আর আমরা মুগ্ধ শ্রোতা সেজে তাঁকে নিয়ে ক্ষণে ক্ষণে উচ্ছ্বাস উল্লাস বিস্ময় ও হর্ষধ্বনিতে যেন বাড়ি সরগরম করে তুলেছি।
