শিবাজি যে তাঁর ছেলে শম্ভজিকে নিয়ে পালিয়েছেন তা ধরা পড়েছে সকাল দশটা নাগাদ। হুলস্থুল পড়ে গেছে শহরে সম্রাটের দরবারে। যেমন করে তোক শিবাজিকে ধরতেই হবে আবার।
কিন্তু ধরবে কোথায়? মালোয়া খাণ্ডেশের ভেতর দিয়েই নিজের রাজ্যে পালাবার চেষ্টা করা শিবাজির পক্ষে স্বাভাবিক। সে দিকেই অনুসরণ করবার দ্রুত ব্যবস্থা যখন হচ্ছে তখনই মথুরায় হঠাৎ শিবাজিকে তাঁর ছেলে সমেত দেখতে পাওয়ার খবরে সব. গোলমাল হয়ে গেছে।
মালোয়ার দিকে অনুসরণ তাতে একটু হয়তো বিলম্বিত হয়ে থাকবে। উত্তর দক্ষিণ এবং তারপর পূর্বদিকে কিন্তু অক্লান্তভাবে অনুসন্ধান চালানো হয়েছে। মাঝে মাঝে শিবাজির যা খবর এসেছে তা কিন্তু পূর্বদিক থেকেই, কখনও ইলাহাবাদে কখনও বারাণসীধামে কখনও গয়ায়, এমনকী এদিকে পুরী আর ওদিকে গোদাবরী তীরের গ্রামে পর্যন্ত শিবাজিকে দেখেছে বলে অনেকে দাবি করে পাঠিয়েছে।
শিবাজির সঙ্গে একটি বালককেও দেখা গেছে। সে বালক শম্ভুজি ছাড়া আর কে হতে পারে। বালকটিও সামান্য নয়। এক জায়গায় ঘোড়া কেনবার ব্যাপারে বচসা হওয়ায় নগররক্ষীরা এসেছে শিবাজি আর ছেলেটিকে গ্রেফতার করতে। শিবাজি শুধু নয়, সেই ছেলেটিও হঠাৎ তলোয়ার খুলে দাঁড়িয়েছে। রক্ষীরা সংখ্যায় অনেক বশি। কিন্তু অসি-যুদ্ধে তাদের শুধু প্রাণটুকু রেখে দিয়ে নাকালের একশেষ করে শিবাজি আর ছেলেটি নিজেদের মুক্ত করে ঘোড়া ছুটিয়ে চলে গেছে।
এসব কাহিনী আগ্রায় পৌঁছে আওরঙ্গজেবকে যদি দিশাহারা করে থাকে তাতে অবাক হবার কিছু নেই। এদিকে দক্ষিণ থেকে যখন গুপ্তচরের খবর আসছে যে শিবাজি তাঁর রাজধানীতে পৌঁছে গেছেন, তখনও বিশ্বস্ত হরকরা মারফত পুব দিক থেকেও শিবাজির সংবাদ পাওয়া যাচ্ছে।
সত্যি তাহলে কোনটা?
আওরঙ্গজেব তা নির্ধারণ করতে পারেননি। সঠিকভাবে ঐতিহাসিকরাও পারেননি জয়পুরের দপ্তরখানায় পুরনো ডিঙ্গল পত্রগুলি আবিষ্কৃত না হওয়া পর্যন্ত। এ চিঠিগুলি অমূল্য। কুমার রামসিং-এর সভাসদেরা প্রতিদিনের একেবারে টাটকা খবর, এমনকী কথাবার্তার বিবরণ পর্যন্ত রাজস্থানের কথ্য ডিঙ্গল ভাষায় লিখে পাঠিয়েছে। রাত্রের লেখা চিঠি পরের দিন সকালেই চলে গেছে উটের ডাকে।
এসব চিঠি থেকে শিবাজি যে আগ্রা থেকে রাজগড়ের সরলরেখার দূরত্ব ছ-শো সত্তর মাইল দিনে অন্তত চল্লিশ মাইল ঘোড়া চালিয়ে মোট পঁচিশ দিনে পার হয়েছিলেন তা নির্ভুলভাবে প্রমাণিত হয়েছে। শিবাজির মতো অসামান্য বীরের পক্ষে কাজটা অসাধ্যও নয়। তাঁর বয়স তখনও চল্লিশ হয়নি।
শিবাজির আগ্রা থেকে পালাবার সঠিক রাস্তা জানবার পর প্রশ্ন থেকে যায়, মথুরা ইলাহাবাদ বারাণসী ইত্যাদি জায়গায় তাহলে শিবাজির মতো কাকে দেখা গেছে। তার সঙ্গে বালকটিই বা কে!
