এইসব গুজব আগ্রায় রটে তুমি বলছ।
সিদ্দি ফুলাদ-এর গলা এখন জলদগম্ভীর।
কিন্তু নির্দোষ বলেই বোধহয় বচনরামের ভয়-ডর কিছু নেই। অবিচলিতভাবে বলেছে, তা না হলে আমি আর কোথা থেকে জানব কোতোয়াল সাহেব! হালালখোর দু-চারজন নোকরির দায়ে সব সময়ে আসা-যাওয়া করে। তাদের কাছেই কখনও-সখনও উড়ো গুজব শুনি।
হুঁ! বলে সিদ্দি ফুলাদ কী যেন ভেবে নিয়ে আবার সহজ হয়ে বলেছেন, এ ধরনের খবর পেলে আমায় জানিও। আর গিয়েই ভাল দেখে দু-জন হালালখোর পাঠিয়ে দেবে।
যো হুকুম কোতোয়াল সাহেব! বলে সেলাম করে বচনরাম বেরিয়ে গেছে।
৫.
বচনরামের চলে যাওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে পারেননি সিদ্দি ফুলাদ। দেউড়িতে বাঁধা তার ঘোড়ার আওয়াজ বাইরের রাস্তায় মিলিয়ে যেতে না যেতে তাঁর তবিনান-এর এক সিপাইকে পাঠিয়েছেন কাটরা-ই-পচার দারোগাকে তলব দিতে। বচনরাম ওই কাপড়ের বাজারের একটি বাড়িতেই থাকে। দারোগা এলে সিদ্দি ফুলাদ তাকে নির্দেশ দিয়েছেন সারা দিনরাত দু-জন হরকরা লাগিয়ে বচনরামের চলাফেরা। সবকিছুর খবর নিতে। দিন দুই এভাবে নজরবন্দি রেখে তৃতীয় দিনেই বচনরামকে ভোরবেলাই যেন কয়েদ করা হয়, এ-ই সিদ্দি ফুলাদ-এর হুকুম।
এ হুকুম দেবার আগে সামান্য একটু দ্বিধা জয় করতে হয়েছে সিদ্দি ফুলাদকে। বচনরামের কাছে একটা ঋণের কথা মন থেকে উড়িয়ে দিতে সময় লেগেছে। এই ঋণটুকুর জন্যেই বচনরামের অনেককিছু এ পর্যন্ত সহ্য করেছেন সিদ্দি ফুলাদ, তাকে একটু আশকারাই দিয়েছেন বলা যায়। কিন্তু এবার দাঁড়ি না টানলে নয়। বচনরাম মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। তা ছাড়া ওই ক্ষয়া-পাতলা অথচ ইস্পাতের মতো মজবুত আর ধারালো মানুষটাকে কেমন যেন ভয়ও হয় আজকাল, ভয় আর সন্দেহ। মানুষটার ভেতর যেন গোলমেলে কিছু আছে। এরকম লোককে সময় থাকতে নিকেশ করে দেওয়াই ভাল। ঋণের কথাটা মন থেকে মুছে ফেলবার জন্যে যুক্তিও একটা খাড়া করেছেন সিদ্দি ফুলাদ। বচনরাম তাঁর আশাতীত উপকার যদি একদিন করে থাকেও, সিদ্দি ফুলাদও তার প্রতিদান দিয়েছেন তাকে মীর-ঈ-ইমারৎ-এর কাজ পাইয়ে দিয়ে। খাঁটি সুন্নি ছাড়া শিয়ারাও সহজে যা পায় না, বিধর্মী হয়ে সেই কাজ কি যথেষ্ট নয়! তাইতেই শোধবোধ হয়ে গেছে অনেক আগে। সুতরাং এখন আর বিবেকের খোঁচা থাকা উচিত নয়। বিশেষ করে সাম্রাজ্যের খাতিরে এসব সন্দেহজনক মানুষের উচিত ব্যবস্থা করতে তিনি বাধ্য।
বচনরামের কাছে ঋণটা যত বড়ই হোক, তার চেয়ে বড় শাহানশাহ্ আওরঙ্গজেব-এর প্রতি তাঁর কর্তব্য।
ঋণটা অবশ্য ছোটোখাটো নয়। বচনরাম না থাকলে তাঁর নয়নের মণি একমাত্র মেয়েকে তিনি আর জীবনে পেতেন না। আর তাহলে আগ্রায় এসে এই একাধারে মীর আতিশ আর শহর-কোতোয়াল হওয়া তাঁর ভাগ্যে কি থাকত!
