সেই রাত্রেই তাঁর মেয়ে ফিরে এসেছে। এনেছে সেই শিলাদার অজানা সওয়ার। কী করে কোথা থেকে ফিরোজাকে সে উদ্ধার করেছে তা সে কিছুই বলেনি। সিদ্দি ফুলাদও তখন জানতে চাননি। প্রাণের প্রাণ মেয়েকে ফিরে পেয়েই তিনি তখন আনন্দে অধীর। মন্ত্রবলে যেন সুস্থও হয়ে উঠেছেন। সিদ্দি বংশের পরমাসুন্দরী যুবতী। মেয়ের, কে জানে, ক-দিন ক-রাত একত্র থেকে একই ঘোড়ার পিঠে অপরিচিত অনাত্মীয় একজন যুবাপুরুষের সামনে বসে জনহীন মরুপ্রান্তরের ভেতর দিয়ে আসার মতো অবিশ্বাস্য ব্যাপারে চরম ইজ্জতহানির আতঙ্কে তটস্থ হতেও ভুলে গেছেন।
সত্যি কথা বলতে গেলে নিজের অগোচরে মনের ভেতর একটা বাসনা তাঁর জেগেছিল। হলই বা সামান্য শিলাদার, তার ভবিষ্যৎ কী হবে কে বলতে পারে! কুড়িজনের সর্দারি বিস্তি থেকে দশজনের নায়ক মীর-দতে নামিয়ে দিয়েছিল বটে, তবু সরকারের দেওয়া ঘোড়া হাতিয়ার নিয়ে কম মাইনের সওয়ার-সিপাই যারা হয় সেই পাশা তো নয়, নিজের ঘোড়া আর হাতিয়ার নিয়ে যারা অনেক বেশি তঙ্খার ফৌজি হয়—সেই শিলাদার। আর মীর-দহতে নামলেও আবার একদিন দহ-হাজারিতে যে উঠবে না, কে বলতে পারে!
শিলাদারের চেহারাটাও তাঁর ভাল লেগেছে। লম্বা-চওড়া জোয়ান নয়, একটু রোগা-পাতলাই মনে হয় বরং, কিন্তু একেবারে যেন ইস্পাতের ফলা। আর মুখোনা একটু যেন আলাদা ছাঁচের। কোথায় যেন এ মুখ তিনি দেখেছেন বলেও তাঁর মনে হয়েছে। ইরানি তুরানি হাবশি ধাঁচের মুখ নয়, তা থেকে আলাদা যেখানে তাঁদের আদিবাস, সেই জাঞ্জিরায় থাকবার সময়ই রত্নগিরি না কোথায় একবার গিয়ে প্রায় হুবহু এই ছাঁচের মুখ যেন দেখেছিলেন, ঠিক স্মরণ করতে পারেননি।
সামান্য শিলাদার হয়ে সন্তুষ্ট থাকবার মানুষ যে সে নয়, লোকটার চেহারা-চরিত্র দেখেই বোঝা যায়। সিদ্দি ফুলাদ পেছনে থেকে তাকে যথাসাধ্য সাহায্য করতে প্রস্তুত। ফিরোজার ভাবগতিক যদি তিনি কিছু বুঝে থাকেন তাহলে উদ্ধারকর্তার প্রতি সে বিরূপ নয় বলেই মনে হয়। না, জুটি তাদের খুব বেমানান হবে না। আর এদের দুজনকে মিলিয়ে দিতে পারলে মরুভূমির বিশ্রী ব্যাপারটা আর বিশ্রী থাকবে না। তার কালিমাই রঙে উজ্জ্বল হয়ে উঠবে।
কিন্তু সব পরিকল্পনা অমনভাবে ভেস্তে যাবে তিনি ভাবতে পারেননি। চালচলন দেখে আর আবৃত্তি করা শায়েরিতে চোস্ত ফারসি আরবি জবান শুনে যা ভেবেছিলেন, আগ্রায় পৌঁছোবার পর বচনরাম নাম শোনার সঙ্গে সঙ্গেই সে ধারণা চুরমার হয়ে বুকে বড় বেজেছে।
মন থেকে তখনই বচনরামকে দূরে সরিয়ে দিয়েছিলেন। মেয়েকে উদ্ধার করার ঋণশোধ হিসেবে নিজে প্রথম মীর আতিশ হবার পরই বচনরামকে একটা কাজ জুটিয়ে দিয়েছেন। সেই কাজই বচনরামের মীর-ঈ-ইমার হবার পথে প্রথম ধাপ হয়েছে। বচনরামকে কোতল করবার হুকুম দেওয়ার সময় সিদ্দি ফুলাদ তাই শোধবোধ ওইভাবেই হয়ে গেছে বলে মনের বেয়াড়া কাঁটাটা চাপা দিতে পেরেছিলেন।
বচনরাম কিন্তু ধরা পড়েনি। ধরা পড়া দূরে থাক, শহর-কোতোয়ালের বাড়ি থেকে সে যে কোথায় গেছে তারই কোনও হদিস পাওয়া যায়নি। মহল্লার দারোগা দু-দিন তার কাটরা-ই-পর্চার বাসার কাছে ওত পেতে থেকে শেষ পর্যন্ত তার বিফলতার কথা সিদ্দি ফুলাদকে জানিয়েছে। শহর-কোতোয়ালের লাগানো হরকরারাও বচনরামের কোনও খবর আনতে পারেনি।
ইতিমধ্যে আর ক-টা এমন ব্যাপার ঘটেছে যা জানতে পারলে সিদ্দি ফুলাদ আরও। বিচলিত হতেন। কিন্তু এ খবর জেনেছেন শুধু কুমার রামসিং তার বিশ্বস্ত মুনশি গিরধরলালের কাছে। তিনি অবশ্য উচ্চবাচ্য করে এ খবর একেবারে চেপে গেছেন। কিন্তু বেশ একটু বিমূঢ়ই হয়েছেন ভেতরে ভেতরে।
৮.
