জলার ওপারে ওকুমে গাছ থেকে দেবতার আদেশ শুনে ভড়কে গেলেও তারা লাভালকে কিন্তু ছেড়ে দিল না। সাবাটিনির উসকানিতে তারা তিনমাস বাদে প্রমাণের জন্যে অপেক্ষা করে রইল।
সে তিনমাস কী উদ্বেগের মধ্যে যে কাটল, তা বলে বোঝানো যাবে না। সোলোমাস তো আমার ওপর তখন খেপেই গেছেন, ল্যাবরেটরিটা বাঁচাবার যেটুকু আশা ছিল, আমি যেন পাগলামি করে তা জলাঞ্জলি দিয়েছি।
তিনমাস বাদে জংলিরাও যেমন প্রতিদিন নদীর দুই শাখার ওপর নজর রাখে, আমিও গোপনে গোপনে তা-ই।
তারপর হঠাৎ একদিন জংলিদের সে কী তাণ্ডব নৃত্য! গ্রামকে গ্রাম জুড়ো ঙগোমা মানে উৎসবের নাচ শুরু হয়ে গেল। একটা নদীর জল সত্যিই রক্তের মতো লাল হয়ে উঠেছে, আরেকটা আগুনের মতো জ্বলছে।
আপনার ওই ছুঁচ ফুটিয়েই একটা নদী থেকে রক্ত বার করে আরেকটায় আগুন ধরালেন! শিবু কাশতে কাশতে বলল।
হ্যাঁ, আমার ব্যাগে ছিল সমুদ্রের জ্যান্ত অ্যানিমোনের টুকরো, দু-জাতের ডাইনো ফ্ল্যাজেলেটে ভরতি। পুয়ের্তোরিকো থেকে এনেছিলাম নকটিলিউকা মিলিয়ারিসের জীবাণু, সেখানকার নদী সমুদ্রের মোহানায় যাতে মাঝে মাঝে জল আগুনের মতো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। আর যাকে জিম ব্রিভ বলে জেলেরা, সেই জল-লাল করা মাছের মড়ক-লাগানো জিম্ননাডিনিয়াম ব্রিভের জীবাণু এনেছিলাম ফ্লোরিডা থেকে। সেন্ট্রিফিউজে অ্যানিমোনের টুকরোগুলো পাক খাইয়ে ছেতরে আলাদা করে তা থেকে অতি সূক্ষ্ম ছুঁচের মতো পিপেট দিয়ে এক একটি আলাদা জীবাণু তুলে তাদের আহার মেশানো টেস্টটিউবের ভেতর ছেড়ে উজ্জ্বল ইলেকট্রিক বাতির তলায় রেখে দিয়েছিলাম। সেই ইলেকট্রিক আলোই সূর্যের কাজ করছিল। জীবাণুগুলো লক্ষ লক্ষ গুণ তাতে বেড়ে উঠেছিল। তারপর সেই টেস্টটিউবের জীবাণু নদীর শাখায় ফেলবার পর তিনমাসে উপযুক্ত পরিবেশ পেয়ে অসম্ভব বেড়ে একদিন জলকে লাল আর আগুন করে তুলেছিল। ফ্লোরিডায় আর পুয়ের্তোরিকোয় এই ব্যাপার প্রায়ই ঘটে। সাধারণত এক পাঁইট জলে যে জীবাণু পাঁচশোর বেশি থাকে না, ঠিক প্রশ্রয় পেলে তা তিন কোটি হয়ে দাঁড়ায়।
লাভালকে তা হলে জংলিরা ছেড়ে দিল! আমরা জিজ্ঞাসা করলাম।
তা আর দেবে না! ছেড়ে শুধু নয়, সে তত ছোটখাটো দেবতা হয়ে উঠল তারপর। তাকে বা তার ল্যাবরেটরিকে ছোঁয় কার সাধ্য!
আর সাবাটিনি?
সাবাটিনিকে দেবতার রাগের প্রমাণ পাবার পর তারা ধরে বেঁধে ফেলেছিল। তাকে প্রাণে মারতে বারণ করেছিলাম। কিন্তু সেই সঙ্গে বলে দিয়েছিলাম, টিঙ্গা টিঙ্গার ধারের ওকুমে গাছ থেকে, তাকে পালাতে দিলেই দেবতা আবার খেপে যাবেন। সাবাটিনি ওই ফাঙ্গদের কাছেই বন্দী হয়ে আছে।
কিন্তু এত কাণ্ড যার জন্যে, লাভালের সেই গবেষণার বস্তুটা কী?
