নিজেই তারপর হেসে উঠে বলেছে, কিছু মনে করবেন না, একটু তত্ত্বকথা বলে ফেললাম। কিন্তু আপনাদের ধরন দেখে মনে হচ্ছে কাউকে মারকাট করে একটা রক্তারক্তি না করলে আপনাদের শান্তি নেই। এ মরুভূমিতে বড় বেয়াড়া সব পোকামাকড় আছে বালির গাদার ভেতরে। তার কোনটা আপনাদের কামড়াচ্ছে জানতে পারি?
লোকটার নির্বিকার ভাব দেখে মনে মনে একটু দ্বিধাগ্রস্তই হয়েছেন সিদ্দি সাহেব। বাইরে তবু রূঢ় গলাটা বজায় রেখে জিজ্ঞাসা করেছেন আবার, ওসব বাজে কথা রেখে আগে বলো, তুমি কে! কী করছ এখানে?।
আমি! লোকটা হেসে বলেছে, ছিলাম সামান্য একজন শিলাদার। আমার মনসবদার ছিলেন হাজারি জাট দো সদ সওয়ার। আর আমি তাঁর দলে বিস্তি। একদিন তাঁর সঙ্গে করার করার অপরাধে তিনি কুড়িজনের বদলে দশজনের সর্দারিতে নামিয়ে বিস্তির জায়গায় মীর-দহ্ করে দেন। সেই দুঃখেই কাজ ছেড়ে মিরাট থেকে গুজরাট যাচ্ছি সেখানে যদি ভাগ্য ফেরাতে পারি।
লোকটার চেহারা, পোশাক ও ঘোড়াটাকে লক্ষ করে তার কথাটা খুব অবিশ্বাস। করতে পারেননি সিদ্দি ফুলাদ।
কিন্তু এখানে দাঁড়িয়ে করছিলে কী নীচের বালির দিকে চেয়ে?
সন্দেহের চেয়ে সরল কৌতূহলই বেশি ছিল তাঁর জিজ্ঞাসায়।
এখানে বালিতে লেখা একটা অদ্ভুত গল্প পড়ছিলাম! গম্ভীর মুখেই বলেছে লোকটা।
বালিতে লেখা গল্প! লোকটার পরিহাস করার স্পর্ধায় সিদ্দি আগুন হয়ে উঠেছেন আবার।
মিছে গরম হবেন না। লোকটি শান্ত গম্ভীর স্বরে বলেছে, কাল রাত্রেই এখানে একটা নাটকীয় ব্যাপার ঘটেছে, বালিতে তার চিহ্ন এখনও মোছেনি। সেই চিহ্নগুলোই পড়ছিলাম।
চিহ্নগুলো কী নাটকীয় ব্যাপার জানাচ্ছে? উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞাসা করেছেন সিদ্দি ফুলাদ।
জানাচ্ছে যে, এখানে বালির ওপর একটা দ্বন্দ্বযুদ্ধ গোছের হয়ে গেছে। একজন। লম্বা-চওড়া জোয়ান আর একজন বালক বলেই মনে হয়। লড়াইটা তলোয়ার নিয়েই হয়েছে, কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার, তাতে জোয়ান মর্দকে হারিয়ে ছেলেটি ঘোড়ায় চড়ে পালিয়ে গেছে। এই দেখুন, দুজনের লড়াই-এর ঘোরাফেরার দাগ। ওই দেখুন একটা পাগড়ির টুকরো। তলোয়ারের কোপে কাটা হয়ে মাটিতে পড়েছে। তারপর ওখানে দেখুন হালকা ছেলেমানুষের পায়ের দাগ ঘোড়ার খুরের দাগে গিয়ে মিলেছে। তারপর ঘোড়া ছুটিয়েই সে পালিয়ে গেছে। এই দেখুন তার পেছনে ভারী নাগরার। দাগ। সে দাগ এইখানে এসে থেমেছে, তারপর আবার ফিরে গিয়ে আর-এক ঘোড়ার খুরের দাগের সঙ্গে মিশেছে। জোয়ান মর্দটা ছেলেমানুষটিকেই ঘোড়ায় চড়ে এবার অনুসরণ করেছে বোঝা যাচ্ছে।
ফিরোজা! নিশ্চয় আমার ফিরোজা! চিৎকার করে উঠেছেন সিদ্দি ফুলাদ।
