ভূত দেখলে নাকি, মুনশিজি! আলি কুলী ঠাট্টার সুর দিতে গিয়েও একটু বিস্মিত কণ্ঠেই জিজ্ঞাসা করেছে।
না, ও কিছু নয়!
ব্যাপারটা হালকা করে উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করে মুনশিজি আবার হাঁটতে শুরু করেছেন।
লোকটাও মুনশিজিকে দেখে একটু যেন থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছিল। চবুতরায় জ্বলা বাতির আলোয় তখন তাকে ভালভাবেই দেখা গেছে। তারপর হন হন করে হেঁটে সে আলোর পরিধি ছাড়িয়ে আবার দূরের অন্ধকারে মিলিয়ে গেছে। গিরধরলাল তখনই একটা কিছু করতে পারতেন। কিন্তু ব্যাপারটা এমন অবিশ্বাস্য যে, নিজের চোখের ভুল মনে করে মিছে কেলেঙ্কারির ভয়ে কাউকে কিছু আর জানাতে সাহস করেননি। আলি কুলীর কাছে এক জায়গায় বিদায় নিয়ে সেই রাত্রেই অন্ধকার শহরের এক প্রান্ত থেকে আর-এক প্রান্তে কুমার রামসিং-এর বাড়িই গেছেন তাঁকে ব্যাপারটা জানাতে।
কিন্তু সেখানে মীর আতিশ শহর-কোতোয়াল সিদ্দি ফুলাদ-এর রক্ষীদল তোপ বন্দুক নিয়ে পাহারা দিচ্ছে। সিদ্দি ফুলাদ নিজে উপস্থিত থাকলে হয়তো ভেতরে যাবার অনুমতি পেতেন, কিন্তু শহর-কোতোয়ালের অধীন থানাদার তা দেয়নি।
বিফল হয়ে বাড়ি ফিরতে হয়েছে গিরধরলালকে। সারারাত তারপর ঘুমোতে পারেননি। সেদিন সকালে কেল্লার বাইরে তাঁর প্রভু কুমার রামসিং-এর চৌকি জেনে ভোর না হতেই সেখানে ছুটে এসেছেন তাঁর কাছে।
মুনশিজির মুখে সব শুনে কুমার রামসিং-ও এ ব্যাপারে তাজ্জব বনে গেছেন। তিনিই এবার বিমূঢ় হয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন মুনশিজিকে, আপনি শিবাজি ভোঁসলেকেই দেখেছেন বলছেন! দেখার ভুল হয়নি তো?
তা হতে পারে কুমার সাহেব! মুনশিজি দিশাহারাভাবে বলেছেন, কিন্তু আমি স্পষ্ট শিবাজি ভোঁসলেকেই দেখেছি। ও মুখ তো আমার মনে ছাপা। একটা গোটা দিন তাঁর সঙ্গে কাটিয়ে তাঁকে আগ্রা নিয়ে এসেছি এই আমিই। তাই ভয় পেয়ে কাল রাত্রেই আপনার কাছে ছুটে গেছলাম। দেখা করতে না পেরে আজ ভোরেই আবার এসেছি। আপনি তো চৌকিতে আসবার আগেই শিবাজির শিবির হয়ে এসেছেন!
