সেই একটি রত্ন মানে কি তাঁর প্রাণাধিক এই মেয়ে!
তা যদি জানতেন তাহলে কোনও সৌভাগ্যই তিনি চাইতেন না জীবনে। মান্দভিতে মোগল নৌবাহিনীর একজন অধ্যক্ষ হয়েই সারাজীবন কাটিয়ে দিতেন।
একটি মাত্র মেয়ে। তার ভবিষ্যতের জন্য ভাবনা তত তাঁর সত্যি কিছু ছিল না। তাঁর নিজের কিছু থাক বা না থাক, ফিরোজা নিজের রূপগুণেই উপযুক্ত আমির-ওমরাহের ঘরে সাদরে সমাদরে জায়গা পেত।
মেয়ে তাঁর সত্যিই অসামান্যা সুন্দরী।
তাঁরা হাবশি, কিন্তু কাফ্রি তো নয়। সত্যি কথা বলতে গেলে, রং একটু ময়লা। হলেও যৌবনে ইরানি তুরানি সুপুরুষরা আভিজাত্য মেশানো দেহসৌষ্ঠবে তাঁর কাছে। দাঁড়াতে পারেনি। তিনি বিয়ে করেছেন আবার আসোয়ান-এর তখনকার ডাকসাইটে মিশরি সুন্দরীকে। ফিরোজা তাই একদিকে বসরার গুলের মতো মধুর আর কোমল,
আর একদিকে বিদ্যুতের চমক দেওয়া দীপ্তি তার রূপে।
কিন্তু এহেন রূপকেও ভুলিয়ে দেয় তার গুণ। ষোলো থেকে এখনও সতেরোয় পা দেয়নি, এরই মধ্যে নিজেদের আম্হারিক তো বটেই, তার ওপর আরবি, ফারসি, তুর্কি, এমনকী ভারতবর্ষের সংস্কৃত ভাষা পর্যন্ত, সে ভালরকম শিখেছে। এদেশের। গানবাজনার দিকে তাঁর ঝোঁক একটু বেশি। এমনিতে সে কোকিলকণ্ঠী, তার ওপর জেদ করে বীণা বাজানোও শিখেছে।
মেয়ের এই জেদ-ধরা গোঁ-ই সিদ্দি ফুলাদকে ভাবিত করেছে একটু-আধটু। এই জেদের জন্যেই মেয়েটা ভবিষ্যতে ঘা খাবে না তো! তাই বা খাবে কেন, নিজেকে বুঝিয়েছেন ফুলাদ সাহেব। এমন কিছু অন্যায় জেদ তো সে এখনও ধরেনি। আর যা ধরে তা শেষ পর্যন্ত সফল করেই ছাড়ে। যেমন, সেই তলোয়ার খেলা শেখার ঝোঁক। শুনেই বেগমসাহেবা তো আঁতকে উঠেছিলেন—মেয়েছেলে তলোয়ার খেলতে শিখবে কী। কিন্তু সিদ্দি ফুলাদ তাঁর স্নেহের প্রশ্রয় দিয়েছিলেন। চারশো বছর আগে এই ভারতবর্ষেই এক মুসলিম মহিলা কি রানি হিসেবে অস্ত্রধারণ করেননি! স্বামীর সঙ্গে যুদ্ধে নেমে পরাজিত হয়ে প্রাণও দিয়েছিলেন। ফিরোজাকে তো আর সেরকম কিছু করতে হবে না। খেয়াল হয়েছে যখন, শিখুক। ফিরোজা তলোয়ার চালানো সত্যিই শিখেছে, এমন শিখেছে যে সিদ্দি ফুলাদ শুধু নয়, ফিরোজার শিক্ষাগুরু বুড়ো ওস্তাদও অবাক হয়ে গেছেন। বেশিদিন এ নেশা থাকেনি এই ভাগ্যি। মেয়ের এ-ধরনের খেয়াল বেশিদিন থাকে না।
এ মেয়ে সম্বন্ধে কত আশা না করেছেন সিদ্দি ফুলাদ, কত স্বপ্নই না দেখেছেন। বড় হবার, ধনী হবার এত যে চেষ্টা এ তো শুধু তারই জন্যে। আগ্রায় যাচ্ছেন। মোগল জাহানের রাজধানীতে আগ্রা শহরের শ্রেষ্ঠ সব পরিবারে তাঁর মেয়ের অসামান্য রূপগুণের খবর চাপা থাকবে না! ফিরোজা তার যোগ্য ঘর বর পাবে।
সব স্বপ্নই কি তাহলে ধূ-ধূ বালুর দেশের মরীচিকা হয়ে গেল?