সে প্রায় তিন বছর আগের কথা। কচ্ছ উপসাগরের মান্দভি বন্দর থেকে মোগল নৌয়ারার দারোগাগিরি ছেড়ে স্ত্রী কন্যা নিয়ে আসছেন আগ্রায়। নামের আগে সিদ্দি থাকলেই জাঞ্জিরার হাবশি রাজবংশের লোক বুঝতে হবে। আর সিদ্দিদের ওপরই ছিল পশ্চিম সমুদ্রের নৌবাহিনীর ভার। সিদ্দি ফুলাদ-এর কিন্তু উচ্চাশা ছিল জল ছেড়ে ডাঙার উচ্চপদে ওঠবার। তাই তিনি চলেছিলেন এক কাফিলার সঙ্গে আগ্রায়।
রাজপুতানার মরুভূমির মধ্যে দিয়ে পথ। চোদ্দোআনা পথ তখন পার হয়ে এসেছেন। হিন্দৌন ছাড়িয়ে আর প্রায় পঁচিশ ক্রোশ যেতে পারলেই আগ্রা। সেখানেই মরুভূমির বালিয়াড়ির মাঝে এক রাত্রে ডাকাতের দল হানা দিয়েছে তাঁদের কাফিলায়। মরুভূমির ধুলোবালির ঝড় সে সময়ে যেন ঈশ্বরের দয়াতেই না উঠলে ধনসম্পদ মানুষজন কিছুই বা কেউই রক্ষা পেত না নিশ্চয়। ঝড়ই সিদ্দি ফুলাদ-এর দলকে সাহায্য করেছে। প্রচণ্ড বালুঝড়ের মধ্যে ডাকাতের দল আর তাদের শিকারদের দুরবস্থা হয়েছে একই। কে কোথায় যে ছিটকে গেছে কেউ জানে না। ঝড় থামবার পর চোখ মেলে চাইবার মতো অবস্থা হলে সিদ্দি ফুলাদ দেখেছেন, ধন-সম্পদ তাঁর বিশেষ কিছু খোয়া যায়নি, কিন্তু যা গেছে তার কাছে দুনিয়ার সম্পদ সিদ্দি ফুলাদ-এর চোখে তুচ্ছ। জাঞ্জিরার শ্রেষ্ঠ সুন্দরী, সিদ্দি ফুলাদ-এর নয়নের মণি, তাঁর কুমারী কন্যারই খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। বালির ঝড়ে সে নিজেই কোথাও কোনও ধূ-ধূ প্রান্তরে ছিটকে গিয়েছে, না দস্যুরাই তাকে হরণ করে নিয়ে গিয়েছে, কে জানে!
সিদ্দি ফুলাদ প্রায় পাগল হয়ে গিয়েছেন শোকে হতাশায়। তাঁর মনে পড়েছে মান্দভির এক হিন্দু জ্যোতিষীর কথা। নৌবহরের কাজ ছেড়ে আগ্রা রওনা হবার আগে তাঁকে একদিন হাত দেখাতে গেছলেন সিদ্দি ফুলাদ। জানতে চেয়েছিলেন, আগ্রায় যে উদ্দেশ্যে যাচ্ছেন তা বিফল হবে কি!
না, তা হবে না, বলেছিলেন হিন্দু জ্যোতিষী, অনেক কিছুই পাবেন আগ্রা গিয়ে, উঠবেন অনেক ওপরে। কিন্তু পাবেন যেমন অনেক কিছু, হারাবেনও তেমনই কোনও একটা রত্ন।
একটা রত্ন শুধু? জিজ্ঞাসা করেছিলেন সিদ্দি ফুলাদ।
হ্যাঁ, একটা রত্নই! বলে কীরকম যেন অদ্ভুতভাবে তাঁর দিকে চেয়েছিলেন জ্যোতিষী। তারপর আবার বলেছিলেন, একটা রত্নের বদলে অনেক কিছু পেতে আপনার আপত্তি নেই তা হলে?
সিদ্দি ফুলাদ হেসে বলেছিলেন, না, আপত্তি নেই। একটার জায়গায় অনেক পাব? তো ঠিক?
হ্যাঁ, তা পাবেন! কীরকম একটু রহস্যমেশানো হাসি মুখে মাখিয়ে বলেছিলেন জ্যোতিষী।