খবরটা সত্যই অদ্ভুত। সকালেই মুনশিজি ফ্যাকাশে মুখে আগ্রা প্রাসাদের পূর্ব প্রাকারের ঝরোকা-ই-দর্শনের নীচে কুমার রামসিং-এর খোঁজে এসেছেন। আওরঙ্গজেব তখনও এই বারান্দায় প্রতি সকালে প্রজাদের দেখা দেওয়ার রেওয়াজ উঠিয়ে দেননি। সূর্যোদয়ের মিনিট পঁয়তাল্লিশ বাদে প্রতিদিন তিনি ওই ঝরোকা-ই-দর্শনে প্রজাদের দর্শন দিয়ে সেখানেই আধঘণ্টার ওপর সময় দেওয়ান-ই-আম-এ যারা ঢুকতে পায় না, সেই অতি-সাধারণ প্রজাদের আর্জিনালিশ শোনেন।
সেদিন সম্রাট তখনও ঝরোকায় এসে পৌঁছোননি। সম্রাটকে নিত্য দেখা যারা ধর্মের অনুষ্ঠান করে তুলেছে, প্রভাতে তাঁর মুখ না দেখে যারা জলগ্রহণ করে না, সেই দর্শনীয়া সম্প্রদায়ের লোকেরা বারান্দার নীচে যমুনা-তীরের বালুকা প্রান্তরে ঊর্ধ্বমুখ হয়ে আছে সম্রাটের আবির্ভাবের প্রতীক্ষায়। সেদিন সকালে কুমার রামসিং-এর চৌকি ছিল বলে তিনিও সম্রাটের দেখা দেওয়ার অপেক্ষায় বাইরে অনুচর সমেত তৈরি হয়ে আছেন।
মুনশি গিরধরলাল তাঁর কাছে গিয়ে প্রথমেই উদ্বিগ্ন স্বরে জিজ্ঞাসা করেছেন, খারাপ খবর কিছু নেই তো?
কুমার রামসিং বেশ অবাকই হয়েছেন। গিরধরলালের হঠাৎ মাথা খারাপ হয়ে গেল নাকি! নইলে কথা নেই বার্তা নেই, সাত-সকালে এই ঝরোকা-ই-দর্শন-এ এসে এরকম আহাম্মকের মতো প্রশ্ন করার মানে কী?
খারাপ খবর থাকবে কেন? কীসের খারাপ খবর? গিরধরলালের ফ্যাকাশে মুখ আর ভীত দৃষ্টি লক্ষ করে তিনি জিজ্ঞাসা করেছেন।
এবার মুনশিজি একটু আড়ালে নিয়ে গিয়ে মুনিবকে সেই অদ্ভুত ঘটনাটা সবিস্তারে জানিয়েছেন। গত রাত্রে ফৌজদার আলি কুলীর সঙ্গে একটা মুশায়েরা থেকে ফিরছিলেন। তখনকার আগ্রা কেন, কোনও শহরেই রাস্তায় আলো দেবার কোনও ব্যবস্থাই ছিল না। নেহাত প্রাসাদের তোরণে, দু-একটা সরকারি দোকানে আর কোতোয়ালি চবুতরায় রাত্রে আলো জ্বলত। এ বাদে কোথাও সিপাইদের ঘাঁটিতে বা কোথাও আমির-ওমরাহ-এর বাড়িতে তেলের আলো বা মশাল জ্বালা হত। আলি কুলীর সঙ্গে গল্প করে ফিরতে ফিরতে খাস বাজারের পাশে একেবারে কোতোয়ালি চবুতরার কাছেই সেখানকার আলোয় একজনকে দেখে মুনশিজি একেবারে থ হয়ে যান। ফৌজদার আলি কুলীও তাকে দেখেছে। কিন্তু সে তো চেনে না! সে গিরধরলালের যেন ভূত দেখার মতো থমকে থামা দেখেই অবাক হয়ে যায়।