উদ্ভ্রান্তের মতো সিদ্দি ফুলাদ কয়েকজন বিশ্বস্ত অনুচর নিয়ে মরুভূমির মধ্যে কন্যার সন্ধান করে ফেরেন।
কিন্তু কোথাও তার কোনও চিহ্নও নেই। না তার, না দস্যুদলের কারও।
৬.
দ্বিতীয়দিনে সকালবেলা উষার আলোয় রাঙা দিগন্তব্যাপী বালুকা-প্রান্তরে দূরে একজন ঘোড়সওয়ারকে দেখা যায়। ঘোড়সওয়ার ঘোড়া থামিয়ে পাষাণমূর্তির মতো দাঁড়িয়ে নীচের দিকে একদৃষ্টে চেয়ে আছে।
ফুলাদ সাহেবের অনুচরেরা চিৎকার করে ওঠে হিংসায় আক্রোশে, ডাকু! ওই একটা ডাকু!
দূর থেকে সওয়ার মুখ তুলে তাকায়। কিন্তু পালাবার কোনও চেষ্টা তার দেখা যায়। যেমন ছিল তেমনই স্থিরভাবেই সে ঘোড়ার ওপর বসে থাকে।
সিদ্দি ফুলাদ আর তাঁর অনুচরেরা ঘোড়া ছুটিয়ে নিয়ে তাকে ঘিরে ধরে।
অনুচরেরা খোলা তলোয়ার নিয়ে তারপর লোকটার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে গেছে, কিন্তু ডাকুটাকে তাতেও নির্বিকার থাকতে দেখে ফুলাদ সাহেব নিজেই অনুচরদের নিরস্ত করেছেন।
ডাকুটার ব্যবহার সত্যি তাঁর অদ্ভুত লেগেছে। ফুলাদ সাহেব ঘোড়া চেনেন। ডাকুটার ঘোড়া দেখেই তিনি বুঝেছেন, দূর থেকে যখন তাঁদের সাড়া সে পেয়েছিল, ইচ্ছে করলে তখনই সে নিজের ঘোড়া ছুটিয়ে পালাতে পারত। তার ঘোড়ার নাগাল ধরা সিদ্দি ফুলাদের দলের কোনও ঘোড়ার সাধ্যে কুলোত না।
তবু লোকটা পালাবার চেষ্টা তো করেইনি, এমনকী তাঁর অনুচরদের ঝাঁপিয়ে পড়বার উপক্রম করতে দেখেও কোমরের খাপবন্দি তলোয়ারের হাতলে পর্যন্ত হাত বাড়ায়নি।
বিস্ময়ের সঙ্গে রাগ ও বিরক্তি মিশিয়ে সিদ্দি ফুলাদ একটু তিক্ত বিদ্রূপের সুরেই বলেছেন, খুব তোমার সাহস, না? ভেবেছ, সাহস দেখেই আমরা চিনতে ভুল করব?
লোকটা ঠোঁট ফাঁক না করে সামান্য একটু হেসেছে। তারপর সিদ্দি ফুলাদকে উদ্দেশ করেই আবৃত্তি করেছে সুরেলা গলায়—হর কস কি খিয়ানৎ কুন আলবত্তা বতর্সদ। বেচারা নূরী না করে হ্যায় না ডরে হ্যায়।
সিদ্দি ফুলাদ সত্যি চমকে উঠেছেন। আকবরের সভাসদ বিখ্যাত ফৈজির প্রাণের দোস্ত মুল্লা নূরীর এ বিরল কবিতা এই একটা ডাকুর মুখে!
কবিতার মোদ্দা মানে হল—অন্যায় যে করে সেই ভয় পায়, অন্যায় যে করে না তার ভয়ও নেই।
তুমি দস্যুদের কেউ নও! কে তাহলে তুমি! রূঢ়স্বরে জিজ্ঞাসা করেছেন সিদ্দি সাহেব, কিন্তু স্বরটা নিজের অজান্তেই নরম হয়ে এসেছে শেষের দিকে।
এবার লোকটা একটু অবান্তর হলেও আধ্যাত্মিক কবিতাতেই জবাব দিয়েছে। আমির খসরুর একটি চেৎ কবিতার কলি আউড়ে চলেছে–
সব কোয়ি উসকো জানে হৈ
পর এক নহী পহচানে হৈ
আঠ দহড়ী মে লেখা হৈ
ফিকর কিয়া মন-দেখা হৈ।