ফিরোজা! কে ফিরোজা? অবাক হয়ে জিজ্ঞাসা করেছে অচেনা ভূতপূর্ব শিলাদার।
ফিরোজা আমার মেয়ে! আমার একমাত্র মেয়ে! আর্তকণ্ঠে বলেছেন ফুলাদ সাহেব, তোমার কথা যদি সত্য হয় তাহলে এখনও সে বেঁচে আছে। তবে যে-দস্যুরা। আমাদের কাফিলায় হানা দিয়েছিল তাদেরই কেউ এখনও তাকে অনুসরণ করছে। নিশ্চয়। আমার মেয়েকে যদি উদ্ধার করতে পারো তাহলে
তাহলে দেবার মতো আপনার এমন কিছুই নেই যার লোভ দেখাতে পারেন। শিলান্দার হেসে বলেছে, সুতরাং ও সব আশা দিয়ে আপনার মেয়ের একটু বর্ণনা দিন।
বেশ একটু ক্ষুব্ধ হলেও সিদ্দি ফুলাদ তা-ই দিয়েছেন।
শিলাদার তা শুনে একটু চিন্তিতভাবে বলেছে, ব্যাপারটা খুব সহজ মনে হচ্ছে।। বোঝা যাচ্ছে এই ডাকুর দলের কেউ-ই আপনার মেয়ের পেছনে লেগে আছে। তাকে এড়াতে গিয়ে আবার সে-দলের কবলে যদি আপনার মেয়ে পড়ে তাহলে তাদের হদিস পেলেও গায়ের জোরে লড়াই করে আপনার মেয়েকে উদ্ধার করা যাবে। না। কারণ আপনার অনুচর তো মাত্র এই ক-টি, আর সঙ্গে আছি মাত্র আমি। সুতরাং উদ্ধার করতে বাহুবলের সঙ্গে বুদ্ধিও খাটাতে হবে।
শিলাদার লোকটি তারপর ঘোড়া ছুটিয়ে একাই মরুপ্রান্তরের ওপর দিয়ে দিগন্ত ছাড়িয়ে চলে গেছে।
সিদ্দি ফুলাদ আর তাঁর অনুচরেরা তার সঙ্গে যেতে চেয়েছিল, কিন্তু তাতে ফল খারাপ হতে পারে বলে সে বারণ করেছে।
৭.
শিলাদারের কথা তখন মেনে নিলেও নিজেদের কাফিলার দিকে ফিরতে ফিরতে সিদ্দি ফুলাদ-এর মনে সন্দেহ জেগেছিল।
ওই একটা অজানা অচেনা সওয়ার তাঁকে মিথ্যে ধাপ্পাই কি দিয়ে গেল! তার কথায়। বিশ্বাস করা কি ঠিক হয়েছে!
কিন্তু বিশ্বাস না করেই বা কী করতে পারতেন! লোকটা ডাকুদের কেউ হলে। অতি-বড় ধড়িবাজ অভিনেতা বলতে হবে। সেই সঙ্গে কিছু বিদ্যে আর রসকষও আছে। কবিতার কলি আবৃত্তি থেকেই তা বোঝা গেছে। প্রথমে তার ওপর যে সন্দেহটা হয়েছিল তা সে কথাবার্তায় ব্যবহারে দূর করে দিয়েছে। সন্দেহটা আলগা হবার পর তাকে আর মারধোর করা তো যায় না। লোকটা বালিতে তখন যে সব চিহ্ন দেখিয়ে তার অর্থ বুঝিয়েছিল, সেগুলি আজগুবি বলেও মনে হয়নি। লোকটা যদি ঠকবাজ হয় তাহলে তা মেনে নিয়ে নিজেদেরই যা খোঁজবার খুঁজতে হবে। সে সুযোগ তো সে কেড়ে নিয়ে যায়নি। কিন্তু খুঁজবেন কোথায়?
বেলা বাড়ার সঙ্গে সমস্ত মরুভূমি বিরাট তপ্ত বালির তাওয়া হয়ে ওঠে। চোখের ওপর দিকচক্রবাল তখন প্রচণ্ড তাপে যেন কাঁপতে থাকে। যেদিকে তাকাও শুধু ধূ ধূ শূন্যতা। এর মধ্যে কোথায় পাবেন তাঁর হারানো মেয়ের সন্ধান?
তিন দিনের অবিরাম ছোটাছুটিতে, অমানুষিক পরিশ্রমের ক্লান্তিতে হতাশায় সিদ্দি ফুলাদ এবার একেবারে ভেঙে পড়ে প্রায় বেহুঁশ হয়ে গেছেন মরুভূমির হলকা-লাগা জ্বরে।