সুরাটের ব্রাহ্মণ চিকিৎসক নাভাকে সত্যিকার ওই ধনরত্ন তাহলে কে দিয়েছিলেন? স্বয়ং শিবাজি রাজগড় থেকে গোদাবরী তীরের গ্রামের সেই কৃষক-জননীকে সত্যিই ডেকে পাঠিয়ে তার অভিযোগের প্রতিকার করেছিলেন কেন?
দাসমশাই থামলেন।
মস্তক যাঁর মর্মরের মতো মসৃণ সেই শিবপদবাবু বলে উঠলেন, তার মানে আপনি বলতে চান, ওই আপনার পূর্বপুরুষ বচনরামই শিবাজি সেজে উত্তর আর পুব দিকে গিয়ে মোগলদের ধোঁকা দিয়েছিলেন।
না, ঘনশ্যাম দাস অনুকম্পাভরে বললেন, তবে কৃষ্ণাজি অনন্ত সভাসদের শিব-ছত্রপতি-চেন চরিত্র-এর মতো আর-একটি যে অমূল্য মারাঠি বখর হারিয়ে গেছে তা খুঁজে পাওয়া গেলে এই বিবরণই পাওয়া যাবে।
সে বিবরণ কে লিখে গেছলেন? সেই বচনরাম? শ্রদ্ধাবিগলিত স্বরে জিজ্ঞাসা করলেন শিরোশোভা যাঁর কাশের মতো শুভ্র সেই হরিসাধনবাবু।
হ্যাঁ, তিনিই লিখে গেছলেন—শিবাজির সঙ্গে তাঁর চেহারায় মিলের কথা জানতে পারার পর কীভাবে ওই ফন্দি এঁটে তিনি কাজে লাগান। শহর-কোতোয়াল সিদ্দি ফুলাদও এই মিলটাই লক্ষ করেছিলেন, শুধু মিলটা কার সঙ্গে তা স্মরণ করতে পারেননি তখন!
ঘনশ্যাম দাস ওঠবার উপক্রম করলেন।
কিন্তু ওই ফিরোজাবিবি! ব্যাকুলভাবে বলে উঠলেন মেদভারে হস্তীর মতো যাঁর বিপুল দেহ সেই ভবতারণবাবু, তার কী হলো তা কি জানা গেছে? সে কি ফিরেছে তার বাবার কাছে?
ফেরেনি বলেই তো জানি!—একটু রহস্যময় হাসি যেন ফুটে উঠল ঘনশ্যাম দাসের মুখে, সে মুখে হাসি ফোটা যদি সম্ভব হয়—কে জানে, নকল শিবাজির সঙ্গে যাকে বালকঘেশে দেখা গেছে সে কে?
দাস হলেন ঘনাদা
১.
না, তস্য তস্য!
বললেন শ্রীঘনশ্যাম দাস, ঘনাদা নামে যিনি কোনও কোনও মহলে পরিচিত।
এ উক্তির আনুপূর্ব বোঝাতে একটু পিছিয়ে যেতে হবে এ কাহিনীর। স্থান-কাল-পাত্রও একটু বিশদ করা প্রয়োজন।
স্থান এই কলকাতা শহরেরই প্রান্তবর্তী একটি বৃহৎ কৃত্রিম জলাশয়, করুণ আত্মছলনায় যাকে আমরা হ্রদ বলে অভিহিত করে থাকি। জীবনে যাদের কোনও উদ্দেশ্য নেই, অথবা কোনও উদ্দেশ্যেরই একমাত্র অনুসরণে যারা পরিশ্রান্ত, উভয় জাতির নানা বয়সের স্ত্রী-পুরুষ নাগরিক প্রতি সন্ধ্যায় এই জলাশয়ের চারিধারে এসে নিজ নিজ রুচি প্রবৃত্তি অনুযায়ী স্বাস্থ্য অর্থ কাম মোক্ষ এই চতুর্বর্গের সাধনায় একা, একা বা দল বেঁধে ভ্রমণ করে উপবিষ্ট হয়।
এই জলাশয়ের দক্ষিণ তীরে একটি নাতিবৃহৎ বৃক্ষকে কেন্দ্র করে কয়েকটি আসন বৃত্তাকারে পাতা। সেই আসনগুলিতে আবহাওয়া অনুকূল থাকলে প্রায় প্রতিদিনই পাঁচটি প্রবীণ নাগরিককে একত্র দেখা যায়।