জিজ্ঞেস করে মনে হল আসল কাজ যখন হাসিল হয়েছে তখন প্রশ্নটা করে ঘনাদাকে ফাঁপরে ফেলার আর দরকার ছিল না।
ঘনাদা কিন্তু মোটেই ভড়কালেন না। আমাদের দিকে করুণা ভরে তাকিয়ে বললেন, তা-ও এতক্ষণ বুঝতে পারোনি? বস্তুটা হল ক্লোরোফিল। গাছপালা থেকে সমুদ্রের সূক্ষ্ম প্ল্যাংকটন পর্যন্ত যার দৌলতে সূর্যের আলো রাহাজানি করে প্রাণিজগতের খাদ্যের ভিত তৈরি করে, যা না থাকলে পৃথিবীতে মানুষ তো দুরের কথা, প্রাণের অস্তিত্বই থাকত না, সেই ক্লোরোফিল কৃত্রিম উপায়ে তৈরি করবার চেষ্টা নানা দেশের বৈজ্ঞানিকরা করছেন। কিন্তু সে ক্লোরোফিল আসলের সঙ্গে সব দিক দিয়ে মিললেও এখনও আসল কাজ, মানে সূর্যের আলোর কোয়ান্টা ধরে কার্বন-ডায়োক্সাইডকে কার্বোহাইড্রেট করে তুলতে পারছে না জলের হাইড্রোজেনটুকু নিয়ে অক্সিজেন মুক্ত করে দিয়ে। লাভাল সেই গবেষণাতেই অন্যদের চেয়ে অনেক দূর এগিয়েছেন। সত্যিকার ক্লোরোফিল একবার কৃত্রিম উপায়ে তৈরি হলে পৃথিবীতে অন্নাভাব বলে আর কিছু থাকবে না, মরুভূমির মাঝখানে থেকেও মানুষ নকল ক্লোরোফিল দিয়ে যত খুশি যা ইচ্ছে খাবারের মশলা তৈরি করতে পারবে।
আমাদের স্বল্পাহার-ব্ৰতটা তা হলে— শিবু কথাটা শুরু করতেই ঘনা শিশিরের সিগারেটের টিনটা ভুলে পকেটে ভরে তাকে থামিয়ে বললেন, তার আর দরকার হবে বলে মনে হচ্ছে না। লাভালের কাছ থেকে খবর এল বলে।
ঢিল
ঘনাদা তাঁর তেতলার ঘর থেকে অকারণে কয়েকবার নীচের তলা পর্যন্ত নামাওঠা করেছেন, আমাদের আড্ডাঘরের সামনে ঘুরঘুর করেছেন খানিকক্ষণ, শুধু মান খুইয়ে ভেতরে ঢুকতে পারেননি এ পর্যন্ত।
এখন হঠাৎ বাইরে দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে তিনি তাঁর বাজখাঁই গলায় আমাদের বাহাত্তর নম্বর বনমালি নস্কর লেনের নতুন চাকর বনোয়ারিকে তুলোধানা বকুনি দিচ্ছেন শোনা গেল।
ঘনাদার কর্ণকুহরে জ্বালা ধরাবার জন্যই যে উচ্চহাসিটা ঘরে আমরা তুলেছিলাম সেটা থামিয়ে হঠাৎ ঘনাদার এ-উত্তেজনা ও তম্বির হেতুটা বোঝবার চেষ্টা করলাম।
শিশির তার ঘর থেকে সিগারেটের টিন আনবার ছলে চট করে একবার ঘুরেও এল বারান্দা দিয়ে, ঘনাদার চোখের সামনে নতুন সিগারেটের টিন খোলাতেই যেন তন্ময় হয়ে।
ব্যাপার কী? আমরা মুচকি হাসির সঙ্গে উৎসুক।
ঢেলা। শিশির সিগারেটের টিনটা মাঝখানে টেবিলে রেখে একটি সংক্ষিপ্ত কথাতেই রহস্য ঘনীভূত করে তুলল।
ঢেলা! আমরা হতভম্ব।
আমাদের বনোয়ারি ঘনাদাকে ঢেলা মেরেছে। শিবুর বিস্মিত শঙ্কিত অভিনয়ের ধরনে আমরা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি জোরেই হেসে উঠলাম। কারণে অকারণে হেসে উঠে আমাদের জটলাটা জানান দেওয়াই অবশ্য আমাদের উদ্দেশ্য।