তা এসেছি! চিন্তিতভাবে বলেছেন কুমার, নিজের চোখে দেখেও এসেছি তাঁকে। উনি কিছুদিন ধরে অসুখের মানত হিসেবে রোজ ভারে ভারে মিঠাই-মণ্ডা, ফলমূল নানা মন্দিরে আর ব্রাহ্মণ-পণ্ডিত, সাধু-সন্ন্যাসীকে পাঠাচ্ছেন, জানো তো! অসুখ সত্ত্বেও ভোরে উঠে পূজা-পাঠ সেরে তারই ব্যবস্থা করেন। কাল রাত্রের ব্যাপারটার কোনও মানে পাচ্ছি না, কিন্তু আজ ভোরে স্বচক্ষে তাঁকে দেখে এসেছি।
সেদিন চৌকি সেরে অত্যন্ত দুর্ভাবনা মাথায় নিয়ে কুমার বাড়ি ফিরেছেন। যত আজগুবিই মনে হোক, সাবধানের বিনাশ নেই বলে কুমার তাঁর নিজের অনুচরদের পাহারা আরও কড়া করেছেন। দণ্ডে দণ্ডে তারা শিবাজির খবর নেবে। রাত্রে পর্যন্ত ঘুরে আসবে তাঁর শোবার ঘর।
পরামর্শ করবার জন্যে শহর-কোতোয়াল সিদ্দি ফুলাদকে বিশ্বাস করে ব্যাপারটা জানাবার কথা একবার ভেবেছেন। কিন্তু তার সুবিধে হয়নি। ফুলাদ সাহেব দু-দিন ধরে নাকি কোতোয়ালিতে আসছেন না। শিবাজির শিবির পাহারা দেবার অমন গুরু দায়িত্বও তাঁর অধীন থানাদারের হাতে ছেড়ে দিয়েছেন। হয়তো হঠাৎ অসুস্থই হয়েছেন কোতোয়ালের সাহেব—ভেবেছেন কুমার রামসিং।
সিদ্দি ফুলাদ-এর অসুখ কিন্তু হয়নি। হয়েছে তার চেয়ে অনেক দারুণ কিছু। তাঁর পাগল হতে আর বাকি নেই। সেই অবস্থাই তাঁর হয়েছে, যা হয়েছিল রাজপুতানার মরুতে প্রথম আগ্রা আসবার পথে মরুর ঝড় আর দস্যুদের হানার পর।
তখনকার মতোই তাঁর নয়নের মণি ফিরোজাকে হঠাৎ আর পাওয়া যাচ্ছে না। হঠাৎ কে যেন অন্দরমহলের দুর্ভেদ্য প্রাচীর ও পাহারা তুচ্ছ করে তাকে হাওয়ার মতো অদৃশ্য করে নিয়ে চলে গেছে।
সেবারে এই বিপদে দেবদূতের মতো দেখা দিয়ে কন্যাকে যে উদ্ধার করে এনেছিল সেই বচনরাম নিজেও নিরুদ্দেশ।
পারিবারিক এ চরম লজ্জাকর ব্যাপারের কথা কাউকে জানাবারও নয়। সিদ্দি ফুলাদ সমস্ত কাজকর্ম ছেড়ে একাই সারা শহর খুঁজে বেড়িয়েছেন দিনরাত্রি। কিন্তু বৃথাই।
৯.
এরই মধ্যে এসেছে ষোলোশো ছেষট্টি সালের উনিশে আগস্ট তারিখ!
আগ্রা আর সেই সঙ্গে মোগল সাম্রাজ্যের ভিত্তি যা টলিয়ে দিয়েছিল ওই তারিখে, আগ্রার কেউ কিন্তু তার কোনও আভাস পায়নি।
শিবাজি একটু বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ে শয্যাগত হয়েছেন এই কথাই সকলে জেনেছে। প্রহরীরা তাঁকে বিছানায় শায়িত অবস্থায় দেখেও গেছে। গায়ে লেপ ঢাকা। তার ভেতর দিয়ে শিবাজির বিশেষ সোনার কঙ্কণ পরা হাতটা দেখলেই চেনা যায়।
সন্ধ্যার সময় যথারীতি মিষ্টান্নের ভারাগুলি বাহকেরা বয়ে নিয়ে গেছে বাইরে। গোড়ায় গোড়ায় নিত্য পরীক্ষা করে দেখলেও রক্ষীরা এখন আর তা নিয়ে মাথা ঘামায় না। তারা মিষ্টান্নের ভারীদের বাধা দেয়নি।
শিবাজির ঘরে রাত্রেও কুমার রামসিং-এর অনুচরেরা এসে তদারক করে গেছে। শিবাজির সোনার কঙ্কণ পরা সেই হাত দেখেই তারা আশ্বস্ত হয়েছে। তারা দেখেছে। একজন চাকর শয্যাপ্রান্তে বসে শিবাজির পদসেবা করছে। পরের দিন সকালে আটটা নাগাদ শিবাজির সৎভাই চাকরটিকে নিয়ে শিবির থেকে বেরিয়ে গেছেন। যাবার সময় সকলকে সাবধান করে গেছেন, অসুস্থ শিবাজিকে যেন বিরক্ত না করা হয়। .
কেউ তা করেনি। কিন্তু ক্রমশ প্রহরীরা সন্দিগ্ধ হয়ে উঠেছে শিবাজির শিবির, অস্বাভাবিক রকম শান্ত দেখে। শিবাজির দর্শনার্থীদের কোনও ভিড়ই না থাকাটা বেশ সন্দেহজনক।
